তিনি লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসেন।
মিসির আলি তার অসুখের কারণ ধরতে পেরেছেন। মল্লিক পরিবারের রহস্য সমাধানে তার ব্যর্থতা। নিজেকে তিনি বােঝানাের চেষ্টা করেছেন—ব্যর্থতা সফলতারই অংশ। দাবায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নকেও কখনাে কখনাে হার মানতে হয়। যেখানে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদেরই এই অবস্থা, সেখানে তার অবস্থান কোথায়? সাইকোলজির খেলায় তিনি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন না।
অনেক রহস্য তিনি ভেদ করেছেন, আবার অনেক রহস্যেরই কিনারা করতে পারেন নি। তাঁর একটি খাতা আছে যার শিরােনাম ‘অমীমাংসিত রহস্য’। যেসব রহস্যের তিনি কিনারা করতে পারেন নি, তার প্রতিটি সেই খাতায় লেখা আছে। তবে সুযােগ পেলেই তিনি পুরনাে রহস্যের মীমাংসা করতে চেষ্টা করেন।
মিসির আলি নিশ্চিত, তিনি মল্লিক সাহেবের রহস্য নিয়ে অনেক দিন ভাববেন । নিঘুম রজনী কাটাবেন।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তৃতীয় দিনে মিসির আলির সঙ্গে দেখা করতে এল বক্কা। দুই ভাই সবসময় একসঙ্গে চলাফেলা করে ! আজ বক্কা একা।
বক্কা বলল, জসুর কাছে শুনেছি আপনি অসুস্থ। আপনাকে দেখতে এসেছি । আপনার জন্যে চারটা কচি ডাব এনেছি। ডাব বলকারক।
মিসির আলি বললেন, তােমার ভাই কোথায় ?
বক্কা বলল, সে কুয়ার মুখ বন্ধ করছে। কুয়ার মুখ বন্ধ থাকা ভালাে, তাহলে অ্যাকসিডেন্ট হয় না । আমার মা কুয়াতে ডুবে মারা গিয়েছিলেন, এটা কি আপনি জানেন ?
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৯
জানি । আমার মার নাম সুরমা। এটা জানেন ? জানি।
মা’র মনে অনেক কষ্ট ছিল তাে, এইজন্যে তিনি কুয়ায় ঝাঁপ দিয়েছিলেন। অনেক কষ্ট থাকলে কুয়ায় ঝাঁপ দিতে হয়। ঠিক না চাচাজি ?
হ্যা ঠিক। | আমি আর ভাইজান কী ঠিক করেছি জানেন? আমাদের মনে যদি অনেক কষ্ট হয় তাহলে কুয়ায় ঝাঁপ দিব। মনের কষ্ট দূর করার জন্যে বাবাকে মারা ঠিক
বাবা হলাে জন্মদাতা পিতা। চাচাজি, ডাব কেটে দিব ? খাবেন? | এখন খাব না। পরে খাব।
বক্কা বলল, চাচাজি, এখন কাটি? আপনি ডাবের পানি খাবেন। আমি খাব শাঁস।
মিসির আলি বললেন, ঠিক আছে কাটো। ডাব কাটবে কীভাবে? দা লাগবে
বক্কা বলল, দা নিয়ে এসেছি চাচাজি। দা খারাপ জিনিস এইজন্যে রুমের বাইরে রেখেছি। ভালাে করেছি না চাচাজি ?
হ্যা, ভালাে করেছ।
বক্কার ডাব কাটা দেখতে দেখতে মিসির আলি মল্লিক রহস্যের আংশিক সমাধান বের করলেন। এই সমাধানে ডাবের কোনাে ভূমিকা নেই । কিছু মীমাংসা হঠাৎ করেই মাথায় আসে। বেশিরভাগ সময় স্বপ্নে আসে। কেকুলে বেনজিনের স্ট্রাকচার স্বপ্নে পেয়েছিলেন। মেন্ডেলিফ পিরিয়ডিক টেবিল স্বপ্নে পান। মিসির আলিও স্বপ্ন দেখছেন—জীবিত মল্লিক এবং মৃত মল্লিক একই। তাদের DNA তা-ই বলছে।
স্বপ্ন অনেককেই ইশারা দিয়েছে। তাকেও দিচ্ছে । কনশাস মস্তিষ্ক হিসাব নিকাশ করে আনকনশাস মস্তিষ্ককে খবর দিচ্ছে। সেই খবর নিজেকে প্রকাশ করছে স্বপ্নে ।
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৯
স্বপ্নে তিনি লাল টেলিফোন দেখছেন। এই টেলিফোন অবশ্যই তাকে কু দিয়ে সাহায্য করবে।
বক্কা আগ্রহ নিয়ে ডাবের শাঁস খাে
তার চোখ প্রায় বন্ধ। মিসির আলি বললেন, তােমাদের বাসার গেস্টরুমে একটা লাল টেলিফোন আছে না ?
বক্কা হা-সূচক মাথা নাড়ল। এই টেলিফোনের নম্বর জানাে ? বক্কা বলল, এই টেলিফোনের নম্বর শুধু বাবা জানে। আর কেউ জানে না। তােমার বাবা কি ওই ঘরেই থাকেন ?
বক্কা বলল, না। মাঝে মাঝে থাকেন। বাকি সময় ওই ঘর তালাবন্ধ থাকে। তালাবন্ধ থাকে কেন? ওই ঘরে ভূত থাকে, এইজন্যে তালাবন্ধ থাকে । কী রকম ভূত ? বক্কা বলল, চাচাজি, কী রকম ভূত আমি জানি না। আমি কখনাে দেখি নাই। কেউ কি দেখেছে ?
আমার স্ত্রী চম্পা দেখেছে। বড় ভাইজানের স্ত্রীও দেখেছে। চাচাজি, আরও চাইরটা ডাব কিনে নিয়ে আসি ?
আর ডাব দিয়ে কী হবে ?
বক্কা লজ্জিত গলায় বলল, দু’টা মাত্র ডাবে শাঁস হয়েছে। তৃপ্তি করে খেতে পারি নাই।
মিসির আলি বললেন, এখানে ডাব না এনে তুমি বরং ডাব কিনে বাড়িতে চলে যাও। পুরুষ্ট দেখে কেননা, যাতে ভেতরে শাঁস থাকে। তারপর দুই ভাই মিলে খাও ।
বক্কার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন দিশেহারা নাবিক দিশা ফিরে পেয়েছে।
চাচাজি, দা-টা কি নিয়ে যাব, না রেখে যাব ? দা নিয়ে যাওয়াই ভালাে।
বক্কা বিদায় হতেই মিসির আলি কাগজ-কলম নিয়ে বসলেন । একটা লিস্ট করবেন। যাদের সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়া বিশেষ প্রয়ােজন ।
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৯
‘এ মল্লিক কাচ্চি হাউস’-এর ম্যানেজার মবিনুদ্দিন । ইনি শুধু কাচ্চি হাউসের ম্যানেজারই না, মল্লিক সাহেবের ডানহাত। যারা নিজেদের ডানহাত প্রমাণ করে, তাদের কাছে অনেক গােপন তথ্য থাকে। সমস্যা একটাই, এরা মুনিবের প্রতি বিশ্বস্ততার কারণে কোনাে তথ্যই প্রকাশ করে না। মল্লিক সাহেবের মূল বাড়ির দারােয়ান আক্কাস মিয়া। এই লােক দীর্ঘ দিন ধরে দারােয়ানের কাজ করছে। সে নিশ্চয়ই অনেক কিছু জানে।
পুলিশ ইন্সপেক্টর রকিব। তার সাহায্যে ছক্কা-বক্কা গ্রেফতার হওয়ার
পর যে জবানবন্দি দিয়েছিল তার কপি আনতে হবে । ৪. চম্পা-পারুলের মা-বাবার একটা ইন্টারভু দরকার । মল্লিক সাহেবের
বাড়ির ভেতরের খবর নিশ্চয়ই দুই মেয়ে তার বাবা-মাকে বলেছে ।
Read More