হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৯)

বাগানবাড়িতে আটচল্লিশ ঘণ্টা কাটানাের অনুমতি নিয়েছিলাম। ঐখানে যাব ।রোদনভরা এ বসন্তবাগানবাড়িটা কোথায়? কালিয়াকৈর-এর কাছে। আমি একটা সাজেশান দেই? দিন। 

একা একা কালিয়াকৈর যাবার কোনাে মানে হয় না। আজ কোথাও যাবার দরকার নেই। ঢাকাতেই থাক। মীরু মেয়েটার বাসায় যাও, খোঁজ নাও তার কী হয়েছে। 

তার কিছু হয়নি, সে ভালাে আছে। সে আমাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছে। এখন বাসায় গেলে দেখব সে তার মা’র সঙ্গে সাপ লুডু খেলছে। 

উল্টোটাও হতে পারে। সে হয়তাে কোনাে সমস্যায় পড়েছে। তুমি আজ বাগানবাড়িতে যাবার আইডিয়া বাদ দাও।

বাদ দিতে পারব না। আমাকে যেতেই হবে। সেখানে তিনজন বেহালা বাদক ঠিক করা আছে। তারা আজ দুপুর থেকে বসে আছে। 

তােমার শরীর ঠিক আছে তাে? তােমার কথাবার্তা কেমন যেন জড়ানাে মনে হচ্ছে । 

শরীর ঠিক আছে। 

কালিয়াকৈর যাবার আগে কি আমার বাসা হয়ে যাবে? এক কাপ চা খেয়ে যাবে। 

 চেষ্টা করব। 

চেষ্টাটেষ্টা না । চলে এসাে। তােমাকে ইন্টারেস্টিং কিছু কথা বলব। তােমার কালিয়াকৈর যাওয়া আমি আটকাচ্ছি না। তুমি যাও তবে যাবার আগে আমার এখানে এক কাপ চা খেয়ে যাও। 

ভাবী ক’টা বাজে বলতে পারবেন? আমার হাত ঘড়িটা কাজ করছে । বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। 

এখন বাজছে পাঁচটা ছয়। তুমি আসছ তাে? 

বারসাত জবাব না দিয়ে টেলিফোন রেখে দিল । সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে তার জ্বর এসেছে। এই জ্বর চট করে যাবার জ্বর না। জ্বর তাকে ভােগাবে। চিৎ করে বিছানায় ফেলে দেবে। 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৯)

মীরু স্বাভাবিক গলায় বলল, কাজি অফিসে যাব ফুপু। আজ আমার বিয়ে। 

সুলতানা বিরক্ত গলায় বললেন, সব সময় ঠাট্টা-ফাজলামি করিস এসব ভালাে না। তাের ওপর দিয়ে খুব ধকল গেছে। বুঝতে পারছি মাথা আউলিয়ে গেছে। যা কিছুক্ষণের জন্য ঘুরে আয়। নাসেরকে বলে দিচ্ছি ও তােকে নামিয়ে দেবে। 

নাসেরটা আবার কে? 

নাসেরের সঙ্গে তাে আজ ভােরেই এক গাদা কথা বললি। এর মধ্যে ভুলে গেছিস? তাের হয়েছে কী বল তাে? 

মীরু ক্লান্ত গলায় বলল, ফুপু আমার কিছু হয়নি। আমি ভালাে আছি। আর শােনাে আমাকে পৌঁছে দিতে হবে না। আমি রিকশা নিয়ে যাব। | নাসেরের গাড়ি আছে, তুই রিকশা নিয়ে যাবি কেন? তুই আয় তাে আমার সঙ্গে, তােকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসি। 

মীরু অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসল। সুলতানা বললেন, হাসছিস কেন? মীরু বলল, জানি না কেন হাসছি। মনে হয় আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। 

সুলতানা বললেন, তুই এক কাজ কর যেখানে যাবি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যা। তাের ভাবভঙ্গি এলােমেলাে, তােকে একা ছাড়া যাবে না । 

মীরু বলল, তুমি তােমার অসুস্থ ভাইকে ফেলে আমার সঙ্গে বেড়াতে বের হবে? নিজের ভাই মরে যাচ্ছে । 

সুলতানা বিরক্ত গলায় বললেন, মরে যাচ্ছে কী? কথা বলার স্টাইলটা তাের এরকম হয়ে যাচ্ছে কেন? তুই আমার চেয়ে ভালাে জানিস যে ভাইজানের অবস্থা এখন ভালাে। সব বিপদ কেটে গেছে। | মীরু হাই তুলতে তুলতে বলল, ফুপু বেশি করে চিনি দিয়ে আমাকে এক কাপ চা খাওয়াও। তারপর ডলে ডলে আমার মাথায় তেল দিয়ে দাও। 

সুলতানা অবাক হয়ে মীরুর দিকে তাকালেন। মীরু ফিক করে হেসে ফেলে বলল, তুমি কি ভাবছ আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তােমাকে হকচকিয়ে দেবার জন্যে হঠাৎ চায়ের কথা বলেছি। আমার অবশ্যি চা খেতে ইচ্ছা করছে। মাথায় তেল দিতেও ইচ্ছে করছে । ফুপু তুমি কি জানাে এই পৃথিবীতে তােমার চেয়ে ভালাে করে কেউ মাথায় তেল দিতে পারে না। 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৯)

মীরু তার ছােট ফুপুর দিকে তাকিয়ে বলল, ফুপু ক’টা বাজে? সুলতানা বললেন, পাঁচটা দশ বাজে।। মীরু বলল, ফুপু আমি এখন চলে যাব। 

সুলতানা অবাক হয়ে বললেন, তাের বাবার এই অবস্থা তুই কোথায় চলে যাবি! তাের কি মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেছে? 

মীরু বলল, বাবার অবস্থা এখন ভালাে। ডাক্তাররা বলেছেন বিপদ কেটে গেছে। তােমরা সবাই চলে এসেছ। এখন আমার দরকার কী? 

তুই দেখি সত্যি সত্যি পাগল হয়ে গেছিস। তাের দরকার থাকবে না? 

তােমরা যা পার কর। হাসপাতাল আমার পছন্দের জায়গা না। হাসপাতালে ঢুকলেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। দমবন্ধ অবস্থায়। 

অনেকক্ষণ আছি। এখন আমাকে যেতেই হবে । 

কোথায় যেতে হবে? 

আফজল সাহেব মেয়ের কথায় হেসে ফেললেন। কারাের রসিকতায় তিনি কখনাে হেসেছেন এমন উদাহরণ নেই। হার্ট এটাকের পর সম্ভবত তার মানসিকতার কোনাে পরিবর্তন হয়েছে । মীরুর কথা শুনে তিনি যে শুধু হাসলেন তা-না। অনেকক্ষণ ধরে হাসলেন। মীরু বলল, বাবা তুমি ঘুমাও। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হার্ট ঠিক কর। হার্টকে রেস্ট দাও

 

Read more

হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১০)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *