কোন্‌ দেশে বোকা নেই-জসীম উদ্দীন

কোন্‌ দেশে বোকা নেই-জসীম উদ্দীন

কোন্‌ দেশে বোকা নেই

 

চাষীর একটি মাত্র মেয়ে। বড়ই আদরের। মেয়েটি একদিন বসিয়া বসিয়া ভাবিতেছে ,তার জন্য বিবাহ হইল | তারপর একটু সুন্দর ফুটফুটে ছেলে হইল । হঠাৎ জ্বর হইয়া ছেলেটি মারা গেল ৷ যেই এই কথা ভাবা অমনি মেয়েটি আছাড়ি পাছাড়ি করিয়া কাদিতে লাগিল,

“ওরে আমার সোনারে! -ওরে আমার মানিকরে। তুই আমাকে ছাড়িয়া

কোথায় গেলিরে ”

মেয়ের মা আসিয়া মেয়েকে জিজ্ঞাসা করে, “খুকী! তুই কেন কীদিতেছিস বল।” মেয়ে যখন মাকে সকল কথা বলিল, শুনিয়া মাও

ডাক ছাড়িয়া কাদিতে লাগিল ।

 

কান্না শুনিয়া চাষী বাড়ি আসিল । না জানি কি হইয়াছে। বউ আর মেয়ে চাষীকে দেখিয়া আরও জোরে জোরে কীদিতে লাগিল । চাষী

“যতই জিজ্ঞাসা করে তোমরা কেন কাদিতেছ, তাহারা ততই চিৎকার

করিয়া কাদে ৷ তখন চাষী ধমক দিয়া বলিল, “কেন ক্টাদিতেছ শিগ্গীর

বল।” তখন চাষীর বউ বলিল, “আমাদের মেয়ের তো বিবাহ হইবে ।

তখন তার কোলে একটি ফুটফুটে ছেলে হইবে । জ্বর হইয়া ছেলেটি

যদি মরিয়া যায় সেই জন্য আমরা কাঁদিতেছি ।”

 

সমস্ত শুনিয়া চাষী বলিল, “আমাদের মেয়ের এখনও “বিবাহ হয় নাই। বিবাহের পরে তার ছেলে হইবে কি না, তাও কেহ জানে না! আর সেই ছেলে যে জ্বর হইয়া মরিবে তাও কেহ্‌ বলিতে পারে না। তোমাদের মতো এমন বোকা কোথায়ও দেখি নাই। এখন কান্না থামাইয়া ভাত রীধ। আমার বড় ক্ষুধা পাইয়াছে ।”

 

কোন্‌ দেশে বোকা নেই ৭৫

 

চাষীর বউ ঝস্কার দিয়া উঠিল, “বেশ সুখে আছ তুমি । বলি ও

মুখপোড়া! কোন্‌ মুখে তুমি ভাত গিলিবে? ছেলেটি যদি মারা যায়

তবে বুড়ো বয়সে কে আমাকে, আমাদের মেয়েকে আর তোমাকে

কামাই করিয়া খাওয়াইবে?”

 

বউ আর মেয়ে আবার কান্না আরম্ভ করিল। কেহই ভাত রাধিতে গেল না।

 

তখন চাষী বলে, “তোমাদের মতো এমন বোকা লোক লইয়া ঘর করা ঝক্মারি। এই আমি দেশ ছাড়িয়া চলিলাম। যে দেশে তোমাদের মতো বোকা লোক নাই সেই দেশে যাইয়া! বাস করিব। যদি এমন দেশ খুঁজিয়া না পাই তবে ফিরিয়া আসিব । নতুবা এই আমার শেষ

বিদায় ”

সত্য সত্যই চাষী বাড়ি হইতে বাহির হইল । যাইতে যাইতে সে

এক দেশে যাইয়া দেখে, নদীর ধারে লম্বা একটি কাঠ লইয়া বহুলোক

টানাটানি করিতেছে। চাষী তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিল, “তোমরা এই

কাঠ লইয়া টানাটানি করিতেছ কেন?” তাহাদের মধ্যে একজন বলিল,

আমাদের রাজা এই নদীতে একটি পুল তৈরি করিতে হুকুম দিয়াছেন।

কিন্তু এই কাঠখানা নদীর এপারে ওপারে নাগাল পায় না। তাই উহা

টানিয়া লম্বা করিতেছি। আজ সাতদিন হইতে আমরা এই কাজ

করিতেছি। যত মজুর কাঠ টানিতে আসে রাজা তাহাদের বেতন দেন

চাই।”

 

চাষী সমস্ত শুনিয়া রাজসভায় যাইয়া বলিল, “মহারাজ! আপনার

না। পুলও তৈরি হইবে না। আমি যাহা যাহা চাই যদি দেন তবে

সাতদিনের মধ্যে আমি পুল তৈরি করিয়া দিতে পারি 1”

 

রাজা বলিলেন, “বেশ, তুমি যাহা চাহিবে তাহাই পাইবে । পুল

তৈরি করিয়া দাও, তোমাকে বকশিশ্‌ করিব ।”

 

৭৬ বাঙ্গালীর হাসির গল্প

 

চাষী রাজার লোকের নিকট হইতে কাঠ, লোহা আর চুন, সুরকি লইয়া বহু রাজমিষ্ত্রী খাটাইয়া সাত দিনের মধ্যে পুল তৈরি করিয়া দিল। রাজা তখন খুশী হইয়া চাষীকে হাজার এক টাকা বকশিশ্‌ করিলেন। চাষী মনে মনে ভাবিল এটাও বোকার দেশ । সুতরাং চাষী সে দেশ, ছাড়িয়া আর এক দেশে গেল ৷

একখান! নতুন কুঠুরী তৈরি করিয়াছেন কিন্তু কোনে জানালা, দরজা না থাকায় ঘরের মধ্যে অন্ধকার । তাই রাজা হুকুম করিয়াছেন, বাহির হইতে আলো জালে আটকাইয়া ঘরের মধ্যে ফেলিয়া দিতে। হাজার হাজার জেলে প্রায় দুই মাস এই কাজ করিতেছে । কিন্তু ঘরে এখনো আলো হয্ন নাই। রাজা তাহাদের দ্বিগুণ বেতন দিয়া বলিয়াছেন, আরও যত লোক দরকার কাজে লাগাও! বাহির হইতে আলো আনিয়া ঘর

আলো করা চাই ।”

 

কোন্‌ দেশে বোকা নেই ৭৭

 

চাষী তখন রাজার কাছে যাইয়া বলিল, “মহারাজ! ঝাকি জাল আর খেপলা জাল লইয়া যতই বাহিরের আলো ঘরে ফেলিতে চেষ্টা করিবেন কিছুতেই ঘর আলো হইবে না। আমাকে যদি হুকুম করেন

আমি ঘর আলো করিতে পারি।”

 

রাজা বলিলেন, “বেশ! তা’ যদি করিতে পার আমি তোমাকে

হাজার এক টাকা বকশিশ্‌ করিব ।”

 

চাষী তখন রাজমিল্ত্রী লইয়া রাজার ঘরে অনেকগুলি জানালা দরজা করিয়া দিল। রাজা ঘরে যাইয়া দেখিলেন, ঘর আলোতে ঝলমল করিতেছে। রাজা খুশী হইয়া চাষীকে হাজার এক টাকা বকশিশ করিলেন । চাষী ভাবিল, “এটাও বোকার দেশ ৷ এদেশে ও থাকা চলিবে

না।” চাষী সে দেশ ছাড়িয়া আর এক দেশে গেল ।

 

পথে যাইতে যাইতে চাষী দেখে দুইটি হিন্দু মেয়ে কথা বলিতে

বলিতে আগে আগে চলিয়াছে। তাহাদের সঙ্গে একটি ছাগল ।

 

তাহারা একজন অপরকে বলিতেছে, “দেখ বোন, আমার এই ছাগলের নাম রাখিয়াছি রাম। রামকে যেদিন কিনি সেদিন হইতেই আমাদের অবস্থা ভালো হইতে লাগিল। আমার স্বামী এখন ব্যবসা করিয়া লক্ষ টাকার মালিক ।”

 

এই কথা শুনিয়া চাষী সেই স্ত্রীলোকটির সামনে যাইয়া পায় হাত দিয়া প্রণাম করিয়া বলিল, “মাসীমা! আমি আপনার বোনপো ৷ আপনি কোথায় যাইতেছেন ?” একটি ভালো পোশাক পরা লোক তাকে

মাসীমা বলিয়া ডাকিয়াছে। শ্লীলোকটি আনন্দে গদগদ হইয়া গেল । সে খুব স্নেহের সঙ্গে বলিল, “এই যে বোনপো’ নদী হইতে রামকে স্নান করাইয়া বাড়ি ফিরিতেছি ।”

আগে আমার অবস্থা বড়ই খারাপ ছিল কিন্তু শ্যামকে কেনার পর

ত্রমেই আমার অবস্থা ভালো হইতেছে। এখন আমি লক্ষ টাকার

মালিক ।”

 

৭৮

 

মাসী বলিল,

দিয়াছে, তার বড়

 

আশ্চর্য কি!”

 

দিয়া যাইব ।”

 

বাঙ্গালীর হাসির গল্প

 

“আমার রাম যখন আমাদের এত টাকা করিয়া

 

ভাই যে তোমার ভাগ্য ফিরাইয়াছে এতে আর

 

চাষী বুঝিল মাসী তাহাকে বিশ্বাস করিয়াছে। সে তখন আরও

কাছে যাইয়া বলিল, “মাসীমা! কাল আমার শ্যামের বিবাহ ঠিক

 

পডিযাহ। এনিত দিবাহ্র ফন আমার পরও গড়হযাছ। শোক

বিবাহ করিতে রাজী হয় না। আপনি যদি এক দিনের জন্য আপনার

রামকে আমার সঙ্গে দেন, বিবাহের পর কালই আমি রামকে ফিরাইয়া

 

মাসী বলিল, “তা বাছা! লইয়া যাও । কিন্তু কালই রামকে লইয়া

 

আসিও। রাম আমাকে ছাড়া এক দণ্ডও থাকিতে পারে না ।”

 

চাষী কহিল, “সেকথা কি আর বলিতে! কাল আমি রামকে লইয়া

 

আসিব ।”

 

মাসীর হাত হইতে ছাগলের দড়ি ধরিয়া কিছুদূর যাইয়া চাষী

আবার ফিরিয়া আসিয়া বলিল, “মাসীমা! একটা কথা বলিব।

 

কিছু মনে করিবেন

 

খালি গায়ে যদি যায় লোকে কি বলিবে। আপনার হারছড়া যদি রামের

, দেখিয়া লোকে আপনার তারিফ করিবে ।”

 

দেখাইয়া বলিল, “আমাকে বিশ্বাস করিতেছেন না ? দেখুন, আমার

কত টাকা আছে! আমি গরীব লোক না ।”

 

না। রাম তো বিবাহের নিমন্ত্রণে যাইবে! অমনি

 

অপর স্ত্রীলোকটি বলিল, “এ লোকটির কথাবার্তা এত ভালো!

একে বিশ্বাস করা যায় ।”

কোন্‌ দেশে বোকা নেই ৭৯

 

মাসী তখন হারছড়াটি খুলিয়া ছাগলের গলায় পরাইয়া দিল।

 

চাষী ছাগলের দড়ি ধরিয়া টানিতে টানিতে সামনের পথে

আগাইয়া চলিল। অজানা লোকের সঙ্গে ছাগল কি যাইতে চাহে। সে

এদিকে ঘাস দেখিয়া মুখ দেয়, ওদিকে মাঠ দেখিয়া ছুট দেয়। বিরক্ত

হইয়া চাষী চাগলের গলা হইতে হারছড়াটি খুলিয়া লইয়া তাহাকে

বনের মধ্যে ছাড়িয়া দিল । তারপর হন্হন্‌ করিয়া পথ চলিতে লাগিল ।

স্নান করিতে এত দেরি হইল কেন ? আমি এদিকে স্ষুধায় মরিয়া

যাইতেছি।” –

 

এক গাল হাসিয়া মাসী বলিল, “পথে বোনপোর সঙ্গে দেখ

ইল ৷ তাহার সঙ্গে কথাবার্তা বলিতে দেরী হইয়া গেল! রামের ভাই

শ্যামের বিবাহ কি না ! না

দেখিতেছি না?”

 

বউ বলিল, “রামের বড় ভাইয়ের বিবাহ । সেখানে রামকে তো

খালি গায় পাঠাইতে পারি না। তাই আমার গলার হারছড়া রামের

গলায় পাইয়া দিয়াছি। তুমি ভাবিও না। বোনপো কালই রামকে দিয়া

যাইবে ।”

স্বামী রাগিয়া কহিল, “তোমাকে যখন আমি বিবাহ করি তখন তো

তোমার কোনো বোনপোর কথা শুনি নাই। এখন বোনপো আসিল

কোথা হইতে ? তার নাম কি ? বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে?”

বউ বলিল, “না তো! সে কথা তো জিজ্ঞাসা করি নাই।”

স্বামী বলিল, “তোমার মতো বোকা কোথাও দেখি নাই। সে

লোকটা কোন দিকে গিয়াছে ?”

 

বউ বলিল, “সে উত্তরের দিকের রাস্তা দিয়া গিয়াছে ।”

 

স্বামী তখন উত্তরের রাস্তা দিয়া ঘোড়া ছুটাইয়া চলিল। যাইতে

যাইতে পথের মধ্যে চাষীকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “দেখ ভাই! এই

 

৮০ বাঙ্গালীর হাসির গল্প

 

পথ দিয়া একটি লোককে ছাগল লইয়া যাইতে দেখিয়াছ ? সেই

ছাগলের গলায় একটি সোনার হার ।”

 

চাষী বলিল, “দেখিয়াছি, সে এই পথ ঘুরিয়৷ ডাইনে গেল, তারপর

বাম দিকে চলিল। আপনি একা গেলে তাহাকে ধরিতে পারিবেন না।

আমার পথ-ঘাট সবই জানা আছে। এক কাজ করুন । আপনি এখানে

দীড়ান। আমি ঘোড়া ছুটাইয়া তাড়াতাড়ি যাইয়া তাহাকে ধরিয়া লইয়া

আসি ।”

 

লোকটি চাষীকে অনেক ধন্যবাদ দিয়া ঘোড়াটি তাহাকে দিল ।

 

চাষী ঘোড়ায় চড়িয়া দিল ছুট । যাইতে যাইতে সে ভাবিল, “সকল

দেশেই তো আমার বউ-এর মতো বোকা লোক আছে। বোকা নাই

এমন দেশ যখন কোথাও পাইলাম না, তখন বউ-এর কাছেই ফিরিয়া

যাই।”

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *