হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৪

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৪

মামার পেট এফোড়–ওফোড় হয়ে যায় । কোচের খানিকটা পিঠ ছেদ করে বের হয়ে থাকে । উঠানে চাটাই পেতে মামাকে শুইয়ে রাখা হয় ।

দৃশ্য দেখার জন্যে সারা গ্রামের লোক ভেঙে পড়ে । তাকে সদর নিয়ে যাওয়ার জন্যে মহিষের গাড়ির ব্যবস্থা হলো । মামা ঠাণ্ডা গলায় বললেন, এতক্ষণ বাঁচব না । তোমরা আমাকে থানায় নিয়ে যাও । মরার আগে আমি কারা এই কাজ করেছে বলে যেতে চাই।             

মামা কাউকেই দেখেননি তবু তিনি মৃত্যুর আগে আগে থানায় ওসির কাছে চারজনের নাম বললেন । তিনি বললেন, তার হাতে টর্চ ছিল । তিনি টর্চ ফেলে ফেলে এদের দেখেছেন । ওসি সাহেব মামার দেয়া জবানবন্দি লিখতে লিখতে বললেন–ভাই সাহেব, এই কাজটা করবেন না । ডেথ–বেড কনফেসন খুব শক্ত জিনিস। শুধুমাত্র এর ওপরই কোর্ট রায় দিবে । নির্দোষ কিছু মানুষকে আপনি জড়াচ্ছেন ।এদের ফাঁসি না হলেও যাবজ্জীবন হয়ে যাবে ।                                                          

মামা বললেন, যা বলছি সবই সত্যি । কোরান মজিদ আনেন । আমি কোরান মজিদে হাত দিয়া বলি–।                                 ওসি সাহেব বললেন, তার দরকার হবে না । নিন, এখানে সই করুন । এটা আপনার জবানবন্দি ।                                  মামা সই করলেন । মারা গেলেন থানাতেই । মরবার আগে মেঝো মামাকে কানে কানে বললেন–এক ধাক্কায় চার শত্রূ শেষ । কাজটা মন্দ হয় নাই ।                                                

চার ‌শত্রূ শেষ করার গাঢ় আনন্দ নিয়ে মামা মারা গেলেন । তবে মৃত্যুর আগে আগে মৌলানা ডাকিয়ে তওবা করলেন । তাকে খুবই আনন্দিত মনে হলো ।                                                                                                     

বড়মামী ব্যাকুল হয়ে কাঁদছিলেন, তাকে ডেকে বললেন, তওবা করে ফেলছি । এখন আর চিন্তা নাই । সব পাপ মাফ হয়ে গেল । সরাসরি বেহেশতে দাখিল হব । খামাখা কান্দ কেন ? তওবা সময়মতো করতে না পারলে অসুবিধা ছিল । আল্লাহপাকের অসীম দয়া! সময় পাওয়া গেছে । কান্দাকাটি না করে আমার কানের কাছে দরুদ পড় । কোরান মজিদ পাঠ কর ।   

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৪                                                                                                    

মামার মৃত্যুর পর আমি ঢাকা চলে এলাম । নতুন জীবন শুরু হলো বড়ফুপুর সঙ্গে ।  প্রবল ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙল । চোখ মেলে দেখি বড়ফুফু । পাশের বিছনা বালি । বাদল নেই । সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রথম যে–জিনিসটা জানতে ইচ্ছা করে তা হচ্ছে– কটা বাজে ?                                                            

বড়ফুপুকে এই প্রশ্ন করব , তখন তিনি কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, কেলেঙ্কারি হয়েছে ।                                                 কি কেলেঙ্কারি ? মানুষকে মুখ দেখাতে পারব না রে ।আমি বিছানায় বসতে বসতে বললাম, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার রাতে এসেছিল, তারপর আর ফিরে যায়নি– তাই তো ?                                                        

তুই জানলি কী করে?                                                                                

অনুমান করছি ।                                                                                         

আমি সকালে একতলায় নেমে দেখি ঐ ছেলে আর রিনকি ? ছেলে নাকি রাতে তোর ফুপার অসুখের খবর পেয়ে এসেছিল । ঝড়বৃষ্টি দেখে আর ফিরে যায়নি । আর ঐ বদমেয়ে সারারাত ঐ ছেলের সঙ্গে গল্প করেছে  ।                              

বল কী !                                                                                                  

আমার তো হাত ঘামছে । কী রকম বদ মেয়ে চিন্তা করে দেখ । মেয়ের কত বড় সাহস ঐ ছেলে এসেছে ভালো কথা । আমাকে তো খবরটা দিবি ?       

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৪

আমি গম্ভীর গলায় বললাম, ঐ ছেলেরই–বা কেমন আক্কেল ? রাত–দুপুরে এল কী জন্যে ?                                                      হ, দেখ না কাণ্ড! বিয়ে হয়নি । কিছু না, শুধু বিয়ের কথা হয়েছে–এর মধ্যে নাকি সারারাত জেগে গল্প করতে হবে! রাত কি চলে গেছে নাকি ?        

খু্বই সত্যি কথা ।                                                                         

এখন ধর, কোনো কারণে বিয়ে যদি ভেঙে যায় তারপর আমি মুখ দেখাব কীভাবে?এক্ষুনি নিচে যাচ্ছি ফুপু, ঐ ফাজিল ছেলের গালে ঠাস করে একটা চড় মারব । তারপর দ্বিতীয় চড় রিনকির গালে । মেয়ে বলে তাকে ক্ষমা করার কোনো অর্থ হয় না । তুই সবসময় অদ্ভুত কথাবার্তা বলিস কেন ? ঐ ছেলের গালে তুই চড় মারতে পারবি?                                                          কেন পারব না ?                                                                                     

যে ছেলে দুদিন পরে এ বাড়ির জামাই হচ্ছে তার গালে তুই চড় মারতে চাস ?

Read more

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১৫

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *