প্রকল্প-ঋভু চট্টোপাধ্যায়

প্রকল্প-ঋভু চট্টোপাধ্যায়

দুপুরে জম্প্রেস করে ভাত আর এক বাটি দুধ সেই মাত্র সাঁটানোর পর একটা ছোট খাটো ঘুমও হয়ে গেছে এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠতেই একটু বিরক্তই হলেন হারাধন বাবুএখন আবার কে ফোন করলঅফিস থেকে তো ফোন করবে নাএকটু পরেই বিসিফ্টের ডিউটি আছে

রিসিভ করার আগে ফোন নম্বরটা একবার দেখে নিলেন নাঅচেনা ল্যাণ্ড লাইনের নাম্বার রিসিভ করতেই অন্য পাশ থেকে কড়কড়ে গলায় একজন বলে উঠলেন, ‘এটা কি হারু ঘোষের বাড়ি?’……..-হারু ঘোষ মানে এটা শ্রী হারাধন ঘোষের বাড়িএকটু ঠিক করে কথা বলুন

বাব্বাহেভি গরম দেখছিশুনুন হারু না হারাধন আপনি এখনই বি.ডি.অফিসে দেখা করুন

এখনইকেন ?

আপনার নামে একটা প্রকল্প এসেছেনিয়ে যান

প্রকল্প কি প্রকল্পআমি তো কোন প্রকল্পের জন্য দরখাস্ত করিনি

তা তো জানিনাআপনি আসুননা হলে আমাদের অসুবিধা হচ্ছে

কিন্তু কি প্রকল্প সেটা তো বলুন

আপনার নামে সরকারি প্রকল্পের দুটো জার্সি গরু এসেছেআপনি এসে সই সাবদ করে নিয়ে যান।……..শেষের কথাগুলো শুনেই এক রকম আাঁতকে উঠলেন হারাধন বাবু,‘শেষ কালে গরু?’ গিন্নি এতক্ষণ ধরে রান্নাঘরে ছিলেন, কর্তার চিৎকার শুনে ড্রয়িং রুমে এসে দেখলেন হারাধন বাবু তখনও ফোনটা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। গিন্নি জিজ্ঞেস করলেন,‘ কি হল গো এত চেল্লাচ্ছো কেনঅফিস যাবে না ?’

গরু

মানে!

মানে আমি সরকারি প্রকল্পে দুটো জার্সি গরু পেয়েছি

ওমা তাইকি মজা আমাদের আর খাটাল থেকে দুধ কিনে আনতে হবে নাতোমার সকালে কতটা সময় বাঁচবে, আমাকে একটু হেল্প করতে পারবেতাছাড়া এই কদিন ঐ ব্যাটা দুধে শুধু জল মেশাচ্ছেগরু কিনলে আর যাই হোক এক্কেবারে খাঁটি দুধ পাওয়া যাবে কি বলকত দিন খাঁটি দুধ খাই নি সেই বাপের বাড়িতেই যা খাঁটি দুধ খেয়েছিএখানে আসার পর থেকে এই জল ঢালা দুধ খেয়ে খেয়ে আমি রোগা হয়ে গেলাম 

 বাড়িতে গেলেই মা বলে,‘হ্যাঁরে বাবুতোর চেহারাটা দিন দিন এতো খারাপ হয়ে যাচ্ছে কেন?’..-চুপ কর তোতোমার চেহারা খারাপগত সপ্তাহেই তো ডাক্তার দেখাতে গেলেকি বললেন ডাক্তার বাবুপাঁচাশি কিলো ওজন হয়েছেডাক্তারবাবু খাওয়া কমাতে বলেছেন মনে আছে আমি দুটো জার্সি গরু পেয়েছিদুটো মশা নয়নিদেন পক্ষে দুটো মুরগিও নয়এই ফ্ল্যাটে কোথায় রাখব ভেবেছ একবার

কেন ছাদেবেশ সুন্দর থাকবেচড়বেআমি ঘাস কেটে দেবতুমি দুধ দুইবেআর আমাদের বাবুও ছুটির সময় যখন আসবে কাজে সাহায্য করবেআমার তো দারুণ মজা হচ্ছে আমি না গরু দুটোর নাম ঠিক করে ফেলেছিরুমনো ঝুমনোনা না লক্ষী সরস্বতীনা নাকার্তিক গনেশওগো বল না গরুর নাম কার্তিক গনেশ রাখলে কেউ কিছু বলবে?

না কেউ কিচ্ছু বলবে নাতোমাকে কোলে নিয়ে আদর করবেতুমি কি উন্মাদএকবার ভেবেছ আমাদের  কমপ্লেক্সে যারা থাকেন তারা সবাই ষাট লাখ সত্তর লাখ টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট  কিনেছেনআগেকার দিনে রাজারা নহবৎ খানায় সানাইয়ের সুর শুনে ঘুম থেকে উঠতেনআর আমরা উঠব গরুর ডাক শুনেফ্ল্যাটের বাকি সবাই কি বলবেন একবার ভেবেছ?

একদিন সবাইকে ফ্রিতে দুধ খাওয়াবোতারপর থেকে কম দামে দুধ বিক্রি করবদুধ খেলে কেউ আর কিচ্ছুটি বলতে পারবে না।…….-রাখবে কোথায়, দুটো হাতির মত সাইজের গরু কিন্তু।……..–কেন ছাদে, তুমি শুধু এনে দাও, আমি দেখবে কেমন সুন্দর ভাবে হৈ হৈ করে ছাদে তুলে দিচ্ছি।

–সেই ভালো, তারপর তুমি ওদের পিঠে চেপে তোমার বাপের বাড়ি যাবে, বাস ভাড়া লাগবে না, ট্রেন ভাড়া লাগবে না। আমি তোমার মত অতটা খেপিনি, অনেক কাজ আছে।..অফিসে গিয়েও নিস্তার নেই পাঁচ দশ মিনিট অন্তর অন্তর ফোনের রিং বাজতেই থাকে, ধরলে একটাই কথা,‘কই হারাধন বাবু, আপনার গরু দুটো নিয়ে যান।’

এত বেশি বার ফোন আসছে দেখে অফিসের সবাই সব কিছু শুনে হাসাহাসি আরম্ভ করে দিলেন,‘তাহলে হারাধনদা দুটো জার্সি গরু পাচ্ছেন, আপনি এবার থেকে অফিসে এলে আমাদের জন্য একটা প্যাকেটে দুধ আনবেন, পাওনা গরুর দুধ একটু হয়ত বেশিই মিষ্টি।’

কাকে কি জবাব দেবেন হারাধনবাবু কিছুই বুঝতে পারলেন না। সেদিনই আবার বস নিজের চেম্বারে ডেকে পাঠিয়ে আর পাঁচটা কথার মাঝে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি না কি গরু পাচ্ছেন, আমাকেও কিন্তু খাঁটি গরুর দুধ খাওয়াতে হবে, আপনি দাম নেবেন, আর প্রয়োজনে একটু আধটু ম্যানেজও করে দেব।’

বসের অফিস থেকেই বেরোতেই বাড়ি থেকে গিন্নির ফোন পেয়ে একটু অবাক হয়ে  ‘কি হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করতে ওপাশ থেকে উত্তর পেলেন, ‘এই  বিডিও অফিস থেকে লোক এসেছে, তোমাকে খুঁজছে, তুমি একটু তাড়াতাড়ি এস, খুব দরকার।’ বসকে কথাগুলো বলতেই উনি তাড়াতাড়ি অফিসের একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়ে বললেন, ‘আপনি গাড়িটা নিয়েই চলে যান, বলা যায় না কখন কি দরকার হবে।’

 হারাধন বাবু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেই দেখেন ফ্ল্যাটের বাইরের গেটের কাছেই বিরাট ভিড়, প্রচুর লোকজন।একটু ভিতরে যেতেই একটা সরকারি স্টিকার লাগানো গাড়ি ও তারপাশে দুটো জার্সি গরু গরু তো নয় যেন এক একটা হাতি। তবে হারাধন বাবু গাড়ি থেকে নামতেই দুজন এগিয়ে এসে বলে উঠলেন, ‘ আপনি তো হারু ঘোষ?’

– না আমি হারু ঘোষ নয়, শ্রী হারাধন ঘোষ।..–ও আচ্ছা, শুনুন আপনার নামে এই দুটো গরু এসেছে, আপনি দয়া করে নিয়ে এই ট্যাবে আপনার আঙুল ছুঁইয়ে আপনার প্রাপ্তি স্বীকার করুন।

–এখানে কি আছে ?………….-এমন কিছু না, আপনার আধার নাম্বারের সাথে গরুর কানের ট্যাগের বার কোডের লাগানো একটা নম্বরের সাথে মিললেই যেখান থেকে পাঠিয়েছে সেখানে একটা মেসেজ যাবে, ওরা বুঝবে গরু দুটো আপনিই পেয়েছেন।

–কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো, এই গরু দুটো  নিয়ে আমি কি করব, কোথায় রাখব ?…-সে প্রশ্নের আমরা কি উত্তর দেব বলুন তো, আপনাকে গরু দুটো পৌঁছে দিলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ, এবার কোথায় রাখবেন কোথায় খাবেন সে সব আপনার দায়িত্ব।

বিডিও অফিসের গাড়িটা চলে যেতেই হারাধন বাবু বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেনএত বড় বড় দুটো গরু, ঠিক যেন হাতি, কিন্তু কোথায় রাখা হবে? বিডিও অফিসের ভদ্রলোক দুজন যাবার সময় বলে গেলেন,‘দেখবেন গরু দুটোকে আবার অন্য কাউকে দিয়ে দেবেন না, গরুর কানে কিন্তু চিপ লাগানো আছে, লোকেশন ট্র্যাক করা যাবে।’…..সব দেখে শুনে হারাধন বাবু গিন্নিকে বলেন, ‘আজকের রাতটা কোন রকমে এখানেই থাকুক, কাল সকালে যা হয় দেখব।’

