হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার শেষ পর্ব

মিসির আলি আপনি বলছেন তদন্ত চলছে—তাহলে মল্লিক সাহেব এখন কোথায় বলতে পারবেন ? যখন নামিবে আঁধাররকিব বলতে পারব। তিনি আগামসি লেনের এক বাড়িতে আছেন। মাঝে মাঝে এই বাড়িতে থাকেন। 

 মিসির আলি আমি যে ঘরে বন্দি ছিলাম, ওই ঘরে একটা লাল টেলিফোন আছে। টেলিফোনের নম্বরটা কি আমাকে জোগাড় করে দিতে পারবেন ? 

রকিব স্যার, আপনার সঙ্গে যদি কাগজ-কলম থাকে তাহলে নম্বরটা লিখুন। মিসির আলি এই নম্বর তাহলে আপনারা জানেন ? 

রকিব কেন জানব না ? বিস্ময়কর একটা ঘটনা ঘটেছে। একই মানুষ একজন জীবিত আরেকজন মৃত। আর আমরা ঠিকমতাে তদন্ত করব না, তা কি হয় ? আপনি দু’জনের DNA টেস্টের কথা বিশেষভাবে বলেছিলেন। আপনি শুনে খুশি হবেন যে, DNA টেস্ট হয়েছে। রেজাল্ট আমাদের কাছে আছে। 

মিসির আলি আমাকে কি DNA টেস্টের রিপাের্টটা দেখানাে যায় না ? 

রকিব (হাসতে হাসতে) আপনি বিখ্যাত মিসির আলি। আপনাকে কেন দেখাব না! ফটোকপি পাঠিয়ে দিচ্ছি । 

যখন নামিবে আঁধার শেষ পর্ব

মিসির আলি : আরেকটা ছােট্ট সাহায্য চাচ্ছি। আমি মল্লিক সাহেবের যে ঘরে বন্দি ছিলাম, সেখানে আরেক রাত থাকতে চাই।। 

রকিব কেন ? 

মিসির আলি আছে একটা বিষয়। তবে আমি ভয় পাচ্ছি, ওরা না আবার আমাকে আটকে ফেলে । 

রকিব আপনি কবে থাকতে চান বলবেন। সব ব্যবস্থা হবে। বাড়ির চারদিকে পুলিশ থাকবে। স্যার, এখন লাল টেলিফোনের নম্বরটা লিখুন। 

মিসির আলি নম্বর নিয়েই টেলিফোন করলেন। চারবার রিং হওয়ার পর তরুণীর গলা শােনা গেল, হ্যালাে কে বলছেন ? 

মিসির আলি বললেন, চম্পা, আমি তােমার চাচাজি। মিসির আলি। তুমি ভালাে আছ ? 

তরুণী জবাব দিল না। তবে সে টেলিফোন নামিয়েও রাখল না ।। 

মিসির আলি বললেন, আগামী কাল রাতে আমি তােমাদের ওই ঘরে থাকব। ব্যবস্থা করতে পারবে ? 

তরুণী জবাব দিল না। 

মিসির আলি বললেন, চম্পা, তুমি যে টেলিফোন কানে ধরে আছ তা আমি জানি। আগামীকাল রাত আটটার দিকে আমি চলে আসব । রাতে কি খাবারের ব্যবস্থা করতে পারবে ? 

তরুণী এইবার কথা বলল। প্রায় ফিসফিস করে বলল, কেন আসতে চাচ্ছেন ? 

মিসির আলি বললেন, স্মৃতি রােমন্থনের জন্যে। মাঝে মাঝে পুরনাে স্মৃতি হাতড়াতে হয়। এটা স্বাস্থ্যের জন্যে ভালাে। 

রাত আটটা। সারা দিন ঝলমলে রােদ ছিল। সন্ধ্যার পর থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মিসির আলি ছাতা মাথায় মল্লিক সাহেবের বাড়িতে এসে উঠেছেন। দেখে মনে হচ্ছে মল্লিক সাহেবের বাড়ি শ্মশানপুরী। কেউ বাস করে না। বিড়ালের মিউ মিউ শব্দ ছাড়া কোনাে শব্দ নেই। মিসির আলি দোতলায় ওঠার সিঁড়ির গােড়ায় দাঁড়িয়ে বললেন, বাড়িতে কেউ আছেন? 

যখন নামিবে আঁধার শেষ পর্ব

কেউ জবাব দিল না । দারােয়ান আক্কাস মিয়াকে এক ঝলক দেখা গেল। সে দ্রুত ঘরে ঢুকে গেল। মিসির আলি দোতলায় উঠে গেলেন। যে ঘরে বন্দি ছিলেন, সেই ঘর খুঁজে বের করতে তার বেগ পেতে হলাে না। মূল দরজা পুলিশ ভেঙেছে। দরজা ঠিক করা হয় নি। মিসির আলি ঘরে ঢুকে দেখেন ঘরের ভেতর কাঠের চেয়ারে মল্লিক সাহেব বসে আছেন। তার হাতে সিগারেটের প্যাকেট । মিসির আলি অবাক হলেন না। মল্লিক সাহেব এখানে থাকবেন, মিসির আলি তা ধরেই নিয়েছিলেন। 

মল্লিক মিসির আলির দিকে না তাকিয়ে বললেন, ছােটকুত্তির কাছে শুনলাম রাতে আপনি খানা খেতে চেয়েছেন। সে আপনার জন্যে খানা পাকিয়েছে। মােরগপােলাও আর খাসির বটি কাবাব। তবে আমার উপদেশ, ছােটকুত্তির রান্না খাবার খাবেন না। খাবারে বিষ মিশিয়ে দিতে পারে । 

মিসির আলিকে দেখে মনে হচ্ছে না তিনি মল্লিক সাহেবের কথা শুনছেন । তিন খাটে বসলেন। পরিচিত খাট। পরিচিত বিছানা। বালিশ-চাদর কিছুই 

বদলানাে হয় নি। তিনি বালিশ নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুকলেন। 

মল্লিক বললেন, আপনার ভাব-ভঙ্গি দেখে মনে হয় কিছু বলতে চান । বলতে চাইলে বলেন। বালিশ কাশুকির প্রয়ােজন নাই। বালিশের মধ্যে হিসটরি’ লেখা নাই।। 

মিসির আলি বললেন, আপনার দুই ছেলে যে দু’জন বাবা দেখত সেই রহস্য ভেদ করেছি। তারা আসলেই ছােটবেলা থেকে দু’জন বাবা দেখত। মল্লিক সাহেব বললেন, আপনাকে অনেকবার বলেছি——আমার কোনাে যমজ ভাই নাই। 

মিসির আলি বললেন, যমজ ভাই না, সে আপনার সৎ ভাই। আপনার বাবা তারও বাবা। DNA টেস্টে তা-ই পাওয়া গেছে । আপনার এই সৎভাইয়ের কোনাে সামাজিক স্বীকৃতি ছিল না। মনে হয় তার জন্ম কাজের মেয়ের গর্ভে। তবে আপনার বাবা তাকে পুরােপুরি বঞ্চিত করেন নি। আগামসি লেনে তাকে একটা বাড়ি কিনে দিয়েছিলেন ।

যখন নামিবে আঁধার শেষ পর্ব

আপনার এই ভাই সত্যিকার অর্থেই ভালাে মানুষ ছিল । সে আপনার দুই ছেলেকে অসম্ভব পছন্দ করত। এই ছেলে দু’টির টানেই সে মাঝে মাঝে গােপনে আপনার বাড়িতে আসত। সে লুকিয়ে থাকত এই ঘরে। আপনি তাকে খুন করেছেন। 

 মল্লিক বললেন, এত কিছু বলেছেন, কীভাবে খুন করেছি সেটাও বলেন। গলা টিপে মেরেছি ? 

 মিসির আলি বললেন, ডাব কাটা হয় এমন দা-এর পেছন দিয়ে তার মাথায় বাড়ি দিয়েছেন। 

মল্লিক অবাক হয়ে বললেন, এটা কীভাবে বললেন ? 

মিসির আলি বললেন, আপনার ছেলে বক্কা এই দা নিয়ে আমাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিল। সে বলেছে—দা খারাপ জিনিস। তার কথা থেকে বুঝেছি । 

মল্লিক বললেন, হারামজাদাটা আমাকে ধরায়ে দিয়েছে। দুই হারামজাদা ভাব ধরে থাকে যে এরা কিছুই বুঝে না। তলে তলে বিরাট বুদ্ধি। মিসির আলি সিগারেট ধরালেন। তৃপ্তির সঙ্গে দুটা টান দিয়ে বললেন, আপনার সম্পর্কে আপনার দুই পুত্রবধূ যা বলে তা ঠিক না। আপনি এই কাজ কখনাে করেন নি। করলে এদের কুত্তি ডাকতেন না। আপনার রুচি নিম্নমুখী কাজের মেয়ে বা আপনার হাসপাতালের নার্সে সীমাবদ্ধ। 

মল্লিক সাহেব বললেন, নার্স হারামজাদিও মুখ খুলেছে। আফসােস। বিরাট আফসােস। আপনি এত কিছু বের করে ফেলেছেন। এখন বলেন, আমার স্ত্রী সুরমাকে কে মেরেছে ? আমি ? 

যখন নামিবে আঁধার শেষ পর্ব

মিসির আলি বললেন, আপনি না। আপনার স্ত্রী নিজেই কুয়াতে ঝাঁপ দিয়েছেন। আমার ধারণা, আপনার পুত্রবধূরা আপনার বিষয়ে তার কানে কথা তুলেছে। তিনি এই দুঃখ নিতে পারেন নি। 

মল্লিক আনন্দিত গলায় বললেন, আপনার বিরাট বুদ্ধি। কিন্তু আপনিও শেষ পর্যন্ত ধরা খেয়েছেন। আমার স্ত্রীকে আমিই মেরেছি। সে স্বেচ্ছায় কুয়াতে ঝাঁপ দেয় নাই। কেন মেরেছি, সেটা একটা ইতিহাস। আপনাকে বলার প্রয়ােজন নাই । খানা কি দিতে বলব ? খানা খাবেন ? 

মিসির আলি হাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন। মল্লিক সাহেব বললেন, আপনাকে দেখে কখনাে বুঝি নাই একজন চিকন-চাকন মানুষের পেটে এত বুদ্ধি। জানলে কোনােদিন বাড়ি ভাড়া দিতাম না। লাথি দিয়ে বের করতাম। 

 মল্লিক কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে শান্ত গলায় বললেন, ছােটকুত্তি, আমাদের খানা দাও। পুলিশ আজ রাতেই আমাকে থানায় নিয়ে যাবে । বাড়ির চারদিকে পুলিশ। খালি পেটে থানায় যাওয়া ঠিক না। 

বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়াে হাওয়া। চম্পা খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকেছে। আজ তার সারা শরীর বােরকায় ঢাকা না। অতি রূপবতী এই মেয়েকে দেখে মিসির আলি মুগ্ধ হলেন। তাঁর কাছে মনে হলাে, হেলেন অব ট্রয়, ক্লিওপেট্রা কিংবা কুইন অব সেবা কখনােই দুইবােন চম্পা-পারুলের চেয়ে রূপবতী না। বাঙালি প্রাচীন কবির মতাে মিসির আলি মনে মনে আওড়ালেন— 

‘কে বলে শারদ শশি সে মুখের তুলা পদনখে পড়ে আছে তার কতগুলা। 

 

Read More

হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *