বৌ সঙ্গে সঙ্গে বলল, এত অবাক হচ্ছেন কেন মা? পিপড়া চায়ে ভাসবে এটাই তাে স্বাভাবিক। পিপড়া চায়ের চেয়ে হালকা। আর্কিমিডিসের সূত্র অনুসারে সে ভাসছে। একটা মার্বেল চায়ে ছেড়ে দিয়ে দেখা যাবে মার্বেল ডুবে গেছে। মা একটা মার্বেল ছেড়ে দেখাব?
মীরু হাসছে। হাসি থামানাের চেষ্টা করেও পারছে না। যতই সে হাসি থামানাের চেষ্টা করছে ততই হাসি বাড়ছে। আশেপাশের লােকজন কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে। নাসের বলল, আরেকটা বলব? এরচে‘ কড়া ডােজের?
মীরু বলল, আর লাগবে না। আপনি সিঙাড়া নিয়ে আসুন।
নাসের বলল, আরেকটা বলি। এটা বলে আমি খাবার আনতে চলে যাব। আপনি একা একা হাসতে থাকবেন। আশা করছি এর মধ্যে বারসাত
ঘড়িতে পাঁচটা বাজে। আকাশ মেঘে মেঘে কালাে হয়ে আছে। মীরু বলল, বলুন তাে বৃষ্টি কখন নামবে?
নাসের বলল, বলতে পারছি না। আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে। এক্ষুনি বৃষ্টি নামবে।
মীরু বলল, আমি লক্ষ্য করেছি আকাশে যেদিন খুব মেঘ হয় সেদিন বৃষ্টি হয় না। তবে আজ হবে। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ চলে এসেছে।
নাসের বলল, আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে চান?
বৃষ্টি নামা পর্যন্ত অপেক্ষা করব। আমি আপনার সারাটা দিন নষ্ট করলাম। সরি। এক কাজ করুন, আপনি চলে যান। আমার একা অপেক্ষা করতে কোনাে সমস্যা নেই। | নাসের বলল, আপনার যদি একা অপেক্ষা করতে ইচ্ছা করে তাহলে অবশ্যই একা অপেক্ষা করবেন। আমি চলে যাব। সে-রকম কোনাে ইচ্ছা যদি না থাকে তাহলে অপেক্ষা করব।
রোদনভরা এ বসন্ত শেষ পর্ব
মীরু বলল, বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে না। বৃষ্টির একটা ফোঁটা গায়ে পরা মাত্রই আমি রওনা হব ।
নাসের বলল, আপনি মােটেও চিন্তা করবেন না। আমি লােক লাগিয়ে দিয়েছি উনি কোথায় আছেন সেই খোজ আজ রাতের মধ্যে বের করে ফেলব।
পরিশিষ্ট
মীরু জবাব দিল না। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল। নাসের বলল, সময় কাটানাের জন্যে একটা মজার খেলা আছে। এই খেলাটা খেলবেন? আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনার সময় কাটছে না। ভিতরে ভিতরে আপনি ছটফট করছেন । খেলাটা খেলবেন?
কী খেলা?
আমি একটা শব্দ বলব। শব্দটা শােনার সঙ্গে সঙ্গে আপনার মনে যে শব্দটা আসবে আপনি সেটা বলবেন। আপনার কাছ থেকে শব্দটা শােনার পর আমার মনে যা আসবে তা বলব। এরকম চলতে থাকবে।
শেষ হবে কখন?
যেখান থেকে শুরু করেছি সেখানে পৌঁছার পর শেষ হবে। আসুন শুরু করি। আমি বলছি প্রথম শব্দ। বৃষ্টি। বৃষ্টি শব্দটা শুনে আপনার মনে যে শব্দটা আসবে সেটা বলুন।
মীরু : অশ্রু। নাসের : নদী। মীরু : নৌকার পাল। নাসের : নীল আকাশ। মীরু : আকাশে মেঘ। নাসের : ঝড়। মীরু :বৃষ্টি।
রোদনভরা এ বসন্ত শেষ পর্ব
নাসের বলল, খেলা শেষ। আমরা বৃষ্টি দিয়ে শুরু করেছিলাম আবার বৃষ্টিতে ফিরে এসেছি।
মীরু বলল, বৃষ্টি নামতেও শুরু করেছে। কয়েক ফোঁটা আমার গায়ে পড়েছে। চলুন যাওয়া যাক।
মীরুর চোখ ভর্তি পানি। সে চোখের পানি আড়াল করার কোনাে চেষ্টা করছে না।
নাসের দুঃখিত গলায় বলল, ঐন্দ্রিলা আপনি নিশ্চিত থাকুন আমি আজ রাতের মধ্যে বারসাত সাহেবের খবর বের করব।
মেয়েটির চেহারা অত্যন্ত মিষ্টি। চোখ বুদ্ধিতে ঝলমল করছে। সে এসেছে তার বিয়েতে আমাকে দাওয়াত করতে। আমি বললাম, তােমার নাম কী?
মেয়েটি বলল, আমার চারটা নাম, মরিয়ম, মীরু, ঐন্দ্রিলা এবং ঐ। আমি বললাম, চার নামের মেয়ে আমি এই প্রথম দেখলাম।
মেয়েটি বলল, চারটা নামের মধ্যে কোন নামটা আমার সঙ্গে সবচে‘ ভালাে যায় ।
আমি বললাম, মরিয়ম নামটা সবচে‘ ভালাে যায়। মরিয়ম নামের মধ্যে কোমল একটা ব্যাপার আছে। তােমার মধ্যেও কোমলতা আছে।
আমার মধ্যে কোনােই কোমলতা নেই। আমি খুবই কঠিন একটা মেয়ে। যাই হােক আমি কঠিন না কোমল তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। আমার বিয়েতে কিন্তু আপনাকে আসতে হবে। শুক্রবারে বিয়ে । শুক্রবারে আপনি কোনাে কাজ রাখতে পারবেন না ।
তােমার বিয়েতে আমাকে আসতে হবে কেন?
কারণ আমার জীবনটা অবিকল আপনার লেখা একটা উপন্যাসের মতাে। উপন্যাসের নায়িকা গােপনে একটা ছেলেকে বিয়ে করার জন্যে কাজি অফিসে যায়। ছেলেটা কিন্তু আসে না। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসে। তার বিয়ে হয় অন্য আরেকজনের সঙ্গে।
রোদনভরা এ বসন্ত শেষ পর্ব
তার জীবন কাটে কাদতে কাদতে। উপন্যাসের কথা কি আপনার মনে পড়েছে ?
ছেলেটা আসে না কেন? ছেলেটা খুবই অসুস্থ ছিল। তার হয়েছিল হেপাটাইটিস বি । ডাক্তাররা সন্দেহ করেছিলেন তার লিভার সিরােসিস হয়েছে। এক ধরনের ক্যানসার । কাজেই তার মনে হল দু’দিন পরে সে মারা যাচ্ছে । এই অবস্থায় একটা মেয়েকে বিয়ে করে তার জীবন সে নষ্ট করতে পারে
কাজেই বিয়ের দিন সে পালিয়ে গেল গ্রামে। এখন কি আপনার মনে পড়েছে?
হা মনে পড়েছে।
উপন্যাসের নাম রােদনভরা এ বসন্ত।
আমি বললাম, তুমিও কি সেই উপন্যাসের নায়িকার মতাে অন্য একটা ছেলেকে বিয়ে করছ?
না আমি অসুস্থ ছেলেটাকেই বিয়ে করছি। তাকে গ্রাম থেকে ধরে আনা হয়েছে। আমার এক বন্ধু নাসের নাম উনি তাকে তার বাড়িতে গৃহবন্দি করে রেখেছেন।
ইন্টারেস্টিং তাে!
অবশ্যই ইন্টারেস্টিং। আমাদের বিয়েতে আপনি উপস্থিত থাকবেন। এবং উপন্যাসের শেষটা পাল্টে দেবেন। ছেলেটার অসুখ অবশ্যই সারিয়ে দেবেন। উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা যেন খুব সুখে জীবন কাটায়।
তাহলে তাে উপন্যাসের নামও পাল্টাতে হয়। মিলনান্তক উপন্যাসের নাম ‘রােদনভরা এ বসন্ত হতে পারে না।
নাম পাল্টানাের দরকার নেই। আমি সারা জীবন কাঁদতে রাজি আছি কিন্তু বারসাতকে হারাতে রাজি না।
মেয়েটি কাঁদছে। তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। সুন্দর লাগছে দেখতে।
আমি বললাম, আমার উপন্যাসের নায়ক সুন্দর ছবি আঁকত। তােমার এই ছেলে বারসাত কি ছবি আঁকতে পারে?
ঐন্দ্রিলা চোখ মুছতে মুছতে হা–সূচক মাথা নাড়ল।
তার চেহারা থেকে কান্না চলে গেছে। সে এখন আনন্দে ঝলমল করছে। এই মেঘ এই রৌদ্র।
Read more