হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস দরজার ওপাশে খন্ড -১

দরজার ওপাশে খন্ড -১

ঘুমের মধ্যেই শুনলাম কে যেন ডাকল, হিমু, এই হিমু ।গলার স্বর একইসঙ্গে চেনা এবং অচেনা । যে ডাকছে তার সঙ্গে অনেক বছর আগে পরিচয় ছিল, এখন নেই । মানুষটাকে ভুলে গেছি, কিন্ত্ত স্মৃতিতে তার গলার স্বর রয়ে গেছে । পুরুষালী ভারী গলা । একটু শ্লেষ্মা জড়ানো । আমি আধোঘুমে জবাব দিলাম, কে ? কেউ উত্তর ‍দিল না । ভয়াবহ ধরণের নিরবতা ।

আবার বললাম, কে? কে ওখানে ? ছোট্ট করে কেউ নিঃশ্বাস ফেলল । আশ্চর্য! নিঃশ্বাস ফেলার শব্দটা আমার চেনা । টুক টুক করে দু’বার শব্দ হল দরজার । দরজার ওপাশের মানুষটি চাপা গলায়, হিমু, এই হিমু ।

আমার অস্বস্তিবোধ হতে লাগল । ঘর অন্ধকার, গাঢ় অন্ধকার । রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল বলে দরজা-জানালা বন্ধ করে শুয়েছি । রেডিয়াম ডায়ালের টেবিল ঘড়ি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাওয়ার কথা নয়, কিন্ত্ত সবকিছু পরিষ্কার দেখছি । ঐ তো দেয়ালের ক্যালেন্ডার দেখা যাচ্ছে । ক্যালেন্ডারের লেখাগুলি পর্যন্ত পড়তে পারছি ।

এর মানে কি ? এটা কি তাহলে স্বপ্ন? পুরো ব্যাপারটা ঘটছে স্বপ্নে ? দরজার ওপাশে আসলে কেউ নেই? চেনা এবং অচেনা গলায় আমাকে ডাকছে না ?

দরজার ওপাশে খন্ড -১

ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছি, এবং ঘুমের মধ্যেই বুঝতে পারছি এটা স্বপ্ন। স্বপ্নটা শেষপর্যন্ত দেখতে ইচ্ছা করছে না । আমি দরজা খুলে দেখতে চাই না – দরজার ওপাশে কে দাঁড়িয়ে আছে । আমার জানার কোনো ইচ্ছা নেই ভারি গলায় কে আমাকে ডাকছে । আমি জেগে ওঠার চেষ্টা করছি । জাগতে পারছি না কেউ আমাকে স্বপ্নের শেষটা দেখাতে চায়, আমি দেখতে চাই না । প্রচণ্ড অস্বস্তিতে ঘুমের মধ্যেই ছটফট করতে করতে আমি জেগে উঠলাম ।

ঘরের হাওয়া গরম হয়ে আছে । দরজা- জানালা বন্ধ । কিছু দেখা যাচ্ছে না । আমি বাতি জ্বালালাম । স্বপ্নে দেয়ালে যে জায়গায় ক্যালেন্ডার ছিল সেখানে ক্যালেন্ডার নেই । খাটের নিচে টকটক শব্দ হচ্ছে । প্রায়ই হয় । কিসের শব্দ আমার জানা নেই । ইঁদুর হবে না, ইঁদুর টকটক শব্দ করে না । আমি হাতড়ে হাতড়ে দরজা খুললাম ।

ভোর হয়েছে । আলো হয়ে আছে চারদিক । আমার দরজা-জানালা বন্ধ ছিল বলেই ঘর হয়েছিল অন্ধকার । বারান্দায় এসে দেখি, পাশের ঘরের বায়েজিদ সাহেব বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁত মাজছেন । তাঁর চোখ টকটকে লাল । এটা কোন নতুন ব্যাপার না । বায়েজিদ চোখ সব সময়ই লাল । তিনি আমাকে দেখে নিচু গলায় বললেন, কি ব্যাপার হিমু সাহেব? এত সকালে জেগে উঠেছেন, ব্যাপার কি ?

‘ঘুম ভেঙ্গে গেল ।’

‘সুবেহ সাদেকের সময় ঘুম ভাঙ্গা ভাল । এই সময় আল্লাহ পাক বেহেশতের জানালা খুলে রাখেন । ঐ জানালা দিয়ে বেহেশতের হাওয়া আসে পৃথিবীতে । ঐ হাওয়া যাদের গায়ে লাগে তারা বেহেশতবাসী হয় ।’                                                                                   ‘কে বলেছে আপনাকে?’

দরজার ওপাশে খন্ড -১

তিনি অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, শোনা কথা ।

‘আপনি কি এই জন্যেই রোজ ভোরে উঠে বেহেশতের হাওয়া গায়ে লাগান?’

বায়েজিদ সাহেব লজ্জিত ভঙ্গিতে হেসে ফেললেন । ভোরবেলা অদ্ভুদ আলোর কারণেই তাঁকে আজ অনেক কম বয়স্ক মনে হচ্ছে । ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি । তাঁকে দেখে আমার সবসময় মনে হয়েছে তাঁর গা থেকে কেউ একজন লেবুর মত সমস্ত রস চিপে নিয়ে নিয়েছে ।

হাঁটেন খানিকটা কুজো হয়ে । চোখে চোখ পড়লে চোখ নামিয়ে নেন । রাস্তায় দেখা হলে যদি জিজ্ঞেস করি, ‘কেমন আছেন বায়েজিদ সাহেব?’ তিনি বিব্রত গলায় কোন রকমে বলেন, ‘এই আছি’ । ছুটির দিনে তিনি তার ঘরে থাকেন ।

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস দরজার ওপাশে খন্ড-২

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *