হুমায়ূন আহমেদের লেখা হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৫

হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৫

পথে লােভে পড়ে এক কার্টুন মার্লবােরাে সিগারেট কিনে ফেলায় ডলারের সঞ্চয় কমে গেছে। মেনু দেখে আঁতকে উঠলাম। সব খাবারের দাম আট ডলার নয় ডলার। স্টেক জাতীয় খাবারগুলাের দাম আরাে বেশি। বেছেবছে সবচে কমদামী একটা। খাবারের অর্ডার দিলাম–ঞ্চে টোস্ট। দামে সস্তা, তাছাড়া চেনা খাবার। ওয়েট্রেস অবাক হয়ে বললাে, এটাই কি তােমার ডিনার? আমি বললাম, ইয়েস। ও সঙ্গে আর কিছু নেবে না? কোল্ড ড্রিংক কিংবা কফি? ঃ নাে ।

রাতের খাবার শেষ করে একা একা হােটেলের লাউঞ্জে বসে রইলাম। লাউঞ্জ প্রায় ফঁকা। এক কোণায় দুইজন বুড়ােবুড়ি ঝিম মেরে বসে আছে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে জীবনের বাকি দিনগুলাে কী করে কাটাবে এর এই নিয়েই চিন্তিত। ওদের চেয়ে আমি নিজেকে আলাদা করতে পারলাম না।

পাশের ঘরেই হােটেলের বার। সেখানে উদ্দাম গান হচ্ছে। খােলা দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে নারী-পুরুষ জড়াজড়ি করে নাচছে। গানের কথাগুলাে পরিষ্কার নয়। একটি চরণ বার বার ফিরে ফিরে আসছে-who do you want to love yea ? Yea শব্দটির মানে কি কে জানে?

হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৫

রাতে ঘুম এলাে না ভয়ে ভূতের ভয়। | এই ভূতের ভয়ের মূল কারণ, আমার ঘরে রাখা হােটেল গ্রেভার ইন সম্পর্কিত একটি তথ্য-পুস্তিকা। সেখানে আছে, এই পাথরের হােটেলটি কে প্রথম বানিয়েছিলেন সেই সম্পর্কে তথ্য। বিখ্যাত ব্যক্তি কারা কারা এই হােটেলে ছিলেন তাদের নাম-ধাম। সেই সব বিখ্যাত ব্যক্তির কাউকেই চিনতে পারলাম না, তবে এই

হােটেলে একটি ভৌতিক কক্ষ আছে জেনে আঁতকে উঠলাম। রুম নম্বর ৩০৯-এ একজন অশরীরী মানুষ থাকেন বলে একশ বছরের জনশ্রুতি আছে। যিনি এখানে বাস করেন তার নাম জন পাউল। পেশায় আইনজীবী ছিলেন। এই হােটেলেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরও হােটেলের মায়া কাটাতে পারেননি। পুস্তিকায় লেখা এই বিদেহী আত্মা অত্যন্ত শান্তি ও ভদ্র স্বভাবের। কাউকে কিছুই বলেন না। গভীর রাতে পাইপ হাতে হােটেলের বারান্দা দিয়ে হেঁটে বেড়ান।

হােটেলের তিনশ নয় নম্বর কক্ষটিতে কোনাে অতিথি রাখা হয় না। বছরের পর বছর এটা খালি থাকে, তবে রোজ পরিষ্কার করা হয়। বিছানার চাদর বদলে দেয়া হয়। বাথরুমে নতুন সাবান, টুথপেস্ট দেয়া হয়। ঘরের সামনে একটা সাইন বোর্ড আছে, সেখানে লেখা—‘মিঃ জন পাউলের ঘর। নীরবতা পালন করুন। জন পাউল নীরবতা পছন্দ করেন।

পুরাে ব্যাপারটা এক ধরনের রসিকতা কিংবা আমেরিকানদের ব্যবসা কৌশলের একটা অংশ, তবু রাত যতােই বাড়তে লাগলাে মনে হতে লাগলাে এই বুঝি জন পাউল এসে আমার দরজায় দাড়িয়ে বলবেন—তােমার কাছে কি আগুন আছে? আমার পাইপের আগুন নিভে গেছে।

হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৫

এমনিতেই ভয়ে কাঠ হয়ে আছি, তার উপর পাশের ঘরের বৃদ্ধা বিচিত্র সব শব্দ করছুেনএই খকখক করে কাশছেন, এই চেয়ার ধরে টানাটানি করছেন, গানের সিকি অংশ শুনছেন, দরজা খুলে বেরুচ্ছেন আবার ঢুকছেন। শেষ রাতের দিকে মনে হলো দেশ-গঁয়ের মেয়েদের মতাে সুর করে বিলাপ শুরু করেছেন।

নিঃসঙ্গ মানুষদের অনেক ধরনের কষ্ট থাকে।

পুরােপুরি না ঘুমিয়ে কেউ রাত কাটাতে পারে না। শেষ রাতের দিকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ঘুম আসে। কিন্তু আমার এলাে না। পুরাে রাত চেয়ারে বসে কাটিয়ে দিলাম। ভােরবেলা আমার ছােট ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল টেলিফোন করলে ওয়াশিংটন সিয়াটল থেকে। সে আমার আগে এদেশে এসেছে। পি এইচ ডি করছে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে। পরিষ্কার লজিকের ঠাণ্ডা মাথার একটা ছেলে। ভাবালুতা কিংবা অস্থিরতার কিছুই তার মধ্যে নেই। জটিল বিষয় নিয়ে গবেষণার ফাকে-ফঁাকে সে অসম্ভব সুন্দর কিছু লেখা লিখে ফেলেছে—কপােট্রনিক সুখ-দুঃখ, দীপু নাম্বার টু, হাত কাটা রবীন। প্রসঙ্গের বাইরে চলে যাচ্ছি, তবু বলার লােভ সামলাতে পারছি না। জাফর ইকবালের লেখা পড়লে ঈষার সূক্ষ্ম খােচা অনুভব করি। এই ক্ষমতাবান প্রবাসী লেখক দেশে তার যােগ্য সম্মান পেলেন না, এই দুঃখ আমার কোনােদিন যাব

Read more

হুমায়ূন আহমেদের লেখা হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৬

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *