হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৩

আপনি কি নিশ্চিত যে, এরাই টাকা চুরি করেছে ? অবশ্যই। কাগজ কলম আনেন লিখে দেই । চুরিটা কে করেছে ? বড়জন, না ছােটজন ? 

দুই ভাই একসঙ্গে মিলে করেছে। এরা যা করে একসঙ্গে করে। এখন শাস্তিও একসঙ্গে হবে। থাক ন্যাংটা হয়ে । | মিসির আলি বিনীতভাবে বললেন, ভাই সাহেব, এক কাপ চা আমার সঙ্গে খান। জসু খুব ভালাে রং চা বানায়।

যখন নামিবে আঁধার 

আপনাকে তাে একবার বললাম, দুই কুসন্তানকে শাস্তি না দিয়ে আমি কিছু খাব না। এক জিনিস বারবার কেন পঁাচাচ্ছেন ? 

সরি । 

ইংরেজি এক কথা সবাই শিখেছে ‘সরি’ । সরি দিয়ে কী হয় ? সরি বলে কিছু নাই । পাপ করবে পানিশমেন্ট হবে । সরি আবার কী ? 

মল্লিক সাহেব পুত্রদের সন্ধানে বের হয়ে গেলেন। তাদের কাউকে পাওয়া গেল না। এরা সকালবেলাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। দোতলা থেকে মেয়েদের 

কান্নার শব্দ আসতে লাগল । নিশ্চয়ই ছেলেদের দুই বউ কাঁদছে। জসু এসে খবর দিল—মল্লিক সাহেব ছেলের বউদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছেন বলেই কান্নাকাটি শুরু হয়েছে। 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৩

 দুপুরের মধ্যে বাড়ি খালি হয়ে গেল। ছেলের বউরা কাঁদতে কাঁদতে বাচ্চাদের নিয়ে চলে গেল । তাদের পেছনে পেছনে গেলেন মল্লিক সাহেবের স্ত্রী (দ্বিতীয়জন, প্রথমজন মারা গেছেন), তাঁর কাজের দুই মেয়ে। মল্লিক সাহেব উঠানে দাঁড়িয়ে চেঁচাতে লাগলেন, যারা গেছে তারা যদি ফিরে আসতে চায় তাহলে তাদের এই উঠানে দশবার করে কান ধরে উঠবােস করতে হবে। কান ধরে উঠবােস, তারপর বাড়িতে ঢােকার টিকিট। আমি এ মল্লিক। আমার কথাই এ বাড়িতে আইন। 

মিসির আলি চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় এসে এ মল্লিক পরিবারের সদস্যদের বিদায়-দৃশ্য দেখছেন। এই দৃশ্য তাঁর কাছে নতুন না। আগেও দুবার দেখেছেন। 

রাত দশটা। জসু ঘুমিয়ে পড়েছে। সদর দরজা লাগাতে ভুলে গেছে। দরজা খােলা। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, খােলা দরজা দিয়ে বৃষ্টির ছাট আসছে। বৃষ্টিকণিকা নিয়ে ঠান্ডা বাতাসের আগমন’ এই বাক্যটা মিসির আলির মাথায় ঘুরছে। মাঝে মাঝে গানের কলি মাথায় ঢুকে যায়। সারাক্ষণ বাজতে থাকে। এই বাক্যটাও সেরকম। মিসির আলি বাক্যটা মাথা থেকে দূর করতে চাচ্ছেন । অ্যান্টিমেটারের জগৎ নিয়ে লেখা বইটা পড়বেন। মাথা ঠান্ডা রাখা প্রয়ােজন। কোনাে একটা বাক্য মাথার ভেতর ঘুরলে মাথা ঠান্ডা থাকে কীভাবে ? 

মিসির আলি সাহেব, জেগে আছেন ? মল্লিক সাহেবের গলা। মিসির আলি বললেন, জেগে আছি। 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৩

আপনার দরজা খােলা। আমি ভাবলাম দরজা খােলা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। আপনি আজিব আদমি । আপনার পক্ষে সবই সম্ভব। 

মল্লিক সাহেব! ভেতরে আসুন। | ভেতরে আসব না। দরজা বন্ধ করুন, আমি চলে যাব । দরজা খােলা রেখে ঘুমানাে ঠিক না। চোর এসে সাফা করে দিয়ে যাবে। ভালাে কথা, আপনার কাজের ছেলে জসু কি জেগে আছে? 

জি-না। কেন বলুন তাে ? একা ভয় ভয় লাগছে। সে জেগে থাকলে তাকে নিয়ে যেতাম। 

বলতে বলতে মল্লিক সাহেব ঘরে ঢুকলেন। মিসির আলির বিছানার পাশে রাখা কাঠের চেয়ারে বসলেন। 

মিসির আলি বললেন, চা খাবেন ? একটু চা করি । 

চা খাওয়া যায়। 

মিসির আলি বিছানা থেকে নামলেন। মল্লিক সাহেব বললেন, আপনি কেন যাচ্ছেন ? জসুকে পাঠান। 

বেচারা আরাম করে ঘুমাচ্ছে । 

মুনিবের প্রয়ােজন আগে, তারপর নফরের ঘুম। পাছায় লাথি দিয়ে এর ঘুম ভাঙান । 

মিসির আলি কিছু না বলে রান্নাঘরে ঢুকলেন। একবার ভাবলেন বলেন, মনিব-নফরের বিষয়টা ঠিক না। অল্পদিনের জন্যে আমরা এই পৃথিবীতে এসেছি। এখানে আমরা সবাই নফর । মুনিব কেউ না। যদিও রবীন্দ্রনাথ ভিন্ন কথা বলেছেন। তাঁর ধারণা, আমরা সবাই রাজা। কিছুই বলা হলাে না। উচ্চমার্গের কথা মল্লিক সাহেবের সঙ্গে বলা অর্থহীন। মল্লিক সাহেবের অবস্থান নিম্নমার্গে। 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৩

মল্লিক সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, চা ভালাে বানিয়েছেন। বাংলাদেশ চায়ের দেশ। এখানে কেউ চা বানাতে পারে না। সবাই বানায় পিশাব । দিনে আট-দশ কাপ পিশাব খাই। 

আপনার নাতির খবর কী? কোন নাতি ? নাতি তাে একটা না, এক হালি । আমি তাে জানতাম দুই ভাইয়ের দুই ছেলে । 

ভুল জানতেন। এরা দুই ছেলে কোলে নিয়ে ঘুরে, মেয়ে দুইটা ঘরে থাকে। এখন বলেন কোনটার কথা জানতে চান ? 

যার নিউমােনিয়া হয়েছিল । 

ও আচ্ছা, কিসমতের কথা জানতে চান ? আমি কোনাে খবর জানি না। বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর আর খোঁজ নেই নাই। 

ওরা টেলিফোন করে নাই ? আমাকে কি টেলিফোন করার সাহস এদের আছে ? আমার গলার শব্দ শুনলে পিশাব করে দেয়, এমন অবস্থা । 

বলেন কী ? 

এইটা আমরা বংশপরম্পরায় পেয়েছি। আমার বাবার খড়মের শব্দ শুনলেও আমি দৌড়ে পালাতাম। দুই একবার প্যান্টে ‘ইয়েও করেছি। 

মিসির আলি বললেন, আপনার ছেলে দুটা মনে হয় সেরকম হবে না। তারা সারাক্ষণই বাচ্চাদের কোলে নিয়ে থাকে । 

এই দুই গাধার কথা তুলবেন না। এদের নাম শুনলে মাথায় রক্ত উঠে যায় । মিসির আলি বললেন, আপনার ছেলে দুটার নাম কি আপনার দেওয়া ? 

আর কে দেবে ? নাম ভালাে দিয়েছি না ? একজন ছক্কা আরেকজন বক্কা। ছক্কা বড়, বক্কা ছােট। 

মিসির আলি বললেন, নাম দেওয়া থেকেই বােঝা যায় আপনার ছেলে দু’জনের জন্যে মমতা নাই । 

 

Read More

হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৪

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *