আমাকে অবাক করে দিয়ে বসলাে আমার সামনের চেয়ারে। যে কথাগুলাে সে আমাকে বললো তা শােনার জন্যে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। মেয়েটি নিচু গলায় বললো, | ঃ দ্যাখাে আহামাদ, আমরা জানি তােমার সময়টা ভালাে যাচ্ছে না। দিনের পর দিন তুমি একটা কুৎসিত খাবার মুখ বুজে খেয়ে যাচ্ছাে। টাকা-পয়সার কষ্টের মতো কষ্ট তাে আর কিছুই হতে পারে না। তবু বলছি নিজের উপর বিশ্বাস রাখে। দুঃসময় একদিন অবশ্যই কাটবে।
আমি একবার ভাবলাম বলি, তােমরা যা ভাবছাে ব্যাপারটা সে রকম নয়। পরমুহূর্তেই মনে হলাে—এটা বলার দরকার নেই। এটা বলা মানেই এদের ভালােবাসার অপমান করা। আমি তা হতে দিতে পারি না।।
মেয়েটি বললাে, আজ তোমার জন্যে আমরা ভালো একটা ডিনারের ব্যবস্থা করেছি। এর জন্যে তােমাকে কোনাে পয়সা দিতে হবে না। তুমি আরাম করে খাও এবং মনে সাহস রাখাে। | সে উঠে গিয়ে বিশাল ট্রে-তে করে টি-বােন কে নিয়ে এলো। সঙ্গে নানান ধরনের টুকিটাকি। কফি এলাে, আইসক্রীম এলো। ওয়েট্রেসর সবাই একবার করে দেখে গেলো আমি ঠিকমতো খাচ্ছি কিনা। আমি খুব আবেগপ্রবণ ছেলে, আমার চোখে পানি এসে গেলো। এরা এতাে মমতা একজন অচেনা-অজানা ছেলের জন্যে রেখে দিয়েছিলাে? মেয়েগুলাে আমার চোখের জল দেখতে পেলেও ভান করলাে যেন দেখতে পায়নি।
হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৭
গভীর আনন্দ নিয়ে হােটেল গ্রেভার ইনে ফিরে এলাম। রিসিপশনে বসে থাকা গােমরা মুখের মেয়েটাকে আজ অনেক ভালাে লাগলাে। আমি হাসিমুখে বললাম, হ্যালাে।
সে-ও হাসিমুখে বললো, হ্যালাে।
গ্রেভার ইন বার-এর উদ্দাম গান আজ শুনতে ভালাে লাগলাে। ইচ্ছে করলে। ভেতরে ঢুকে খানিকক্ষণ শুনি।
আমার পাশের বৃদ্ধার ঘরে নক করে তাঁকে বললাম-আমার কাছে দুটো বাংলাদেশী মুদ্রা আছে তুমি কি নেবে?
অনেক রাতে স্ত্রীকে চিঠি লিখতে বসলাম। সেই চিঠিটা খুব অদ্ভুত ছিলো। কারণ চিঠিতে তুষারপাতের একা বানানাে বর্ণনা ছিলাে। তুষারপাত না দেখেই আমি লিখলাম—আজ বাইরে খুব তুষারপাত হচ্ছে। রাস্তাঘাট ঢেকে গেছে সাদা বরফে। সে যে কি অপূর্ব দৃশ্য তুমি না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না। আমি হােটেলের জানালার কাছে বসে-বসে লিখছি। তুমি পাশে থাকলে দুজন হাত ধরাধরি করে তুষারের মধ্যে দাঁড়াতাম।
যে তিনজন তরুণী আমেরিকা প্রসঙ্গে আমার ধারণাই বদলে দিলাে আজ তাঁদের কথা গভীর মমতা ও গভীর ভালােবাসায় স্মরণ করছি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খন্ডে আজ আমরা বিভক্ত। কতাে দেশ, কতো নাম-কিন্তু মানুষ একই আছে। আসছে লক্ষ বছরেও তা-ই থাকবে।
ডানবার হলের জীবন নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটির ক্লাসগুলো যেখানে হয় তার নাম ডানবার হল। ডানবার হলের তেত্রিশ নম্বর কক্ষে ক্লাস শুরু হল। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্লাস। কোর্স নাম্বার ৫২৯।
হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৭
কোর্স নাম্বারগুলি সম্পর্কে সামান্য ধারণা দিয়ে নেই। টু হানড্রেড লেভেলের কোর্স হচ্ছে আণ্ডার-গ্রাজুয়েটের নিচের দিকের ছাত্রদের জন্যে। খ্ৰী হানড্রেড লেভেল হচ্ছে আণ্ডার-গ্রাজুয়েটের উপরের দিকের ছাত্রদের জন্যে ফোর হানড্রেড এবং ফাইভ হানড্রেড লেভেল হচ্ছে গ্রাজুয়েট লেভেল।
ফাইভ হানড্রেড লেভেলের যে কোসটি আমি নিলাম সে সম্পর্কে আমার তেমন কোন ধারণা ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অল্প কিছু কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়েছি। একেবারে কিছুই যে জানি না তাও না। তবে এই বিষয়ে আমার বিদ্যা খুবই ভাসাভাসা। জলের উপর ওড়াউড়ি, জল স্পর্শ করা নয়।
একাডেমিক বিষয়ে নিজের মেধা এবং বুদ্ধির উপর আমার আস্থাও ছিল সীমাহীন। রসায়নের একটি বিষয় আমি পড়ে বুঝতে পারব না, তা হতেই পারে না।
আমাদের কোর্স কো-অর্ডিনেটর আমাকে বললেন, ফাইভ হানড্রেড লেভেলের এই কোর্সটি যে তুমি নিচ্ছ, ভুল করছ না তাে? পারবে?
আমি বললাম, ইয়েস।
তখনো ইয়েস এবং নাে-র বাইরে তেমন কিছু বলা রপ্ত হয়নি। কোর্স কো অর্ডিনেটর বলেন, এই কোর্সে ঢুকবার আগে কিন্তু ফোর হানড্রেড লেভেলের কোর্স শেষ করনি। ভাল করে ভেবে দেখ, পারবে?
ও ইয়েস।
Read More
