হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১৯)

না ।। জিনিসটা দেখেছেন? দেখি নাইআমি কি প্রমাণ করতে পেরেছি যে আপনি মিথ্যাবাদী

ইসমাইল হােসেন পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকলেন, মীরু চলে গেল ছাদেতার অসহ্য লাগছেকিছুদিনের জন্যে ঢাকার বাইরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছা করছে

রোদনভরা এ বসন্তবাগানে নানা জাতের অর্কিড ছে, গােলাপ আছে আর আছে বাগানবিলাস। ছাদের এই বাগানে ঢুকলেই মীরুর মাথা যেন কেমন কেমন করে। 

শরফুদ্দিন সাহেব এই বাগানের ছাদে কাউকে আসতে দেন নাশুধু মীরুকে ছাদে আসার একটা চাবি দিয়েছেনপ্রতিদিন এক মিনিটের জন্যে হলেও মীরু একবার ছাদে আসেছাদটার নাম সে দিয়েছে অক্সিজেন সেন্টারঅক্সিজেন সেন্টারে তার নিজের একটা আলাদা জায়গা আছে সেখানে রট আয়রনের একটা মাঝারি আকৃতির সােফা সে নিজে কিনে এনে বসিয়েছেসােফাটা নীল অপরাজিতার ঝােপের আড়ালে এমন ভাবে রাখা যে সােফায় বসে থাকলে কেউ চট করে তাকে দেখবে নাঅথচ সে অপরাজিতার পাতার ফাঁক দিয়ে সবাইকে দেখতে পাবে। 

 মীরু ছাদে এলে সােফায় মাথা রেখে শুয়ে থাকে। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, এই সােফায় মাথা রাখা মাত্রই তার প্রচণ্ড ঘুম পায়মীরুর ধারণা নীল অপরাজিতা গাছ থেকে কড়া কোন ঘুমের ওষুধ বাতাসে ভেসে আসে। 

সুলতানা মীরুর খোঁজে ছাদে এসেছেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন, আশ্চর্য কাণ্ড, তুই কি ঘুমাচ্ছিস নাকি

মীরু বলল, হ্যাবাসায় হুলস্থুল ঝামেলা বাধিয়ে তুই ছাদে ঘুমাচ্ছিসআশ্চর্য! তাের কাণ্ডকারখানা বােঝা মুশকিল। 

বাসায় হুলস্থুল ঝামেলা? | তুই ভাইজানকে কি বলেছিস কে জানেভাইজান কান্নাকাটি করছেনভাবীর সঙ্গে করেছেন ঝগড়াভাবী রাগ করে তার ভাই-এর বাসায় চলে গেছেনবলে গেছেন আর কোনােদিন আসবেন নাকিছুক্ষণ আগে ডাক্তার ডেকে এনে ভাইজানের প্রেসার মাপা হল

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১৯) 

প্রেসার নিশ্চয়ই নরম্যাল ছিলছিল না? হা প্রেসার নরম্যালতুই কি করে বুঝলি? বাবার বেশির ভাগ কর্মকাণ্ডই ভাননিজের বাবা সম্পর্কে এ ধরনের কথা বলা কি ভাল? 

নিজের কথা সম্পর্কে কেউ বলার চেয়ে নিজের বাবা সম্পর্কে কথা বলাই কি ভাল না? 

বাড়ির ছাদটা খুবই সুন্দরবাড়িওয়ালা শরফুদ্দিন সাহেবের গাছের শখ আছেছাদে তিনি অস্বাভাবিক সুন্দর একটা বাগান তৈরি করেছেন। 

বাকি চারজন কে? 

বাকি চারজন কে আমি জিজ্ঞেস করিনি। বাকি চারজনকে দিয়ে আমার দরকার নেইপাঁচজনের মধ্যে তুই আছিস এটাই বড় কথা। 

মীরু বলল, নাসের সাহেব আমার বিষয়ে সব গল্প কি করেছেন? আমি যে তাকে নিয়ে বারসাত নামের এক লােককে খুঁজছিলাম সেই গল্প বলেছেন

তােবারসাতটা কে? ঐ যে ছবি আঁকনেওয়ালা

তাের সঙ্গে যুক্তি-তর্কে যাব নাযুক্তি-তর্ক আমি পারি নাআমি ভাইজানকে ঠিক করে ফেলেছিউনি এখন নরম্যাল। তাের দায়িত্ব হচ্ছে ভাবীকে নরম্যাল করে বাসায় নিয়ে আসা। 

ঠিক আছে নিয়ে আসবতুমি বস তাে আমার পাশে। 

সুলতানা বসলেনমীরু বলল, তােমাকে দিয়ে আমি একটা ছােট্ট এক্সপেরিমেন্ট করতে চাই। 

কি এক্সপেরিমেন্ট

তুমি চোখ বন্ধ করে এই সােফায় কিছুক্ষণ শুয়ে থাকবেআমি দেখতে চাই তােমার ঘুম আসে কি না। আমি এই সােফাটার নাম দিয়েছি ঘুম সােফাএখানে মাথা রেখে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলেই ঘুম পায়। 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১৯) 

তাহলে এক কাজ কর সােফাটা আমাকে দিয়ে দেআমি বাসায় নিয়ে যাইআমার রাতে এক্কেবারেই ঘুম হয় না। এখন থেকে ঘুম সােফায় 

শুয়ে ঘুমুব। 

মীরু বলল, ফুপু সােফা দেয়া যাবে না। সােফা এখানে থাকবে । ঘুমাতে চাইলে তােমাকে আমাদের বাড়ির ছাদে এসে ঘুমাতে হবেএত কথা বলে লাভ নেইশুয়ে পড়। 

সুলতানা বাধ্য মেয়ের মত শুয়ে পড়লেন। মীরু বলল, চোখ বন্ধ কর। 

সুলতানা চোখ বন্ধ করলেনমীরু বলল, আমি এখন চলে যাচ্ছিতুমি চোখ বন্ধ করে থাকআমি পনেরাে মিনিট পরে এসে খোজ নেব ঘুম এসেছে কি না । 

সুলতানা খপ করে মীরুর হাত ধরে বললেন, তুই পাগল হয়েছিস আমি একা একা ছাদে বসে থাকব? ভয়েই মরে যাবতুই যা করতে বলবি আমি করব কিন্তু তােকে আমার পাশে বসে থাকতে হবেআমি এই লােহার সােফায় মাথা রেখে ঘুমুতে পারব নাতাের কোলে মাথা রেখে ঘুমাবতুই আমার চুলে হাত বুলিয়ে দে। 

সুলতানা মীরুর কোলে মাথা রাখলেনমীরু ফুপুর চুলে হাত বুলাতে লাগলসুলতানা ঘুম ঘুম গলায় বললেন, নাসের তাের খুব প্রশংসা করছিলতার ধারণা তুই হচ্ছিস তার দেখা পাঁচজন শ্রেষ্ঠ মানুষের একজন। 

প্রাইভেট টিউশনি করে জীবন চালায়? হা। 

এইসব পরজীবী, প্যারাসাইট টাইপ মানুষের নাম মনেও করবি না। এই শ্রেণীর মানুষ গল্প করার জন্য বা সঙ্গে নিয়ে ঘুরার জন্যে খুব ভালস্বামী হিসেবে এরা ভয়ংকর খারাপ । 

কেন খারাপ? এরা অপদার্থ এই জন্যে খারাপতােমার কথা জড়িয়ে যাচ্ছেফুপু তােমার কি ঘুম পাচ্ছে

 শাড়িটা আমার মুখের ওপর দিয়ে দে। আমি কিছুক্ষণ ঘুমাব । 

মীরু ফুপুর মাথার ওপর শাড়ি দিয়ে দিলসুলতানা জড়ানাে গলায় বললেন, তুই কি নাসেরকে বিয়ে করবি? হ্যা বলার দরকার নেই। চুপ করে থাকলেই বুঝব তাের অমত নেই। 

ফুপু ঘুমাওতাহলে তাের মত আছে? আলহামদুলিল্লাহ। 

 

Read more

হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২০)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *