প্র্যাকটিসে যাচ্ছেন না ?
আর প্র্যাকটিস! সব মাথায় উঠেছে ।
আমি ফুপার সামনের চেয়ারে বসলাম । মনে হচ্ছে আজও তিনি খানিকটা মদ্যপান করেছেন । আমি সহজ গলায় বললাম, ফুপা ঐ চাকরিটা কি আছে ? কোন চাকরি ?
ঐ যে আমাকে বলেছিলেন, বাদলকে আগের অবস্থায় নিয়ে গেলে ব্যবস্থা করে দেবেন ।
তুমি চাকরি করবে ? নতুন কথা শুনছি ।
আমি করব না, আমার এক বন্ধুর জন্যে ।
ফুপা চুপ করে রইলেন । আমি বললাম, বাদলের ব্যাপারটা আমি দেখছি । আপনি ওর চাকরিটা দেখুন ।
বাদলের কিছু তুমি করতে পারবে না । ও এখন সমস্ত চিকিৎসার অতীত । বইপত্র পুড়িয়ে ফেলছে । ছাদে আগুন জ্বলিয়েছে । সেই আগুনের সামনে মাথা ঝাঁকাচ্ছে, আর মাথা থেকে উকুন পড়ছে আগুনে । পটপট শব্দ হচ্ছে । ছি ছি, কী কান্ড! আমি হতভম্ব হয়ে দেখলাম । একবার ভাবলাম একটা চড় লাগাই, তারপর মনে হলো, কী লাভ ?
ফুপা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন ।
আমি হাসলাম ।
ফুপা বললেন, তুমি হাসছ ? তোমার কাছে পুরো ব্যাপারটা হাস্যকর মনে হতে পারে । আমার কাছে না।
আমি বাদলের ব্যাপারটা দেখছি । আজই দেখছি, আপনি আমার বন্ধুর চাকরির ব্যাপারটা দেখবেন ।
তোমার বন্ধু কি তোমার মতো ?
না । ও চমৎকার ছেলে । সাত চড়ে রা নেই টাইপ ।
আমি বাদলকে নিয়ে বের হলাম ।
বাদল মহাখুশি ।
রাস্তায় নেমেই বলল, তোমার পরিকল্পনা কী হিমুভাই ? সারারাত রাস্তায় হাঁটব ? দু–বছর আগের কথা কি তোমার মনে আছে ? সারারাত আমরা হাঁটলাম । জোছনা রাত । মনে হচ্ছিল আমরা দস্তয়োভস্কির উপন্যাসের কোনো চরিত্র । মনে আছে ?
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৩
আছে ।
আজও কি সেইরকম কিছু ?
না । আজ যাচ্ছি সেলুনে, দাড়িগোঁফ কামাব ।
বাদল হতভম্ব হয়ে গেল । যেন এমন অদ্ভুত কথা সে জীবনে শুনেনি । ক্ষীণস্বরে বলল, দাড়িগোঁফে, লম্বা চুলে তোমাকে যে কী অদ্ভুত সুন্দর লাগে তা তো তুমি জানো না । তোমাকে অবিকল রাসপুটিনের মতো লাগে ।
রাসপুটিনের মতো লাগলেও ফেলে দিতে হবে । এক জিনিস বেশিদিন ধরে রাখতে নেই । ভোল পাল্টাতে হয় । অনেকটা সাপের খোলস ছাড়ার মতো । কিছুদিন অন্য সাজে থাকব– তারপর আবার …
তাহলে কি আমিও ফেলে দেব ?
দেখ চিন্তা করে ।
অবশ্যি উকুনের জন্যে কষ্ট হচ্ছে । ভয়ঙ্কর চুলকায় । রাতে ঘুম ভালো হয় না ।
তাহলে বরং ফেলেই দে ।
তুমি ফেললে তো ফেলবই ।
বাদল হাসতে লাগলো । মনে হচ্ছে গভীর কোনো আনন্দে তার হৃদয় পূর্ণ হয়ে আছে । দুজনে চুল কেটে দাড়িগোঁফ ফেলে দিলাম ।
বাদল কয়েকবারই বলল, খুব হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে বাতাসে উড়ে যাব । তুমি বললাম, আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখ, নিজেকে অন্য মানুষ বলে মনে হচ্ছেনা ?
হ্যাঁ হচ্ছে ।
মাঝে মাঝে নিজেকে অচেনা করাও দরকার । যখন যে সাজ ধরবি– সেই রকম ব্যবহার করবি । একে বলে ব্যক্তিত্ব রূপান্তর । বুঝতে পারছিস ?
পারছি ।
ফুপা এবং ফুপু তাদের ছেলেকে দেখে দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না । সবার আগে নিজেকে সামলে নিলেন ফুপা । আমার দিকে তাকিয়ে কোমল গলায় বললেন, তোমার বন্ধুকে নিয়ে কাল আমার চেম্বারে এসো । এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে। মনে থাকবে ?
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৩
হ্যাঁ থাকবে ।
হিমু, মেনি থ্যাংকস ।
আমি হাসলাম ।
ফুপা বললেন, আমার ঘরে এসো ।গল্প করি । তোমার সঙ্গে গল্পই করা হয় না । আমি বললাম, আপনি যান, আমি আসছি । একটা টেলিফোন করে আসি ।
ফুপা বললেন, তোমার এই টেলিফোন–ব্যাধিরও একটা চিকিৎসা হওয়া দরকার । কার সঙ্গে এত কথা বল ? ঘণ্টর–পর–ঘণ্টা কথা। আমার তো দুটা কথা বললেই বিরক্তি লাগে ।
ওপাশ থেকে হ্যালো শুনেই আমি বললাম, কে, মীরা ?
অনেকক্ষণ কোনো শব্দ হলো না । আমি নিশ্চিত, মীরা । নিজেকে সামলাবার জন্যে সময় নিচ্ছে ।
হ্যালো, তুমি কি মীরা ?
