৩. আমি তােরে ছাড়ব না। তােরে এইভাবে আটকায়ে রাখব।
৪. হে আল্লাহপাক । হে গাফুরুর রহিম। আমাকে উদ্ধার করাে। যাকে আটকে রাখা হয়েছিল তার নাম পারুল। এই তথ্য বের করতে মিসির আলির তেমন বেগ পেতে হয় নি। বালিশে পারফিউমের গন্ধ পেয়েছেন। এই গন্ধ তার চেনা।
প্রাইভেট জেলখানা থেকে মুক্তির একটা বুদ্ধি মাথায় এসেছে। এই বুদ্ধি কতটা কার্যকর হবে তা মিসির আলি এখনাে বুঝতে পারছেন না।
মূল দরজাটি কাঠের । এই দরজা কি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া যাবে ? পুরনাে দরজা, শুকিয়ে খড়খড়ে হয়ে আছে। কোনােরকমে দরজার এক কোনায় আগুন লাগালে দরজা পুড়ে যাবে ।
আগুন লাগানাের জন্যে ম্যাচ বাক্স তাঁর কাছে আছে। ম্যাচ বাক্সে এগারটা কাঠি। এগারবার জ্বালানাে যাবে। কাগজ আছে। ধৈর্য ধরে দরজার একটা কোনায় আগুন ধরাতে হবে। কাজটা করতে হবে ভােররাতে। যখন সবাই থাকবে ঘুমে। দরজার আগুন বা ধোয়ার বিষয়টা কারও চোখে পড়বে না। বাথরুমে তিনি শ্যাম্পুর একটি বােতল দেখেছেন। কিছু কিছু শ্যাম্পু যথেষ্ট দাহ্য। শ্যাম্পুর বােতলটা নিয়ে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
খাটের নিচে তিনি একটা ফিডার পেয়েছেন। প্লাস্টিকের ফিডারে আগুন ধরলে ধিকি ধিকি করে অনেকক্ষণ জ্বলবে। কাঠের দরজার এক কোনায় আগুন ধরে যাওয়ার কথা। দরজায় চাকু দিয়ে দাগ দিতে পারলে হতাে। এতে দরজার সারফেস এরিয়া বাড়বে। | রাত তিনটায় মিসির আলি দরজা পােড়ানাের সময় নির্ধারণ করলেন। রাত তিনটা ভালাে সময়। তিন প্রাইম নম্বর । পিথাগােরাসের মতে, অতি রহস্যময় সংখ্যা।
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৪
দরজা পুড়িয়ে বের হওয়ার বুদ্ধি কাজ করল না। দরজার এক কোনায় আগুন ঠিকই জ্বলল, তবে সে আগুন স্থায়ী হলাে না। দরজার খানিকটা পুড়িয়ে নিভে গেল । লাভের মধ্যে লাভ এই হলাে যে, দরজা পােড়ানাের উত্তেজনায় মিসির আলির রাত কাটল নিঘুম। শরীরে ধস নেমে গেল। বেঁচে থাকার জন্যে শরীরকে মােটামুটি ঠিক রাখতে হবে। প্রচুর পানি খেতে হবে । তা তিনি খাচ্ছেন।
বাথরুমের বেসিন থেকে নিয়ে মগভর্তি পানি। কিছুক্ষণ পরপর পানি । তাঁর মন বলছে বাথরুমের বেসিনের পানি থাকবে না। যে তাঁকে আটকেছে সে পানি বন্ধ করে দেবে। তখন প্রবল তুষ্ণায় কমােডের পানি ছাড়া গতি থাকবে না।
ক্ষুধার যন্ত্রণা কমে আসছে। কাজটি করছে মস্তিষ্ক । মস্তিষ্ক যখন দেখে খাবার পাওয়ার কোনাে সম্ভাবনা নেই তখন ক্ষিধে কমিয়ে দেয়। শরীরে জমে থাকা চর্বি থেকে প্রয়ােজনীয় খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। একজন সবল মানুষ কোনাে খাদ্য গ্রহণ না করে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বাঁচতে পারে ।
মিসির আলি কোনাে সবল মানুষ না। নানান অসুখে পর্যদস্ত একজন মানুষ। তিনি ধরে নিয়েছেন, এইভাবে তিনি বেঁচে থাকতে পারবেন দশ দিন। এর বেশি
তবে শেষ দিনগুলাে খুব কষ্টকর হবে না। তার হেলুসিনেশন শুরু হবে। বাস্তবতার দেয়াল ভেঙে যাবে। তিনি ঢুকে পড়বেন অবাস্তব এক জগতে। একজন। সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে অনেকবার সেই জগতে তার ঢােকার ইচ্ছে হয়েছে। ইচ্ছে
এখন পূর্ণ হতে চলছে, কিন্তু তার ভালাে লাগছে না।
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৪
বন্দি অবস্থায় মিসির আলি আটান্ন ঘণ্টা পার করলেন। ক্ষুধাবােধ এখন পুরােপুরি চলে গেছে। তৃষ্ণা আছে, তবে তা কম। বেসিনের কলের পানি বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি শেষ পানি কখন খেয়েছেন তা মনে করতে পারছেন না। প্রবল ক্লান্তি তাকে ভর করেছে। সময় কাটাচ্ছেন বিছানায় শুয়ে। হেলুসিনেশন শুরু হয়েছে। শুরুটা হলাে ঘড়ি দিয়ে। মিসির আলি হঠাৎ দেখলেন ঘড়ির কাঁটা উল্টোদিকে ঘুরছে ।।
মিসির আলি মনে মনে বললেন, ইন্টারেস্টিং। হাতে কাগজ-কলম থাকলে হেলুসিনেশনের ধাপগুলাে লিখে ফেলতে পারতেন। হাতে কাগজ-কলম নেই।
ঠিক তিনটা বাজার সময় ঘড়ি উল্টোদিকে চলা শুরু করেছিল । এখন বাজছে দু’টা। ঘড়ির কাঁটা কি দ্রুত ঘুরছে ? তিনি বুঝতে পারলেন না।
মিসির আলি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম ভাঙলে দেখেন, তিনি বাইনােকুলার হাতে হােটেলের বারান্দায় বসে আছেন। কাক-দম্পতি দেখছেন। তিনি কি সত্যি হােটেলের বারান্দায় ? নাকি এটিও হেলুসিনেশন? যখন কাক মানুষের মতাে কথা বলতে শুরু করল তখন বুঝলেন এটা হেলুসিনেশন।।
কাক বলল, মানুষের যেমন প্রাইভেসি আছে, আমাদেরও আছে। আপনি সারাক্ষণ বাইনােকুলার ফিট করে রাখছেন, এটা কি ঠিক ? আপনার ওপর কেউ বাইনােকুলার ফিট করে রাখলে আপনার ভালাে লাগত?
মিসির আলি বললেন, না।
কাক বলল, সবারই অনেক প্রাইভেট ব্যাপার আছে। হাগা-মুতা আছে। ঠিক কি না স্যার আপনি বলেন ?
মিসির আলি বললেন, অবশ্যই ঠিক। আমি দুঃখিত। আর বাইনােকুলার ধরব ।
মিসির আলি চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লেন। কতক্ষণ ঘুমালেন তিনি জানেন ।
Read More