হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২১

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২১

ঐ পাঞ্জাবিটা নেয়ার জন্যে হলেও আপনাকে আমাদের বাসায় আসতে হবে ।

আসব ।

কবে আসবেন ?

টুটুলকে খুঁজে পেলেই আসব ।

আপনি ওকে কোথায় খুঁজে পাবেন ?

আমি খুব সহজেই পাব । হারানো জিনিস খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আমার খুব নামডাক আছে ।

আচ্ছা ঐদিন আপনি কী করে বললেন যে টুটুল ভাইয়ের কপালে কাটা দাগ আছে ? আমার কিছু সুপারন্যাচারাল ক্ষমতা আছে । আমি মাঝে মাঝে অনেক কিছু বলতে পারি ।

বলুন তো আমি কী পরে আছি ?

তোমার পরনে আকাশি রঙের শাড়ি ।

হলো না । আপনার আসলে কোনো ক্ষমতা নেই ।                                                            ‍

ঠিক ধরেছ ।

কিন্ত্ত আপনি যখন বলেছিলেন যে আপনার সুপারন্যাচারাল ক্ষমতা আছে । আমি বিশ্বাস করেছিলাম ।

মনে হচ্ছে তোমার একটু মন খারাপ হয়েছে ?

হ্যাঁ হয়েছে ।

টেলিফোন কি রেখে দেব ?

না না- প্লিজ, আপনার ঠিকানা বলুন ।

আমি টেলিফোন নামিয়ে রাখলাম । অনেকক্ষণ কথা হয়েছে । আর না । মজিদ বোধহয় রিকশা ঠিক করে ফেলেছে । তবে ঠিক করলেও সে আমাকে এসে বলবে না । অপেক্ষা করবে । এর মধ্যেই দ্রুত রূপার সঙ্গে একটা কথা সেরে নেয়া দরকার । আমি টেলিফোন করতেই রূপার বাবা ধরলেন । আমি গম্ভীর গলায় বললাম, এটা কি রেলওয়ে বুকিং ?

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২১

 

তিনি ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, ফাজিল ছোকরা, হু আর ইউ ? কী চাও তুমি ? রূপাকে দেবেন ?

রাসকেল, ফাজলামি করার জায়গা পাও  না । আমি তোমাকে এমন শিক্ষা দেব ! আপনি এত রেগে গেছেন কেন ?

শাট আপ ।

আমি ভদ্রলোককে আরো খানিকক্ষণ হৈচৈ করার সুযোগ দিলাম । আমি জানি হৈচৈ শুনে রূপা এসে টেলিফোন ধরবে । হলোও তাই, রূপার গলা শোনা গেল- সে করুণ গলায় বলল, তুমি চলে এস ।

কখন ?

এই এখন । আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকব ।

আচ্ছা আসছে ।

অনেকবার আসছি বলেও তুমি আসনি- এইবার ‍যদি না আস তাহলে ….তাহলে কী ?

রূপা খানিকক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল, আমি বারান্দায় দাড়িয়ে থাকব ।

রূপার বাবা সম্ভবত তার হাত থেকে টেলিফোনটা কেড়ে নিলেন । খট করে রিসিভার নামিয়ে রাখার শব্দ হলো । আজ ওদের বাড়িতে ভূমিকম্প হয়ে যাবে । রূপার বাবা, মা, ভাইবোন কেউ আমাকে সহ্য করতে পারে না! রূপার বাবা তার দারোয়ানকে বলে রেখেছেন কিছুতেই যেন আমাকে ঐ বাড়িতে ঢুকতে না দেয়া হয় । আজ কী হবে কে জানে ?

বাইরে এসে দেখি মজিদ রিকশা ঠিক করেছে । রিকশাআলা রিকশার সিটে বসে ঘুমুচ্ছে । মজিদ শান্তমুখে ড্রাইভারের পাশে বসে বিশ্রাম করছে । আমার মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল । আজও জামানকে জিজ্ঞেস করা হলো না- তার মুখে বসন্তের দাগ এল কী করে  কী করে । কিছু কিছু প্রশ্ন আছে যা কোনোদিনও করা হয় না । এটিও বোধহয় সেই জাতীয় কোনো প্রশ্ন ।

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২১

 

বিরিয়ানি খেয়ে অনেক রাতে ফিরলাম ।

অসহ্য গরম ছোট্ট একটা চৌকিতে আমি এবঃ মজিদ শুয়ে আছি । মজিদের হাতে হাতপাখা । সে দ্রুত তার পাখা নাড়ছে । গরম তাতে কমছে না ।বরং বাড়ছে ।মনে হচ্ছে ময়ূরাক্ষী নদীটাকে বের করতে হবে । নয়তো এই দঃসহ রাত পার করা যাবে না ।

মজিদের হাতপাখার আন্দোলন থেমে গেছে । সে গভীর ঘুমে অচেতন । ঘরে শুনশান নীরবতা । আমি ময়ূরাক্ষী নদীর কথা ভাবতে শুরু করলাম । সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্য পাল্টে গেল । এই নদী একেক সময় একেকভাবে আসে । আজ এসেছে দুপুরের নদী হয়ে। প্রখর দুপুর । নদীর জলে আকাশের ঘননীল ছায়া । ঝিম ধরে আছে চারদিক । হঠাৎ নদী মিলিয়ে গেল । মজিদ ঘুমের মধ্যেই বিশ্রী শব্দ করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে ।

এই মজিদ, এই ।

মজিদ চোখ মেলল । কী হয়েছে রে ?

কিছু না ।

স্বপ্ন দেখেছিস ?

হু ।

দুঃস্বপ্ন ?

না ।

কী স্বপ্ন দেখেছিস বল তো ?

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২২

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *