প্লেনে আসতে-আসতে সারাক্ষণ আমি আমার মেয়ের নাম ভেবেছি। কতো লক্ষ লক্ষ নাম পৃথিবীতে, কিন্তু কোনােটিই আমার মনে ধরছে না। কোনােটিই যেন মায়ের গর্ভে ঘুমিয়ে থাকা রাজকন্যার উপযুক্ত নাম নয়। এই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নামটি আমাকে আমার মেয়ের জন্য খুঁজে বের করতে হবে। আজ থেকে আঠারাে, উনিশ বা কুড়ি বছর পর কোনো এক প্রেমিক পুরুষ এই নামে আমার মেয়েকে ডাকবে। ভালােবাসার কর্তো না গল্প সে করবে। হেক্টর এয়ারপাের্টের লাউঞ্জে বসে এইসব ভাবছি।
চীৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। পৃথিবীটা এমন যে বেশির ভাগ ইচ্ছাই কাজে খাটানাে যায় না। আমি বসে বসে ভাের হবার জন্যে অপেক্ষা করছি। এতো ভােরে কেউ আমাকে নিতে আসবে এরকম মনে করার কোনাে কারণ নেই। প্রতিবছর হাজার খানিক বিদেশী ছাত্র নর্থডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করতে আসে। কার এতাে গরজ পড়েছে এদের এয়ারপাের্ট থেকে খাতির করে ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে যাওয়ার ?
তুমি কি বাংলাদেশের ছাত্র–আহামাদ ? আমি চমকে তাকালাম। পঁচিশ-ত্রিশ বছরের যে মহিলা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁর দিকে বেশিক্ষণ তাকানাে যায় না। চোখ ঝলসে যায়। অপূর্ব রূপবতী { যে পোশাক তাঁর গায়ে তার উদ্দেশ্য সম্ভবত শরীরের সুন্দর অংশগুলোর দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। আমি জবাব না দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। ভদ্রমহিলা আবার বললেন- তুমি কি বাংলাদেশের ছাত্র আহমাদ ?
আমি না সূচক মাথা নাড়লাম।
ঃ আমার নাম টয়ল ক্রেইন। আমি হচ্ছি নর্থডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির ফরেন স্টুডেন্ট অ্যাডভাইজার। আমি খুবই লজ্জিত যে দেরি করে ফেলেছি। চলো, রওনা হওয়া যাক। তােমার সঙ্গের সব জিনিসপত্র কি এই?
ইয়েস ।
হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-২
আমার সব জবাব এক শব্দে, ইয়েস এবং নাে-র মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইংরেজিতে একটা পুরো বাক্য বলার মতাে সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে একটা পুরাে বাক্য বলেই এই ভদ্রমহিলা হা হা করে হেসে উঠবেন।
ঃ আহমাদ, তুমি কি রওনা হবার আগে এক কাপ কফি খাবে? বাইরে বেশ ঠাণ্ডা। হঠাৎ কেন জানি ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। কফি আনবাে?
ওনা।। | ঃ আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি পূর্বদেশীয় ছাত্র-ছাত্রীদের কোনাে কিছু খাবার কথা বললেই তারা প্রথমে বলে ‘না’। অথচ তাদের খাবার ইচ্ছা আছে। আমি শুনেছি ‘না’ বলাটা তাদের ভদ্রতার একটা অংশ। কাজেই আমি আবার তােমাকে জিজ্ঞেস করছি—তুমি কি কফি খেতে চাও?
ও চাই।।
ভদ্রমহিলা কাগজের গ্লাসে দু’কাপ কফি নিয়ে এলেন। এর চেয়ে কুৎসিত কোনাে পানীয় অ্যামি এই জীবনে খাইনি। কুষা তিতকুটে একটা জিনিস। নাড়ীভুড়ি উল্টে আসার জোগাড়। ভদ্রমহিলা বললেন, হট কফি ভালাে লাগছে না? আমি মুখ বিকৃত করে বললাম, খুব ভালাে।
টয়লা ক্লেইন হেসে ফেলে বললেন, আহামাদ তােমাকে আমি একটা উপদেশ দিচ্ছি। আমেরিকায় পূর্বদেশীয় ভদ্রতা অচল। এদেশে সব কিছু তুমি সরাসরি বলবে। কফি ভালাে লাগলে বলবে—ভালো। খারাপ লাগলে কফির কাপ ‘ইয়াক বলে ছুঁড়ে ফেলবে ডাস্টবিনে।
আমি ইয়াক বলে একটা শব্দ করে ডাস্টবিনে কফির কাপ ছুঁড়ে ফেললাম। এই হচ্ছে আমেরিকায় আমেরিকানদের মতাে আমার প্রথম আচরণ।
টয়লা ক্রেইনের গাঢ় লাল রঙের গাড়ি ডাউনটাউন ফারগাের দিকে যাচ্ছে। আমি ঝিম ধরে পেছনের সীটে বসে আছি। আশেপাশের দৃশ্য আমাকে মােটেই টানছে না। টয়ল ক্রেইন একটা ছােটখাট বক্তৃতা দিলেন। প্রতিটি শব্দ খুব স্পষ্ট করে বললেন। তাতে বুঝতে আমার তেমন কোনো অসুবিধা হলাে না।
হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-২
আমেরিকানদের ইংরেজি বােঝা যায়। ব্রিটিশদেরটা বােঝা যায় না। ব্রিটিশরা অর্ধেক কথা বলে, অর্ধেক পেটে রেখে দেয়। যা বলে তা-ও বলার আগে মুখে খানিকক্ষণ রেখে গর্গ করে বলে আমার ধারণা।
ঃ আহামাদ, তােমাকে আমি নিয়ে যাচ্ছি ‘হােটেল গ্রেভার ইনে? হােটেল গ্রেভার ইন পুরােদস্তর একটা হােটেল। তবে হােটেলের মালিক গত বছর এই হােটেল স্টেট ইউনিভার্সিটিকে দান করে দিয়েছেন। বর্তমানে ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা হােটেলটা চালাচ্ছে।