পরের দিন অবশ্য সকালে ঘুম থেকে ওঠবার আগেই হারাধন বাবুর দরজার সামনে লোকজন এসে হাজির।গরু দুটো ফ্ল্যাটের গ্রাউন্ড ফ্লোরটা একবারে গোবরে নোংরা করে দিয়েছে। দুটো গাড়িও তেবড়ে তুবড়ে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে, সেই সঙ্গে এমন ভাবে লিফ্টের দরজার সামনে  বসে আছে যে সকাল থেকে কেউ উঠতে বা নামতে পারেনি

 কম্পপ্লেক্সের অন্য ফ্ল্যাটের সবাই এসে বলতে আরম্ভ করেছে, ‘আপনার জন্যেই আমাদের এত ক্ষতি হল।’ হারাধন বাবুর স্ত্রী সবাইকে বিনা পয়সায় দুধ খাওয়ানোর কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা করে ছিলেন, কিন্তু সেরকম লাভ হয় নি, বরং থার্ড ফ্লোরের বাগচীবাবু হঠাৎ বলে বসলেন,‘ দুধ আপনারাই খান, আর কিছুটা মাথায় ঢালুন।’ অফিস কামাই করে সেদিন হারাধন বাবুকেই জায়গাটা পরিষ্কার করতে হল, ওনার স্ত্রীর আবার  এই সময় কোমরে ব্যথা আরম্ভ হয়ে যায়।

সবার সাথে কথা বলে ঠিক হল ছাদে গরু দুটো রাখার ব্যবস্থা করা হবে। সেই মত সবাই মিলে বেশ কয়েক বার সিঁড়ি দিয়ে এবং তারপর লিফ্টে চাপিয়েও কোন রকম ভাবেই গরুদুটোকে ছাদে তুলতে পারলেন না। এর মাঝে অবশ্য বেশ কয়েক জন আহত হল, কয়েকজনের গায়ে গোবর লাগল, একজন তো গোবরের গন্ধ তোলার জন্য এক বোতল পারফিউম ঢেলে নিল, চারদিকে ব্লিচিং পাউডার, ফিনাইলও ছেটানো হল, কিন্তু কাজের কাজ কিচ্ছু হল না। কিছুক্ষনের মধ্যেই স্থানীয় ক্লাবের দুটো ছেলে এসে হাজির হল, হারাধন বাবুর ফ্ল্যাটে এসে বলে, ‘কাকা, আপনি নাকি গরু কিনেছেন, দুধের ব্যবসা করবেন, একটু আমাদের কথা ভাববেন, বেশি নয় মাঝে মাঝে একটু ফিস্ট করবার জন্য কিছু দেবেন।’

কিছু পরে আরেকটি ক্লাব থেকে তিনজন ছেলে এসে বলে, ‘দাদা, আপনি যে আমাদের পার্টির মাধ্যমে এই দুটো গরু পেলেন সামনের ক্লাবের অনুষ্ঠান একটু স্টেজে উঠে সবার সামনে বলতে হবে।’ পশু প্রেমি সংস্থার থেকেও কয়েকজন এসে হারাধন বাবুকে খুব করে অপমান করে গেলেন, ‘আপনার লজ্জা হয় না, এই দুটো বাইরের দেশের গরু তাদের জন্য এসি প্রয়োজন আর আপনি এই রকম একটা জায়গায় রেখে দিয়েছেন।’ আরেকটি সংগঠন থেকেও  এসে বলে গেল, ‘এই দুটো কিন্তু শুধু গরু নয়, গো মাতা, তাই এদের সেবা করবার মধ্যে দিয়ে আপনি ঈশ্বরকে সেবা করতে পারবেন, অযত্ন করবেন না কিন্তু।’

 অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই হারাধন বাবুর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেল, অফিসে ঠিক ঠাক যেতে পারেন না, প্রতিদিন কমপ্লেক্সের কারোর না কারোর সাথে ঝগড়া হচ্ছে। দুটো গরুকে খেতে দিতে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতে হয়েছে। প্রতিদিন প্রার্থনা করছেন, ‘ হে মা গরুর সাথে আমাকেও তুলে নে।’

 ঠিক সেই সময় একদিন বিডিও অফিস থেকে আবার ফোন আসে, ‘আচ্ছা হারাধন বাবু, আপনার ঠিকানাটা কি, সেভেনটিন না সেভেনটি?’

-সেভেনটিন।

–আচ্ছা আচ্ছা, আপনি একটু কষ্ট করে গরু দুটোকে অফিসে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করুন, আসলে অ্যাডড্রেসটা ভুল হয়ে গেছে, সেভেনটি হবে।…… রাগে হারাধন বাবুর সারাটা শরীর কিড়মিড় করতে আরম্ভ করল, হাতের কাছে একটা কিছু ধরা অবস্থাতে পেয়ে ছুঁড়ে মারলেন দেওয়ালের দিকেকিছুক্ষণ পরেই রান্না ঘর থেকে স্ত্রী বেরিয়ে এসে বলে উঠলেন, ‘সে কি গো, মোবাইলটা যে ভেঙে ফেললে !’

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *