হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৪

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৪

আপনি আমাদের এত কষ্ট দিচ্ছেন কেন ?

কষ্ট দিচ্ছি ?

হ্যাঁ দিচ্ছেন । না হয় আমরা একটা ভুল করেছিলাম । সব মানুষই তো ভুল করে । সামান্য ভুলের জন্যে যদি এত কষ্ট দেন !

আমি টেলিফোন করলে কষ্ট পাও ?

হ্যাঁ পাই । কারণ আপনি হঠাৎ রেখে দেন । আপনি কি মানুষটাই এমন, না ইচ্ছা করে এসব করেন ?

বেশিরভাগ সময় ইচ্ছা করেই করি ।

আপনি কি একবার আসবেন আমাদের বাসায় ?

এখনো বুঝতে পারছি না । হয়তো আসব ।

কবিতার খাতাটা নিতে আসবেন না ?

ওটা আমি তোমাকে উপহার দিলাম, মীরা ।

তার মানে আপনি আসবেন না ?

না । মানুষের মুখোমুখি হতে আমার ভালো লাগে না । এতে অতিদ্রুত মায়া পড়ে যায় । টেলিফোনে কথা বললে মায়া জন্মানোর সম্ভাবনা কম, সেইজন্যেই টেলিফোন আমার এত প্রিয় । টেলিফোনে কথা বললে মায়া জন্মায় না । মায়া জন্মানোর অনেক কষ্ট ।

তাছাড়া-

তাছাড়া কী ?

থাক, আরেকদিন বলব ।

আপনার বান্ধবী রূপার সঙ্গে কি আপনার প্রায়ই দেখা হয় ?

মাঝে মাঝে হয় । যখন সে যেতে বলে তখন যাই না । যখন যেতে বলে না তখন হঠাৎ উপস্থিত হই ।

উনি কি খুবই সুন্দর ?

তোমাকে তো একবার বলেছি- ও খুব সুন্দর ।

আপনি টেলিফোন রেখে দেবার আগে দয়া করে শুধু একটি সত্যি কথা বলুন । আমি তো সবই সত্যি বলছি । কী জানতে চাচ্ছ বল তো ?

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৪

 

ঐদিন কি পুলিশ আপনাকে মেরেছিল ?

না ।

এই তো মিথ্যা বললেন ।

আজ সত্যি বলছি- ঐদিন মিথ্যা বলেছিলাম ।

আপনার কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যা কে জানে ?

সে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনাকে একটা খবর দেই- টুটুলভাইকে পাওয়া গেছে । কাউকে কিছু না বলে এক মাসের জন্যে কোলকাতা গিয়েছিল । মজার ব্যাপার কি জানেন- এখন আর আমার টুটুলভাইকে ভালো লাগছে না । ঐদিন টেলিফোন করেছিল, আমি কথাও বলিনি । আমার এরকম হলো কেন বলুন তো ?

আমি টেলিফোন রেখে ফুপার খোঁজে গেলাম ।

তিনি ছাদে । হুইস্কির বোতল খোলা হয়েছে । বরফের পাত্র, ঠাণ্ডাপানি, প্লেটে ভিনিগার মেশানো চিনাবাদাম । আমাকে দেখেই তিনি খুশি খুশি গলায় বললেন, বাদলের পরিবর্তটা সেলিব্রেট করছি ।

ফুপু রাগ করবেন না ?

না, তাকে বলেছি । আজ সে কোনোকিছুতেই রাগ করবে না । বমি করে ‍যদি সারা ঘর ভাসিয়ে দেই তবু রাগ করবে না । তুমি বস হিমু, আরাম করে বস । সম্পর্ক মিশ খাচ্ছে না । মিশ খেলে তোমাকেও খানিকটা দিতাম । আপনি ক-পেগ খেয়েছেন ?

আরে না মাত্রই তো শুরু । আমি নটা পর্যন্ত পারি । আমার কিছুই হয় না । ঐদিন বলেছিলেন ছটা । বলেছিলাম ? বলে থাকলে ভুল বলেছি- নটা হচ্ছে আমার লিমিট । নাইন । এনআই এনই । নাইন ।

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৪

 

আর খাবেন না, ফুপা ।

ফুপা গ্রাসে নতুন করে ঢালতে ঢালতে বললেন, খেতে খেতে তোমার কথাই ভাবছিলাম । তুমি মানুষটা খারাপ না । পাগলা ভাব আছে, তবে ভালো । তোমার বাবা পাগলা ছিল তবে ভালো ছিল না ।

ভালো ছিল না বলছেন কেন ?

দেখেছি তো । ও বাড়ি ছেড়ে পালাল আমার বিয়ের অনেক পরে । উন্মাদ ছিল । ফুপা, আপনি কিন্ত্ত বড় দ্রুত খাচ্ছেন । শুনেছি দ্রুত খাওয়া খারাপ । ফুপা গভীর গলায় বললেন, নাইন হচ্ছে আমার লিমিট । নাইনের আগে স্টপ করে দেব । হ্যাঁ, যে- কথা বলছিলাম – আমার ধারণা তোমার বাবা ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণীর উন্মাদ । এটা হচ্ছে আমার ধারণা ! তুমি আবার রাগ করছ না তো ?

না ।

ছেলেকে মহাপুরুষ বানানোর অদ্ভুদ খেয়াল উন্মাদের মাথাতেই শুধু আসে, বুঝলে ? আরে বাবা, মানুষ কী হবে সব আগে থেকে ঠিক করা থাকে ।

কে ঠিক করে রাখেন, ঈশ্বর ?

প্রকৃতিও বলতে পার ।

 

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৫

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *