হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-২

সময় পাচ্ছেন না কথাটা ঠিক না। তার হাতে কোনাে কাজ নেই। তিনি প্রচুর বই পড়ছেন। বই পড়া কাজের মধ্যে পড়ে না। বই পড়া হলাে বিনােদন । 

যখন নামিবে আঁধার

মিসির আলির ঘুমুতে যাওয়ার কোনাে ঠিকঠিকানা নেই। জসুর আবার এই বিষয়ে ঘড়ি ধরা স্বভাব। রাতের খাবারের পর থেকে সে হাই তুলতে থাকে। হাই তুলতে তুলতে বাড়িওয়ালার বাড়িতে (দোতলায়) টিভি দেখতে যায়। রাত ন’টার দিকে ফিরে এসে চা বানায়। আগে এক কাপ বানাত, এখন বানায় দু কাপ। মিসির আলি যেমন বিছানায় পা ছড়িয়ে খাটের মাথায় হেলান দিয়ে চা খান, সেও তা-ই করে। চা শেষ করে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুম। 

আজও তা-ই হচ্ছে। দু’জনই গম্ভীর ভঙ্গিতে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। মিসির আলি দিনের শেষ সিগারেট ধরিয়েছেন। তাঁর হাতে পপুলার সায়েন্সের একটা বই, নাম–The Other Side of Black Hole। লেখক প্রমাণ করতে চেষ্টা করছেন ব্ল্যাক হােলের ওপাশের জগতটা পুরােটাই অ্যান্টিমেটারে তৈরি। সেখানকার জগৎ অ্যান্টিমেটারের জগৎ।

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-২

এই জগতে যা যা আছে অ্যান্টিমেটারের জগতেও তা-ই আছে। সেই জগতে এই মুহূর্তে একজন মিসির আলি চা খেতে খেতে The other Side of Black Hole বইটা পড়ছে। তার সঙ্গে আছে জসু নামের এক ছেলে। 

মিসির আলি বই নামিয়ে হঠাৎ করেই জসুর দিকে তাকিয়ে বললেন, জসু, তুই একটু বাড়িওয়ালার বাসায় যেতে পারবি ? 

জসু বলল, কী প্রয়ােজন বলেন ? 

মিসির আলি বললেন, খোঁজ নিয়ে আয় এই বাড়ির কেউ অসুস্থ কি না। আমার ধারণা, বাড়ির কেউ অসুস্থ, তাকে অ্যান্টিবায়ােটিক দেওয়া হচ্ছে। অ্যান্টিবায়ােটিকের একটা ডােজ পড়ে রাত তিনটায় । তখন ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়া থাকে । রাত তিনটায় অ্যালার্ম বাজে, তখন সেই শব্দে আমার ঘুম ভাঙে। আমার ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হয়। দশ মিনিট বাড়তি লাগে । 

জসু বলল, বাড়িওয়ালার নাতির নিউমােনিয়া হয়েছে। তার নাম কিসমত । ছক্কা ভাইজানের ছেলে। 

মিসির আলি বললেন, তারপরেও যা। জেনে আয় রাত তিনটায় অ্যালার্ম বাজে কি না। 

জসু বলল, বাদ দেন তাে স্যার। বাজে প্যাচাল। মিসির আলি বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে যা বাদ দিলাম । 

জসু ঘুমুতে গেল। মিসির আলি রাত তিনটা পর্যন্ত জেগে বসে রইলেন। অ্যালার্ম বাজল তিনটা দশ মিনিটে। মিসির আলির ভুরু কুঁচকে গেল। বাড়িওয়ালার ঘড়ি ফাস্ট, নাকি তারটা স্লো—এটা নিয়ে ভাবতে বসলেন। 

মিসির আলির বাড়িওয়ালার নাম আজিজুর রহমান মল্লিক। তিনি পেশায় একজন হােমিওপ্যাথ ডাক্তার। এই বাড়িতেই (একতলা দক্ষিণ দিকে) তাঁর রােগী দেখার চেম্বার। পুরুষ ও মহিলা রােগীদের বসার ব্যবস্থা আলাদা। সিরিয়াস রােগী, যাদের সার্বক্ষণিকভাবে দেখাশােনা করা দরকার, তাদের জন্য একটা ঘরে দুইটা বিছানা পাতা আছে।

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-২

এটা তার হাসপাতাল। হাসপাতালে একজন নার্স আছে। এই ঘরের পাশেই হােমিও ফার্মেসি। রােগীদের এই ফার্মেসি থেকেই ওষুধ কিনতে হয়। বাইরে সব ওষুধই দু নম্বরি । আজিজুর রহমান মল্লিক সব ওষুধ সরাসরি হােমিওপ্যাথের জনক হানিম্যান সাহেবের দেশ জার্মানি থেকে আনান ।। 

বাড়ির সামনে ১০ ফুট বাই ৪ ফুটের বিশাল সাইনবোের্ড । সেখানে লাল, সবুজ এবং কালাে রঙের লেখা। 

সুরমা হােমিও হাসপাতাল 

 ডা. এ মল্লিক এমডি 

গােল্ড মেডেল (ডাবল)

মিসির আলি আজিজ মল্লিক সাহেবের বাড়ির একতলায় উত্তর পাশে গত এক বছর ধরে আছেন। গত এক বছরে তিনি রােগীর কোনাে ভিড় লক্ষ করেন নি । তার ধারণা মানুষজন হােমিওপ্যাথি চিকিৎসার ওপর এখন আর তেমন ভরসা করছে না। 

রােগী না থাকলেও মল্লিক সাহেবের আর্থিক অবস্থা ভালাে। তার ছয়টা সিএনজি বেবিট্যাক্সি আছে, চারটা রিকশা আছে। সম্প্রতি একটা ট্রাক কিনেছেন। আগারগাঁও বাজারে কাচ্চি বিরিয়ানির দোকান আছে। দোকানের নাম ‘এ মল্লিক কাচ্চি হাউস’। কাচ্চি হাউসের বিরিয়ানির নামডাক আছে। সন্ধ্যাবেলা দুই হাঁড়ি কাচ্চি বিরিয়ানি রান্না হয়। রাত আটটার মধ্যে শেষ হয়ে যায় । 

মল্লিক সাহেবের দুই ছেলে। দু’জনেরই বিয়ে হয়েছে। তারা বউ-বাচ্চা নিয়ে বাবার সঙ্গে থাকে। দুজনের কেউ কিছু করে না। তাদের প্রধান কাজ, বাচ্চা কোলে নিয়ে বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করা। বাড়ির সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাওয়া। দুই ভাইয়ের মধ্যে যথেষ্ট আন্তরিকতা। তারা যখন রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে একসঙ্গে করে। চায়ের দোকানে সবসময় পাশাপাশি বসে চা খায় । পরিচিত কাউকে দেখলে দুই ভাই একসঙ্গে মাথা নিচু করে ফেলে। তারা তাদের বাবার ভয়ে যেমন অস্থির থাকে, পরিচিতদের ভয়েও অস্থির থাকে। 

সকাল আটটা। মল্লিক সাহেব মিসির আলির ঘরে বসে আছেন। মল্লিক সাহেবের বয়স ষাটের কাছাকাছি। চেহারা বিশেষত্বহীন। নাকের নিচে পুরুষ্টু গোঁফ আছে । মাথা কামানাে। তার চেহারা, চলাফেরা, কথা বলার ভঙ্গিতে কার্টুনভাব আছে । মল্লিক সাহেবকে আজ অত্যন্ত গম্ভীর দেখাচ্ছে। দ্রুত পা নাচাচ্ছেন।

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-২

তাকে দেখে মনে হচ্ছে, তার ওপর দিয়ে বিরাট ঝড় বয়ে গেছে কিংবা এখনাে যাচ্ছে । মল্লিক সাহেব মানুষটা ছােটখাটো । রাগে ও উত্তেজনায় তিনি আরও ছােট হয়ে গেছেন। তাঁর শােবার ঘর থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা বান্ডেল চুরি গেছে। তার ধারণা টাকাটা দুই ছেলের কোনাে-একজন নিয়েছে। রাগ ও উত্তেজনার প্রধান 

কারণ এইটাই। এই পরিস্থিতিতে কী করা যায়, তিনি তা জানতে এসেছেন। মিসির আলির বিচার-বুদ্ধির ওপর তার আস্থা আছে। 

মিসির আলি সাহেব। জি। ব্যবস্থা করে দেন। কী ব্যবস্থা করব ? 

আমি আমার এই দুই বদপুত্রকে শায়েস্তা করব। এই দুইজনকে ন্যাংটা করে বাড়ির সামনে যে সাইনবাের্ড আছে, সেই সাইনবোের্ডের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখব। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা এই অবস্থায় থাকবে। এটা আমার ফাইনাল ডিসিশান। 

মিসির আলি বললেন, চা খান। একটু চা দিতে বলি ? 

আজিজ মল্লিক বললেন, এই দুই বদকে শিক্ষা না দিয়ে আমি কিছু খাব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখনাে নাশতা খাই নাই । এরা কত বড় বদ চিন্তা করেন— বাপের টাকা চুরি করে ? কোনাে আয় নাই, রােজগার নাই, দুইজনে গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে। বউ-বালবাচ্চা নিয়ে বাপের ঘরে খায়, আবার বাপের টাকা চুরি করে।

Read More

হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৩

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *