হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৪)

 শালবনে ইউনিভার্সিটি পিকনিক । 

আমার ধারণা ছিল তুমি ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে বের হয়ে গেছ। 

ধারণা ঠিকই আছেপাস করে বের হবার পরেও ল্যাজ আটকে আছেপিকনিক যাবার দাওয়াত পেয়েছিতিনশটাকা চাঁদা দিয়েছিচাঁদার টাকা তােলার জন্যে হলেও পিকনিকে যেতে হবে

রোদনভরা এ বসন্তপঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় তােমার কি জন্যে দরকার

কাজি অফিসের ঝামেলাটা সেরে ফেলার জন্যে দরকার মীরু বলল, পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় এখন দিতে পারি। এখন? 

হ্যা এখনআমি যতদূর জানি কাজি অফিসে টা-পাঁচটা অফিস টাইম বলে কিছু নেইরাতেও সেখানে বিয়ে হয়। 

বারসাত বিস্ময়মাখা গলায় বলল, এখন যাবে? 

মীরু বলল, হ্যা যাব। বিয়ে রেজিষ্ট্রেশনের জন্যে ফী লাগেসেই টাকা কি আছে

বারসাত কিছু বলল না। অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইলযেন তার মধ্যে ঘাের লেগে গেছেমাথায় কিছু ঢুকছে না। 

আমার সই তুমি গেলা কই চিকা চিকা ভুম ভুম ভুম। 

মীরু বলল, তােমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি হঠাৎ গভীর সমুদ্রে পড়েছকোন সমস্যা

বারসাত বিড়বিড় করে বলল, বিয়ের দিন পরব বলে যে পাঞ্জাবি ঠিক করে রেখেছিলাম সেই পাঞ্জাবি কালিয়াকৈরে ফেলে এসেছিএটাই হল সমস্যাগভীর সমুদ্রে পড়ার মতই সমস্যা। 

নতুন পাঞ্জাবি পরাটা কি খুব ইম্পর্টেন্ট

হা ইম্পর্টেন্টআমি গরিব মানুষ তারপরেও আঠারশ টাকা খরচ করে পাঞ্জাবিটা কিনেছিলামবিয়েতে পরব বলে কিনেছিলামবিয়ে তাে আমি তিনচারবার করব না। একবারই করবতুমি হাসছ কেন

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৪)

তুমি সত্যি সত্যি পাঞ্জাবির শােকে কাতর হয়ে পড়েছ এটা দেখে হাসছিআচ্ছা দেখ তাে আমার শাড়িটা কেমন? সুন্দর না? সাদার ওপর লাল সবুজের খেলা। শাড়িটা কি চিনতে পারছ

পারছিএটাই তাে তােমার বিয়ের শাড়ি। হাতার মানে কি দাঁড়ায়? তুমি কি ইচ্ছা করে আজ এই শাড়ি পরে এসেছ

তুমি জানতে আজই কাজি অফিসে যাওয়া হবে

হুঁ। 

মীরু গম্ভীর গলায় বলল, চিকা চিকা ভুম ভুম মানে কি? | বারসাত বলল, কোন মানে নেইএই লাইনটা ফুর্তিরবারসাত হাত পা নেড়ে খুবই মজা করে কবিতা আবৃত্তি করছে। মীরু হাসছে। হাসির বেগ ক্রমেই বাড়ছেসে কিছুক্ষণ হাসি আটকানাের চেষ্টা করলশেষে চেষ্টা বাদ দিল । 

মেসের দুএকজন বাের্ডার উঁকি দিয়ে দেখছেদেখুকমীরু যদি এখন হাসতে হাসতে বারসাতের গায়ের ওপর পড়ে যায় তাহলেও কিছু যায় আসে নাকারণ কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বিয়ে করবেএকজন স্ত্রী স্বামীর কথা শুনে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়বে (স্বামীর ওপরই পড়বেএতে লজ্জার কিছু নেই)। 

মীরু বলল, দেরি করছ কেনচল যাইবারসাত বলল, দুদিন পরে যাওয়া যাক। আজ বাদ থাক। মীরু বলল, আজ বাদ থাকবে কেন? 

বারসাত বলল, তুমি যেমন আগে ঠিক করে রাখা বিয়ের শাড়ি পরে বিয়ে করবে আমিও তাই করবআমার ঠিক করে রাখা পাঞ্জাবিটা পরব।

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৪)

মীরু বলল, পাঞ্জাবিটাই কি একমাত্র কারণ? আমার ধারণা পাঞ্জাবি ছাড়াও অন্য কারণ আছে। 

বারসাত বলল, তােমার ধারণা ঠিক পাঞ্জাবি ছাড়াও আরেকটা কারণ আছেসেই কারণটা তােমাকে বলব না। 

বলবে না কেন? 

যদি বলি তাহলে দেখা যাবে তুমি মত পাল্টে ফেলেছআমাকে বিয়ে করার ব্যাপারে তােমার আগ্রহ কমে গেছে। 

কারণটা বল আমি শুনব। 

দুজন আবারাে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। শুরু হয়েছে তাকিয়ে থাকার খেলা। কেউ আগে চোখ নামাবে না। যে নামাবে সে হেরে যাবে তাকিয়ে থাকা খেলায় কথাও বলা যায় নাযে আগে কথা বলবে সে হেরে যাবে। 

প্রথম হার মানল বারসাত। সে চোখ নামিয়ে নিল এবং কথাও বলল, প্রায় ফিসফিস করে বলল, মীরু তােমাকে নিয়ে আমার মাথার মধ্যে একটা কবিতা তৈরি হয়েছে । 

কি কবিতা

কবিতাও ঠিক নাছড়া। হালকা টাইপ বিষয়শুনলে তুমি হয়তােবা রাগ করবে। 

রাগ করব নাশুনি। 

বলব না । মীরু কঠিন গলায় বলল, অবশ্যই বলবে। তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে আমার কাছে কিছু গােপন করব না। 

বারসাত বলল, আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম বিয়ের পর কেউ কারাের কাছে কিছু গােপন করব না। আমাদের এখনাে বিয়ে হয়নি। আচ্ছা আচ্ছা এত মন খারাপ করতে হবে না বলছি— বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের টাকাটা আমার সঙ্গে নেই। টাকাটা খরচ করে ফেলেছি। ডাক্তার-ফাক্তার ওষুধপত্র। এই টেস্ট, সেই টেস্ট। 

এই সামান্য কথাটা বলতে অস্বস্তি বােধ করছিলে কেন? 

বারসাত বলল, একটা ছেলে বিয়ে করতে যাচ্ছে তার হাতে কোন টাকা-পয়সা নেই এটা কোন সামান্য ব্যাপার না। যাই হােক পরশু আঠারাে তারিখ সকাল এগারােটায় কাজি অফিসে চলে আসবে। 

পরশু? 

 

Read more

হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৫)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *