না ।। জিনিসটা দেখেছেন? দেখি নাই। আমি কি প্রমাণ করতে পেরেছি যে আপনি মিথ্যাবাদী?
ইসমাইল হােসেন পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকলেন, মীরু চলে গেল ছাদে। তার অসহ্য লাগছে। কিছুদিনের জন্যে ঢাকার বাইরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছা করছে।
বাগানে নানা জাতের অর্কিড আছে, গােলাপ আছে আর আছে বাগানবিলাস। ছাদের এই বাগানে ঢুকলেই মীরুর মাথা যেন কেমন কেমন করে।
শরফুদ্দিন সাহেব এই বাগানের ছাদে কাউকে আসতে দেন না। শুধু মীরুকে ছাদে আসার একটা চাবি দিয়েছেন। প্রতিদিন এক মিনিটের জন্যে হলেও মীরু একবার ছাদে আসে। ছাদটার নাম সে দিয়েছে অক্সিজেন সেন্টার। অক্সিজেন সেন্টারে তার নিজের একটা আলাদা জায়গা আছে । সেখানে রট আয়রনের একটা মাঝারি আকৃতির সােফা সে নিজে কিনে এনে বসিয়েছে। সােফাটা নীল অপরাজিতার ঝােপের আড়ালে এমন ভাবে রাখা যে সােফায় বসে থাকলে কেউ চট করে তাকে দেখবে না। অথচ সে অপরাজিতার পাতার ফাঁক দিয়ে সবাইকে দেখতে পাবে।
মীরু ছাদে এলে সােফায় মাথা রেখে শুয়ে থাকে। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, এই সােফায় মাথা রাখা মাত্রই তার প্রচণ্ড ঘুম পায়। মীরুর ধারণা নীল অপরাজিতা গাছ থেকে কড়া কোন ঘুমের ওষুধ বাতাসে ভেসে আসে।
সুলতানা মীরুর খোঁজে ছাদে এসেছেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন, আশ্চর্য কাণ্ড, তুই কি ঘুমাচ্ছিস না–কি?
মীরু বলল, হ্যা। বাসায় হুলস্থুল ঝামেলা বাধিয়ে তুই ছাদে ঘুমাচ্ছিস। আশ্চর্য! তাের কাণ্ডকারখানা বােঝা মুশকিল।
বাসায় হুলস্থুল ঝামেলা? | তুই ভাইজানকে কি বলেছিস কে জানে। ভাইজান কান্নাকাটি করছেন। ভাবীর সঙ্গে করেছেন ঝগড়া। ভাবী রাগ করে তার ভাই-এর বাসায় চলে গেছেন। বলে গেছেন আর কোনােদিন আসবেন না। কিছুক্ষণ আগে ডাক্তার ডেকে এনে ভাইজানের প্রেসার মাপা হল ।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১৯)
প্রেসার নিশ্চয়ই নরম্যাল ছিল। ছিল না? হা প্রেসার নরম্যাল। তুই কি করে বুঝলি? বাবার বেশির ভাগ কর্মকাণ্ডই ভান। নিজের বাবা সম্পর্কে এ ধরনের কথা বলা কি ভাল?
নিজের কথা সম্পর্কে কেউ বলার চেয়ে নিজের বাবা সম্পর্কে কথা বলাই কি ভাল না?
এ বাড়ির ছাদটা খুবই সুন্দর। বাড়িওয়ালা শরফুদ্দিন সাহেবের গাছের শখ আছে। ছাদে তিনি অস্বাভাবিক সুন্দর একটা বাগান তৈরি করেছেন।
বাকি চারজন কে?
বাকি চারজন কে আমি জিজ্ঞেস করিনি। বাকি চারজনকে দিয়ে আমার দরকার নেই। পাঁচজনের মধ্যে তুই আছিস এটাই বড় কথা।
মীরু বলল, নাসের সাহেব আমার বিষয়ে সব গল্প কি করেছেন? আমি যে তাকে নিয়ে বারসাত নামের এক লােককে খুঁজছিলাম সেই গল্প বলেছেন?
তাে। বারসাতটা কে? ঐ যে ছবি আঁকনেওয়ালা?
তাের সঙ্গে যুক্তি-তর্কে যাব না। যুক্তি-তর্ক আমি পারি না। আমি ভাইজানকে ঠিক করে ফেলেছি। উনি এখন নরম্যাল। তাের দায়িত্ব হচ্ছে ভাবীকে নরম্যাল করে বাসায় নিয়ে আসা।
ঠিক আছে নিয়ে আসব। তুমি বস তাে আমার পাশে।
সুলতানা বসলেন। মীরু বলল, তােমাকে দিয়ে আমি একটা ছােট্ট এক্সপেরিমেন্ট করতে চাই।
কি এক্সপেরিমেন্ট?
তুমি চোখ বন্ধ করে এই সােফায় কিছুক্ষণ শুয়ে থাকবে। আমি দেখতে চাই তােমার ঘুম আসে কি না। আমি এই সােফাটার নাম দিয়েছি ঘুম সােফা। এখানে মাথা রেখে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলেই ঘুম পায়।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১৯)
তাহলে এক কাজ কর । সােফাটা আমাকে দিয়ে দে। আমি বাসায় নিয়ে যাই। আমার রাতে এক্কেবারেই ঘুম হয় না। এখন থেকে ঘুম সােফায়
শুয়ে ঘুমুব।
মীরু বলল, ফুপু সােফা দেয়া যাবে না। সােফা এখানে থাকবে । ঘুমাতে চাইলে তােমাকে আমাদের বাড়ির ছাদে এসে ঘুমাতে হবে। এত কথা বলে লাভ নেই। শুয়ে পড়।
সুলতানা বাধ্য মেয়ের মত শুয়ে পড়লেন। মীরু বলল, চোখ বন্ধ কর।
সুলতানা চোখ বন্ধ করলেন। মীরু বলল, আমি এখন চলে যাচ্ছি। তুমি চোখ বন্ধ করে থাক। আমি পনেরাে মিনিট পরে এসে খোজ নেব ঘুম এসেছে কি না ।।
সুলতানা খপ করে মীরুর হাত ধরে বললেন, তুই পাগল হয়েছিস আমি একা একা ছাদে বসে থাকব? ভয়েই মরে যাব। তুই যা করতে বলবি আমি করব । কিন্তু তােকে আমার পাশে বসে থাকতে হবে। আমি এই লােহার সােফায় মাথা রেখে ঘুমুতে পারব না। তাের কোলে মাথা রেখে ঘুমাব। তুই আমার চুলে হাত বুলিয়ে দে।
সুলতানা মীরুর কোলে মাথা রাখলেন। মীরু ফুপুর চুলে হাত বুলাতে লাগল। সুলতানা ঘুম ঘুম গলায় বললেন, নাসের তাের খুব প্রশংসা করছিল। তার ধারণা তুই হচ্ছিস তার দেখা পাঁচজন শ্রেষ্ঠ মানুষের একজন।
প্রাইভেট টিউশনি করে জীবন চালায়? হা।।
এইসব পরজীবী, প্যারাসাইট টাইপ মানুষের নাম মনেও করবি না। এই শ্রেণীর মানুষ গল্প করার জন্য বা সঙ্গে নিয়ে ঘুরার জন্যে খুব ভাল। স্বামী হিসেবে এরা ভয়ংকর খারাপ ।
কেন খারাপ? এরা অপদার্থ এই জন্যে খারাপ। তােমার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। ফুপু তােমার কি ঘুম পাচ্ছে?
শাড়িটা আমার মুখের ওপর দিয়ে দে। আমি কিছুক্ষণ ঘুমাব ।
মীরু ফুপুর মাথার ওপর শাড়ি দিয়ে দিল। সুলতানা জড়ানাে গলায় বললেন, তুই কি নাসেরকে বিয়ে করবি? হ্যা বলার দরকার নেই। চুপ করে থাকলেই বুঝব তাের অমত নেই।
ফুপু ঘুমাও। তাহলে তাের মত আছে? আলহামদুলিল্লাহ।
Read more