হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১৩)

বারসাতের আসতে দেরি দেখে তিন বেহালাবাদকের মধ্যে দুজন বারান্দার সােফায় লম্বা হয়ে ঘুমিয়ে পড়লএকজন জেগে রইল। সেই একজন বারসাতকে একা ঢুকতে দেখে খানিকটা বেদিশা হয়ে গেলতারপরেও সে বেহালা হাতে নিলবাজাব নাকি বাজাব না ভঙ্গিতে তাকালবারসাত বলল, লাগবে না। বেহালা বাজানাের দরকার নেই

রোদনভরা এ বসন্তবেহালাবাদক বলল, আপনার কী হয়েছে? চোখ টকটকা লাল। 

বারসাত বলল, আমার কিছু হয় নাই, চোখে লাল রঙ মেখেছিমেয়েরা ঠোটে লিপস্টিক দেয়আমি ঠোটে দিয়েছি আই স্টিক। আপনাদের তাে টাকাপয়সা আগেই দিয়ে রেখেছি এখন বাড়ি চলে যানবিদায়। 

বাজনা বাজাব

বাজনা বাজাতে হবে না। বাজনার দরকার ছিল আমার স্ত্রীর জন্যেস্ত্রী নাই, বাজনাও নাই । 

উনি কোথায়? জানি না উনি কোথায়আপনারা বিদায় হন। টা টা বাই বাইভাই সাব আপনার কি জ্বর? আপনি তাে দাঁড়ায়ে থাকতে পারতেছেন | বারসাত বলল, দাঁড়িয়ে থাকতে না পারলেও কোনাে সমস্যা নেই। আমি এক্ষুনি বিছানায় শুয়ে পড়বএক মাস ঘুমাব গিনিস বুক অব রেকর্ডে নাম তুলে ফেলবএকবিংশ শতাব্দীর রিপ ভ্যান উইংকেল। 

বারসাত কতক্ষণ ঘুমুচ্ছে বা কতক্ষণ ঘােরের মধ্যে আছে তা সে জানে তার কাছে মনে হচ্ছে সে বেশির ভাগ সময় অচেতন অবস্থাতেই 

থাকেমাঝে মাঝে সামান্য চেতনার মতাে আসে তখন পদ্মনামের বাগানবাড়ির কেয়ারটেকারের সঙ্গে তার কিছু কথাবার্তা হয় কেয়ারটেকারের নাম রফিকরফিকের চেহারা বারসাতের কাছে একেক সময় একেক রকম মনে হয়প্রবল জ্বরের কারণেই এরকম হচ্ছে এটা বারসাত বুঝতে পারছেমেয়েরা সাজগােছ করে চেহারা বদলায়ছেলেদের চেহারা বদলায় নারফিকের চেহারা একেক সময় একেক রকম দেখানাের আর কোনাে কারণই নেই। জ্বর বারসাতের মাথা এলােমেলাে করে দিচ্ছে। 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১৩)

জ্বর খুব যখন বাড়ছে তখন আরেকটা ব্যাপার হচ্ছেমাথার ভেতর ঝিঝি পােকার ডাক শােনা যাচ্ছেএক পর্যায়ে ঝিঝি পােকার ডাকটা বেহালার শব্দের মতাে হয়ে যাচ্ছেমনে হচ্ছে তিন বেহালাবাদক বাজাচ্ছে— 

লীলাবালী লীলাবালী বড় যুবতী কন্যা কি দিয়া সাজাইতাম তরে। 

ভঙ্গিতে বারসাতের খাটের পাশে এসে দাঁড়াল। থমথমে গলায় বলল, স্যার। আমি আপনেরে দুইটা কথা বলব মন দিয়া শুনেন। 

বারসাত বলল, তােমার কথা আমি মন দিয়েই শুনি রফিকমীরুর কথা যতটা মন দিয়ে শুনি ততটা মন দিয়ে হয়তাে শুনি নাসেটা সম্ভবও 

তারপরেও... | স্যার আপনি কথা কইয়েন না। আমি কী বলতেছি শুনেনআপনার আল্লাহর দোহাই লাগে । 

বল শুনছি। 

আপনের শরীর খুবই খারাপআপনারে এইখানে রাখতে কোনাে ভরসা পাই নাআপনের এইখানে মৃত্যু হলে আমরা বিরাট বিপদে পড়ব । 

বিপদের কী আছে? মানুষের মৃত্যু হয় না? মৃত্যু হলে এখানে কবর দিয়ে দিবেকিংবা আমাকে ইটসহ বস্তায় ভরে পদ্ম পুকুরে ফেলে দেবে কোনাে সমস্যা নাই। 

স্যার শুনেন, উল্টাপাল্টা কথা বলে লাভ নাইআজ সন্ধ্যায় আমি টেম্পাে ভাড়া করে আনতেছি। আমি আপনারে নিজে ঢাকায় দিয়ে আসব। 

রফিক এখন তুমি আমার কথা মন দিয়ে শােনাে আমার শরীরের যে অবস্থা– পথেই মারা যাব তখন তুমি বিরাট বিপদে পড়বেপুলিশ তােমাকে ধরে নিয়ে যাবেতােমার সঙ্গে নিরীহ বেবিটেক্সিওয়ালাকে ধরে নিয়ে যাবেহেভি পাদানি দেবেপুলিশের পাদানি খেয়েছ কখনাে? মারাত্মক জিনিস। 

স্যার আপনি ঢাকার বাড়ির আত্মীয়স্বজনের ঠিকানা দেন। আমি তাদের নিয়া আসি। 

তােমাকে এইসব কিছু করতে হবে নাআমি শরীরে বল পাওয়া শুরু করেছিএকদুই দিনের ভেতর উঠে বসবতখন তুমি একটা বেবিটেক্সি ডেকে আনবে। আমি বেবিটেক্সিতে উঠে ফুড়ুৎ করে চলে যাবআমার সঙ্গে তােমাকে আসতে হবে নাকাজেই পথে যদি মারা যাই তােমাকে কেউ ধরবে না। বেবিটেক্সিওয়ালাকে ধরবে।। স্যার আপনি এত কথা বলতেছেন কেন

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১৩)

শরীর যে ঠিক হতে শুরু করেছে এটা তােমাকে বােঝানাের জন্যে এত কথা বলছি। এখন তুমি দয়া করে পেঁপের পিরিচটা সামনে থেকে নাও। 

বারসাত ডাকল, রফিক রফিক। 

রফিক প্লেটে করে কাটা পেঁপে নিয়ে ঢুকলযে কোনাে খাদ্যদ্রব্য দেখলেই বারসাতের সমস্ত শরীর মােচড় দিয়ে ওঠেইচ্ছা করে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যে ঢুকেছে তার গায়ে বমি করে ভাসিয়ে দেয়এবারাে একই ঘটনা ঘটলবারসাত নিজেকে সামলে নিয়ে অনেক কষ্টে প্রায় আদুরে গলায় বলল, কেমন আছ রফিক

রফিক হড়বড় করে বলল, আমি তাে ভালােই আছি। আফনের অবস্থাটা কী কন দেহি। 

আমিও ভালােই আছি শুধু এই মাছি দুটা খুব বিরক্ত করছেমাছি দুটা মারতে পারলে একশ’ টাকা বকশিশ পাবেবড় মাছিটা মারতে পারলে পাবে সত্তর টাকা আর ছােটটা মারতে পারলে ত্রিশদেখ তাে মারতে পার কি না। 

একশটাকা বকশিশ রফিককে কাবু করতে পারল নাসে পেঁপের প্লেট বিছানার পাশের টেবিলে রাখলকঠিন কোনাে কথা বলবে এর রকম 

তােমাকে তাে বলেছি আমার সামনে কোনাে খাদ্যদ্রব্য আনবে নাআমি বাতাস খেয়ে বাঁচব

 

Read more

হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১৪)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *