দুই মেয়ে এই ধরনের কথা বলেছে যাতে আমার দুই পুত্র আমার উপর রাগ করে আমাকে খুন করে। সমস্যা কি জানেন ? আমার দুই পুত্রের রাগ করার ক্ষমতা নাই। একবার কী হলাে ঘটনা শুনেন। বাড়ির একটা বিড়াল মটরগাড়ির চাকার নিচে পড়ে মারা গেল। আমার দুই পুত্র দানাপানি বন্ধ করে দিল । দুইজনে দুইজনের গলা জড়ায়ে ধরে কাঁদে।
আমি বললাম, বিড়াল তােদের বাপ না মা? বিড়াল মরে গেছে, খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিস ? কানে ধরে পঞ্চাশবার উঠবােস কর, তারপর খেতে বস। তারা দুজনেই বলল, জি আচ্ছা। পঞ্চাশবার কানে ধরে উঠবােস করল, তারপর মল্লিক বিরানি হাউস থেকে দুই প্লেট বিরানি খেয়ে ঘুমাতে গেল, যেন কিছুই হয় নাই। আমি যে কথাগুলি বললাম, সেগুলি কি বিশ্বাস হচ্ছে ?
হচ্ছে।
এখন আপনাকে আসল কথা বলি। এতক্ষণ যা বললাম সবই ফালতু কথা। আসল কথা হচ্ছে, আমি বাবা-মা‘র এক সন্তান। আমার কোনাে যমজ ভাই নাই। আপনি এবং পুলিশ হাজার চেষ্টা করেও কোনাে যমজ ভাইয়ের সন্ধান পাবেন না।
মিসির আলি বললেন, কুয়াতে যে ডেডবডি পাওয়া গেল সেটা তাহলে কার ?
মল্লিক সাহেব হাই তুলতে তুলতে বললেন, খুঁজে বের করেন কার। সিআইডি মিআইডি কী কী যেন আছে, সবে মিলে খুঁজুক। বার করুক ডেডবডি কার। ইন্সপেক্টর রকিব সাহেব যদি প্রমাণ করতে পারেন ডেডবডি আমার যমজ ভাইয়ের, তাহলে আমি উনার পিশাব গ্লাসে ভর্তি করে চুমুক দিয়ে খাব। এক হাজার বার কানে ধরে উঠবােস করব।
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৮
এখন ভাই আমি বিদায় নিব। আপনাকে একটা শেষ কথা বলি। আমার উপর কোনাে রাগ রাখবেন না। আমি আপনাকে আটকাই নাই। বড়কুত্তি আটকায়েছে। সে ভালাে সাজার জন্যে পরদিনই পুলিশকে টেলিফোন করেছে। এমনভাবে করেছে যে, পুলিশ তার কথা পাগলের প্রলাপ ভেবেছে। আমি যখন টের পেলাম ঘরে কেউ আটক আছে তখন থানা থেকে পুলিশ নিয়ে এলাম। রকিব সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেই আমার কথার সত্যতা পাবেন। ভাইসাহেব, ইজাজত দেন। বিদায় নেই। আসসালামু আলায়কুম।
ব্যক্তিগত কথামালায় মিসির আলির সর্বশেষ লেখা
বিষয় : মল্লিক সাহেব পুলিশ ব্যাপক অনুসন্ধান করেও মল্লিক সাহেবের কোনাে যমজ ভাই আছে তা প্রমাণ করতে পারে নি। আমি অনেক চেষ্টা করেও পুলিশকে DNA পরীক্ষায় রাজি করাতে পারি নি । মৃত মানুষ এবং মল্লিক সাহেবের DNA পরীক্ষার ফলাফল তদন্তে সাহায্য করত।
আমার কাছে মনে হচ্ছে, পুলিশ তদন্তের বিষয়েও আগ্রহী । ছক্কা-বক্কাকে পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে। তারা আগের মতােই আছে। দুই ভাই বাচ্চা কোলে নিয়ে ঘুরছে। একসঙ্গে স্নান করছে। সময় পেলেই কানে ধরে উঠবােস করে খাতায় হিসাব জমা করছে। মল্লিক সাহেব নিয়ম করে হােমিও ক্লিনিকে বসছেন। রােগী দেখছেন । সব আগের মতাে চলছে।
মল্লিক পরিবারের রহস্য সমাধানের চেষ্টা আমি করেছি। সমাধান করতে পারি নি। মল্লিক সাহেব সহায়তা করলে হয়তাে কিছু হতাে। তিনি সহযােগিতার ধারে কাছেও নাই । তিনি আমার কাছে যে একেবারেই আসেন না, তা না। মাঝে মধ্যেই আসেন, নানান বিষয়ে কথা বলেন, একটি বিষয় ছাড়া। অবিকল তাঁর মতাে দেখতে যে মানুষটির মৃতদেহ কুয়া থেকে তােলা হলাে সে কে ? তাঁর সঙ্গে মল্লিক সাহেবের সম্পর্ক কী ?
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৮
মাল্টিপল পার্সোনালিটি মনােবিজ্ঞানের স্বীকৃত বিষয়। একজন ভালাে মানুষ এবং একজন মন্দ মানুষ একজনের মধ্যে বিকশিত হতে পারে। ভালাে মানুষ মল্লিক এবং মন্দ মানুষ
মল্লিক—একই ব্যক্তি। এটি মনােবিজ্ঞানে গ্রাহ্য। কিন্তু দু’জন আলাদা দুই মানুষ, যাদের একজনকে খুন করা যায়, তা কী করে হয় ?
আমি চেষ্টা করেছি চম্পা ও পারুলের সঙ্গে কথা বলতে। তারা রাজি হয় নি।
এই দুই মেয়ে মল্লিককে খুন করেছে বলে যে দাবি করছে তা মিথ্যা। অ্যান্টাসি নামে কোনাে ইঁদুর মারা বিষ নেই। অ্যান্টাসি নামটাও হঠাৎ করে তাদের মাথায় এসেছে। অ্যান্টাসিড থেকে ড’ বাদ দিয়ে অ্যান্টাসি। মল্লিক সাহেবের বাড়িতে গােটাচারেক বিড়াল আছে। যে বাড়িতে বিড়াল থাকে
সে বাড়িতে ইঁদুর থাকে না।
আমি একপর্যায়ে জীবিত এবং মৃত মল্লিকের DNA পরীক্ষা নিজ খরচে করতে চেয়েছিলাম, তাও সম্ভব হলাে না। পরীক্ষাটা হয় সিঙ্গাপুরে। যে পরিমাণ অর্থ পরীক্ষার জন্যে প্রয়ােজন, তা আমার ছিল না।
আমি নিজেও মনে হয় মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েছি। প্রায়ই যে ঘরে বন্দি ছিলাম সেই ঘর স্বপ্নে দেখি। স্বপ্নে লাল টেলিফোন বাজতেই থাকে। আমি টেলিফোন ধরতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় একজন বলে—DNA টেস্ট করা হয়েছে। রিপাের্ট লিখে নিন। জীবিত এবং মৃত দু’জনের একই DNA , অর্থাৎ দু’জন একই ব্যক্তি। স্বপ্ন আর কিছুই না, আমার নিজস্ব চিন্তার প্রতিফলন। আমি কি তাহলে ভাবছি, মৃত এবং জীবিত একই মানুষ ? এর মানেই বা কী ?
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৮
আমি মুন হাউস হােটেলের ২১২ নম্বর ঘরে এখনাে আছি। কাক-দম্পতির ওপর লক্ষ রাখছি। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়েছে। কাক-দম্পতির সে-কী আনন্দ! তাদের আনন্দ দেখে মল্লিক পরিবারের জটিলতা ভােলার চেষ্টা করছি । যখন মনে হয় পুরােপুরি ভুলে গেছি, তখনই স্বপ্নে লাল টেলিফোন বেজে ওঠে। কেউ-একজন বলে, জীবিত এবং মৃত মল্লিক একই ব্যক্তি। প্লিজ, টেক নােট।
মিসির আলি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি কিছু খেতে পারেন না। রাতে ঘুমুতেও পারেন না। যখন চোখে ঘুম নেমে আসে, তখনই লাল টেলিফোন বাজতে থাকে।
Read More