হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৬)

মীরু স্বপ্নটা আবারাে দেখছেতবে স্বপ্নটা আগের মত নাএকটু মনে হল বদলেছেডায়াসে স্যারকে দেখা যাচ্ছেস্যারের চেহারা শান্ততিনি আঙুল উঁচিয়ে ডাকলেন, এই যে মেয়েউঠে এসােতােমার নামই তাে ‘ঐ? অদ্ভুত এক অক্ষরের নাম— ঐ।

রোদনভরা এ বসন্ত 

স্যার আমার নাম ঐন্দ্রিলা। 

ঐন্দ্রিলার চেয়ে ঐ অনেক সুন্দর নাম। আজ থেকে আমরা সবাই তােমাকে নামে ডাকবঠিক আছে

মীরু কিছু বলার আগেই সব ছাত্রছাত্রীরা একসঙ্গে বলে উঠল, ইয়েস ইয়েসকণ্ঠ ভােটে পাশকণ্ঠ ভােটে পাশ মীরু তাকালাে নিজের দিকেআশ্চর্য কাও, তার গায়ে কাপড় আছেসাদা জমিনে লাল সবুজের খেলাতার বিয়ের শাড়িএটা তাহলে দুঃস্বপ্ন 

এটা আনন্দের স্বপ্নস্যার যদি তাকে এখন বাের্ডে যেতে বলেন সে যাবে। 

হা হ্যালাে! জি স্যার।। তুমি বিয়ের শাড়ি পরে ক্লাসে এসেছ কেন

আজ আমার বিয়ে হয়েছে এই জন্যেই বিয়ের শাড়ি পরে ক্লাসে এসেছি। 

কার সঙ্গে বিয়ে -এর সঙ্গে? ঐ-এর বিয়ে -এর সঙ্গে? 

জি না স্যার । 

ছাত্ররা আবারাে চেঁচিয়ে উঠল, ইয়েস। ইয়েস। কণ্ঠ ভােটে পাস। কণ্ঠ ভােটে পাস । 

স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ঐ তােমাদের বিয়ে কবে হবে

পরশু সকাল এগারােটায় হবে। ছাত্ররা চেঁচিয়ে উঠল, পাস পাস কণ্ঠ ভােটে পাসস্যার বললেন, আমরা সবাই তােমার বিয়েতে যাবআবারাে ডেস্ক চাপড়িয়ে চিৎকার, পাস পাস। কণ্ঠ ভােটে পাস। 

স্বপ্নে প্রচণ্ড হৈচৈ-এ মীরুর ঘুম ভাঙলঘর নিঃশব্দবইয়ের ভাষায় পিনপাতনিক নৈঃশব্দস্বপ্নের ভেতর হৈচৈ হলে স্বপ্ন ভঙ্গের পর দেখা যায় ঘরেও হৈচৈ হচ্ছে। অথচ ঘরে কোনাে শব্দ নেই। 

মীরুর ঘড়ির দিকে তাকালরাত বাজে আটটামাথা ধরেছিল বলে সে দু’টা প্যারাসিটামল খেয়ে শুয়েছিলকখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পারেনিমাথা ধরা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লে ঘুম ভাঙার পরেও মাথা ধরা থাকে। তারবেলা ব্যতিক্রম হয়েছেমাথা ধরা নেইশরীর ফুরফুরে লাগছে। 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৬)

মীরু পাশ ফিরলসে ঠিক করল ঘুম ভাঙলেও সে বিছানা থেকে নামবে নাআরাে কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করবে। নিজের বিছানায় গড়াগড়ি খাওয়ার দিন তার শেষ হয়ে এসেছেতাকে চলে যেতে হবে অন্য কোথাওবারসাত কোথায় নিয়ে তাকে তুলবে কে জানেআত্মীয়-স্বজনের বাসায় নিয়ে তুলবে না এটা বলে দেয়া যাচ্ছেএকদু’দিনের জন্যে বন্ধু বান্ধবের বাসায় স্ত্রীকে নিয়ে ওঠা যায়তারপর? মীরুর ব্যাংকে পনেরাে হাজার চারশটাকা আছেএই টাকাটা নিয়ে কক্সবাজার চলে যাওয়া যায়যুগল জীবনের প্রথম কিছুদিন সমুদ্র দেখে কাটানাে। 

সমুদ্র দেখার পর তারা দেখবে— পাহাড়চলে যাবে রাঙ্গামাটি কিংবা বান্দরবানসমুদ্র এবং পাহাড় দেখার পর যাবে অরণ্যেসুন্দরবনসমুদ্র 

পর্বত ও অরণ্য এই তিন জিনিস দেখার পর শুরু হবে যুগল জীবন… 

মীরু ঘুমাচ্ছিস

মীরু চোখ মেললপাশ ফিরলজাহেদা বানু ঘরে ঢুকেছেনতিনি মনে হয় দরজা বন্ধ করে কেঁদেছেনচোখ লাল হয়ে আছেতিনি মেয়ের পাশে বসলেনমীরু বলল, কোনাে সমস্যা হয়েছে

জাহেদা ক্ষীণ গলায় বললেন, রুনি ব্যাগ স্যুটকেস নিয়ে এসেছিল। তাের বাবা ধমক দিয়ে আবার তাকে ফেরত পাঠিয়েছেন। মেয়েটা হাসিমুখে এসেছিল কাঁদতে কাঁদতে গেছে ।। | মীরু বলল, জগতের এটাই নিয়ম। হাসতে হাসতে যে আসবে তাকে কাঁদতে কাঁদতে বিদায় হতে হবে। একবারই শুধু এর ব্যতিক্রম হয়। মানুষ আসেও কাঁদতে কাঁদতে যায়ও কাদতে কাদতে।

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৬)

কখন? জন্ম-মুত্যুর সময়। জন্মের সময় কাঁদতে কাঁদতে পৃথিবীতে আসে এবং মৃত্যুর সময়ও কাঁদতে কাঁদতে যায়। 

জাহেদা বললেন, কথাটা তাে সুন্দর । 

মীরু বিছানায় উঠে বসতে বসতে বলল, আমার একজন ফিলসফার বন্ধু আছে। এইসব মজার মজার কথা সবই তার কাছ থেকে শেখা। 

জাহেদা আতংকিত গলায় বললেন, ছেলে বন্ধু না তাে? 

মীরু বলল, তুমি ঠিক ধরেছ। ছেলে বন্ধু। এবং আগামী পরশু সকাল এগারােটায় তাকে বিয়ে করছি। তুমি যদি ভাব তােমার সঙ্গে ঠাট্টা করছি তাহলে ভুল করবে। 

বিয়ে করছিস? 

হা। বিয়ে করে আমি ফুড়ুৎ করে উড়াল দিয়ে চলে যাব। তুমি তখন তােমার অতি প্রিয় স্বামীকে নিয়ে অতি সুখে জীবন যাপন করতে পারবে। 

দু’জনে মুখােমুখি গভীর দুখে দুখী 

আঁধারে ঢাকিয়া গেছে আর সব। জাহেদা অবাক হয়ে বললেন, তুই সত্যি বিয়ে করছিস? 

জাহেদা কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, আমি আমার দুই মেয়ের কোনাে মেয়েকেই কি শখ করে বিয়ে দিতে পারব না? 

মীরু বলল, সে রকমই তাে মনে হচ্ছে। 

 

Read more

হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৭)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *