হুমায়ূন আহমেদের লেখা হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৪

হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৪

ও আচ্ছা। আমি মুদ্রা এবং স্ট্যাম্প দুটাই জমাই। এটা আমার হবি। বৃদ্ধা বিমর্ষ মুখে চলে গেলেন। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এই মহিলা জীবনের শেষ কটি দিন স্ট্যাম্প বা মুদ্রা জমিয়ে যাচ্ছেন কেন বুঝতে পারলাম না। অন্য কোনাে সঞ্চয় কি তাঁর জীবনে নেই? বৃদ্ধা চলে যাবার পর পরই হােটেলের লীর লােক ঢুকলাে।

কালাে আমেরিকান এর নাম জর্জ ওয়াশিংটন। নিগ্রোদের মধ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের নাম অনুসারে নাম রাখার একটা প্রবণতা আছে। এই জর্জ ওয়াশিংটন সম্ভবত আমার গায়ের কৃষ্ণবর্ণের কারণে আমার প্রতি শুরুতেই গভীর মমতা দেখাতে শুরু করলাে। গম্ভীর মুখে বললাে, প্রথম এসেছে আমেরিকায়?

ওহা। ও পড়াশােনার জন্যে ? হ্যা। ? নিজেদের দেশে পড়াশােনা হয় না যে এই পচা জায়গায় আসতে হয় ? আমি নিশূপ। সে গুলা নামিয়ে বলল, বুড়িগুলাের কাছ থেকে সাবধানে থাকবে, এ বড় বিরক্ত করে? মােটেই পাত্তা দেবে না।ও ঠিক আছে। ও মদ্যপান করাে ?

না। ও মাঝে-মধ্যে করতে পারে, এতে দোষের কিছু নেই। তবে মেয়েদের সঙ্গে মেশার ব্যাপারে সাবধান থাকবে। হুকার(বেশ্যাদের নিয়ে বিছানায় যাবে না অসুখ-বিসুখ হবে। তাছাড়া হুকারদের বেশিরভাগই হচ্ছে চোর, টাকা-পয়সা, ঘড়ি এইসব নিয়ে পালিয়ে যাবে। হকার কি করে চিনতে হয় আমি তােমাকে শিখিয়ে দেবো।? আচ্ছা । ও খাওয়া-দাওয়া কোথায় করবে? হােটেলে ?

হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৪

ও খবরদার, এই হােটেলের রেস্টুরেন্টে খাবে না। রান্না কুৎসিত, দামও বেশি। দুই ব্লক পরে একটা হােটেল আছে, নামবীফ এন্ড বান।

ও বীফ ঐঙ বান?

ঃ হ্যা। ঐখানে খাবার ভালাে, দামেও সস্তা। ও তােমাকে ধন্যবাদ ।। ৪ ধন্যবাদের প্রয়ােজন নেই। বিয়ে করেছে ?

হ্যা। ও বউয়ের ছবি আছে? ? আছে। # দেখাও।

আমি ছবি বের করে দেখালাম। জর্জ ওয়াশিংটন নানা ভঙ্গিতে ছবি দেখে বলল—অপূর্ব সুন্দরী। তুমি অতি ভাগ্যবান।

আমেরিকানদের অনেক কুৎসিত অভ্যাসের পাশে পাশে অনেক সুন্দর অভ্যাসও আছে। যার একটি হচ্ছে, ছবি দেখে মুগ্ধ হবার ভান করা। আমি লক্ষ্য করেছি, অতিসামান্য পরিচয়েও এরা বলে-ফ্যামিলি ছবি সঙ্গে আছে ? দেখি কেমন ?

ছবিতে যদি তারকা রাক্ষসীর মতাে কোনাে দাত বের করা মহিলাও থাকে, এরা বলবে, অপূর্ব! তুমি ভাগ্যবান পুরুষ, লাকি ডগ। | এরা মানিব্যাগে ক্রেডিট কার্ডের পাশে নিজের স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের ছবি রাখে। এর কোন ব্যতিক্রম পাওয়া যাবে না বলেই আমার ধারণা। অবশ্যি স্ত্রী। বদলাবার সঙ্গে সঙ্গে ছবিও বদলায়। নতুন স্ত্রীকে দিনের মধ্যে একশবার মধুর কণ্ঠে হানি ডাকে। সেই হানি এক সময় হেমলক হয়ে যায়, তখন খোজ পড়ে নতুন কোনাে হানির মানিব্যাগে আবার ছবি বদল হয়।

জর্জ ওয়াশিংট্রন চলে গেলো। আমি সন্ধ্যা পর্যন্ত একা একা নিজের ঘরে বসে রইলাম। কিছুই ভালাে লাগে না। ঘরে চিঠি লেখার কাগজপত্র আছে। চিঠি লিখতে ইচ্ছে করলাে না। সঙ্গে একটিমাত্র বাংলা বই–রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ। ভেবেছিলাম একাকীত্বের জীবন গল্পগুলাে পড়তে ভালো লাগবে। আমার প্রিয় গল্পের একটি পড়তে চেষ্টা করলাম

… সুরবালার সঙ্গে একত্রে পাঠশালায় গিয়াছি এবং বউ বউ খেলিয়াছি। তাহাদের বাড়িতে গেলে সুরবালার মা আমাকে বড় যত্ন করিতেন এবং আমাদের দুইজনকে একত্র করিয়া আপনা আপনি বলাবলি করিতেন, আহা দুটিতে বেশ মানায় ….

হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৪

আমার এতাে প্রিয় গল্প অথচ পড়তে ভালাে লাগলাে না, ইচ্ছে হলো হােটেলের জানালা খুলে নিচে লাফিয়ে পড়ি।

রাতে খেতে গেলাম ‘বীফ এন্ড বান’ রেস্টুরেন্টে। আলাে ঝলমল ছােটখাট একটা রেস্টুরেন্ট। বিমানবালাদের মতাে পােশাকের তিনটি ফুটফুটে তরুণী খাবার দিচ্ছে। অর্ডার নিচ্ছে। মাঝে মাঝে রসিকতা করছে। এদের চেহারা যেমন সুন্দর কথাবার্তাও তেমনি মিষ্টি। আমেরিকান সুন্দরীরা কেমন তা দেখতে হলে এদের বার রেস্টুরেন্টে উঁকি দিয়ে ওয়েট্রেসদের দেখতে হয়। | আমি কোণার দিকের একটা টেবিলে বসলাম। আমার পকেটে আছে মাত্র পনেরাে ডলার। উনিশশাে সাতাত্তর সালের কথা, তখন দেশের বাইরে কুড়ি ডলারের বেশি নেয়া যেতাে না। আমি কুড়ি ডলার নিয়েই বের হয়েছিলাম।

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা হোটেল গ্রেভার ইন খন্ড-৫

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *