হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২২)

আমি চাচ্ছি না আপনি আমার ওপর বিরক্ত হন । আপনি বলুন কি করলে আপনার বিরক্তি কমবে? আমি তাই করব। স্পাই কেন লাগিয়ে রেখেছিলাম সেটা বলব? 

মীরু টেলিফোন নামিয়ে রাখল । 

আকাশ কালাে হয়ে আছে। যে কোন মুহূর্তে হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামবে। বৃষ্টি নামার আগেই তাকে বারসাতের মেসে উপস্থিত হতে হবে। সামান্য বৃষ্টিতেই বারসাতের মেসের সামনে পানি জমে যায়। মেসে ঢুকতে হলে নােংরা পানিতে পা ডুবিয়ে ঢুকতে হয়। ঘেন্নার ব্যাপার। সে এখন সুন্দর একটা শাড়ি পরবে। নতুন স্যান্ডেল পরবে। নােংরা পানিতে পা ডুবাতে পারবে না।

রোদনভরা এ বসন্ত খুব সাবধানে কে যেন দরজা খুলছে। ভৌতিক ছবিতে দরজা যেভাবে খােলা হয় অবিকল সেইভাবে। প্রায় নিঃশব্দে। মীরু দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে তার মা। কিছু একটা ঘটেছে- মা’র বয়স মনে হচ্ছে দশ বছর কমে গেছে। তার চেহারায় এবং তাকানাের ভঙ্গিতে খুকি খুকি ভাব।। 

মীরু ঘুমােচ্ছিস? না । বিরাট একটা ঘটনা ঘটেছে। কি ঘটনা? আন্দাজ করতাে কি ঘটনা? 

আন্দাজ খেলা এখন খেলতে পারব না মা। কি ঘটেছে বলতে চাইলে বল। বলতে না চাইলে চলে যাও। 

 জাহেদা ফিসফিস করে বললেন, তাের বাবা রুনিকে ক্ষমা করে দিয়েছে। আমাকে একটু আগে বলেছে, রুনিকে বাড়ি ফিরতে বল। বিরাট ঘটনা না?  

হঁ্যাকিন্তু তুমি ফিসফিস করছ কেন? ফিসফিস করার মতাে ঘটনা তাে এটা না । 

জাহেদা মেয়ের পাশে বসলেন। গলার স্বর আরাে নামিয়ে ফেলে বললেন, দুপুরে ভাত খাবার পর তাের বাবা বলল, আমাকে কাঁচা সুপারি দিয়ে একটা পান দাও তাে। কাঁচা সুপারি হার্টের জন্যে ভালঘরে কাঁচা সুপারি ছিল। আমি দিলাম পান বানিয়ে পান খেতে খেতে হঠাৎ বলল, আমি এতদিন হাসপাতালে ছিলাম তােমার বড় মেয়ে কি আমাকে দেখতে গেছে? 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২২)

আমি বললাম, নাতাের বাবা বলল, দেখতে আসেনি কেন? 

আমি বললাম, ভয়ে আসেনিতাকে দেখে তােমার যদি প্রেসার উঠে যায়। এই সময় প্রেসার খুবই ক্ষতিকর। 

তখন তাের বাবা বলল, ওকে আসতে বল। বিছানা বালিশ নিয়ে যেন চলে আসে। অদ্ভুত না? 

 মীরু জবাব দিল নাহাই তুললজাহেদা বললেন, মীরু আমাকে একটা সাজেশান দে। আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসবনা কি টেলিফোনে চলে আসতে বলব। 

যেটা তুমি ভাল মনে কর সেটাই কর। 

আমার কি যে ভাল লাগছেতাের শরীর খারাপ না কি রে মীরু। চোখ-মুখ কেমন শুকনা । 

শরীর খারাপ না। 

জাহেদা আনন্দময় গলায় বললেন, রুনির বাড়ি ফেরার পেছনে তাের সুলতানা ফুপুর একটা ভূমিকা আছেসুলতানার কাছে তাের বাবা শুনলেন যে তুই নাসেরকে বিয়ের ব্যাপারে মত দিয়েছিস। এটা শুনেই তাের বাবার মন ভাল হয়ে গেল তাের বাবা ঠিক করেছে তাের বিয়ে হবে দেশের বাড়িতেঢাকা থেকে বরযাত্রীকে গ্রামে যেতে হবে। তাের বাবা রেল স্টেশনে হাতী রাখবেহাতীতে চড়ে বরযাত্রী যাবে বিয়ে উপলক্ষে মেমানি হবে মেমেনি বুঝিস? মেমানি হল গণখাওয়া। একটা গ্রামের সব মানুষকে যদি দাওয়াত করে খাওয়ানাে হয় তখন তাকে বলা হবে মেমানি। 

মীরু মার দিকে তাকিয়ে আছেমা কি বলছেন তা এখন আর তার মাথায় ঢুকছে নাসে জানালা খুললআকাশ মেঘে মেঘে কালাে হয়ে আছে। যে কোন সময় বৃষ্টি নামবে। 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২২)

জাহেদা বললেন, হাতী দিয়ে বরযাত্রী নেয়ার আইডিয়া তাের কাছে কেমন লাগছে? 

হাস্যকর লাগছেহাস্যকর কেন লাগবে? আমার তাে মনে হয় সবাই পছন্দ করবে। 

বরযাত্রীদের কেউ কেউ হাতী থেকে পিছলে পড়ে ব্যথা পেতে পারে মা।। 

 জাহেদা বিরক্ত গলায় বললেন, অদ্ভুত সব চিন্তা শুধু তাের মাথাতেই আসেহাতী থেকে পিছলে পড়বে কেন

মীরু বলল, পিছলে পড়বে কারণ হাতীতে চড়ে কারাের অভ্যাস নেই। নতুন ধরনের কিছু করতে চাইলে কর তবে এমন কিছু কর যাতে রিস্ক নেইযেমন বরযাত্রীদের ঠেলাগাড়িতে করে নেয়ার ব্যবস্থা কর। 

মীরু চুপ কর। 

মীরু হাই তুলতে তুলতে বলল, মা শােন আমি যদি আমার নিজের পছন্দের কাউকে বিয়ে করি তাহলে বাবা কি করবে? হাতী দিয়ে লাথী দেয়াবে? 

 জাহেদা হেসে ফেললেন মীরু মাঝে মাঝে এমন মজা করে কথা বলে। 

সিকোয়েন্স টু বাগান বাড়িতে পা দিয়েই আমি জ্বরে পড়লাম যাকে বলে উল্টা জ্বর। 

উল্টা জ্বর মানে?  যে জ্বরে পৃথিবী উল্টা হয়ে যায় সেই জ্বরকে বলে উল্টা জ্বরআমার পৃথিবী গেল উল্টা হয়ে তােমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কবিতাগুলি পর্যন্ত আমার মাথায় উল্টা করে আসতে শুরু করেছিল

 

Read more

হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২২)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *