কর্নেল দুটো কাগজই ভাঁজ করে টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে বললেন, এই নিয়ে প্রায় পনের বার পরীক্ষা করলাম জয়ন্ত। প্রত্যেকবারই মনে হয়েছে দুটোর মধ্যে প্রশ্নোত্তরের সম্পর্ক আছে। রায়সায়েবেরটা যদি প্রশ্ন হয়, চন্দ্রিকারটা তার উত্তর।
আপনাকে কেউ চাই চিচিং ফাঁক বলে টেলিফোন করছে বলেছিলেন। ‘গতরাতেও বার দুই করেছিল। অগত্যা বলেছি, চিচিং ফাঁক দেব। তবে একটা শর্তে। ডিস্কো কে আমাকে জানাতে হবে।
কী বলল ? কর্নেল হাসলেন। বলল, আমিই ডিস্কো। তখন বললাম, ঠিক আছে। কিন্তু আপনার আসল নাম এবং ঠিকানা জানান। আমি আপনাকে চিচিং ফাঁক পৌঁছে দেব।
তারপর? তারপর? | ‘রাজী হলাে না। বলল, রাঙাটুলির ভবানীমন্দিরে রাত্রিবেলা রেখে আসতে হবে। তার বদলে আমার রাহাখরচ বাবদ পাঁচশাে টাকা যে কোনও ভাবে আমাকে পৌঁছে দেবে।”
অবাক হয়ে বললাম, “আবার সেই রাঙাটুলির ভবানীমন্দির? হ্যা। জায়গাটা গােপন লেনদেনের উপযােগী।
কর্নেল সমগ্র-১ ‘আপনি রাজী হলেন না কেন? ভবানীমন্দিরে পুলিশের ফাঁদ পেতে ডিস্কোকে পাকড়াও করা যেত।
কর্নেল টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, কিন্তু যে ফোনে কথা বলছে, সে–ই যে ডিস্কো তার প্রমাণ কী? আমি রিং করে যখন ডিস্কো বা তার কোনও ডামির সঙ্গে কথা বলেছি, তখন কিন্তু চিচিং ফাঁক প্রসঙ্গ সে তােলেনি। কাজেই একজন তৃতীয় ব্যক্তির কথা এসে যাচ্ছে। অরিজিৎও এই তৃতীয় ব্যক্তির কথা বলছিল, মনে পড়ছে তােমার?
কর্নেল সমগ্র প্রথম খন্ড এর অংশ -২৪
একটু ভেবে বললাম, তা-ও তাে বটে। ডিস্কো চন্দ্রিকার ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি পাঠিয়েছিল স্বপন দাশের হাতে। স্বপনকে খুন করে চাবিটা হাতিয়ে চন্দ্রিকাকে খুন করেছে কেউ এবং সেই খুনের উদ্দেশ্য চন্দ্রিকার পার্সে লুকিয়ে রাখা ওই অদ্ভুত চিরকুট হাতানাে। কাজেই তৃতীয় একজনের কথা এসে পড়ছে। সে-ই দেখা যাচ্ছে নাটের গুরু।
কর্নেল দাড়ি নেড়ে সায় দিলেন, তােমার বুদ্ধি খুলেছে ডার্লিং।
উৎসাহে উদ্দীপ্ত হয়ে বললাম, এর সঙ্গে ইন্দ্রজিৎ বনাম ডিস্কোর বিরােধ সম্পর্কহীন। তার মানে ইন্দ্রজিতের সঙ্গে ডিস্কোর লড়াই নেহাত প্রেসটিজের লড়াই।
এই সময় ডােরবেল বাজল। তারপর ষষ্ঠী এসে বলল, একটা মেয়েছেলে এয়েছেন বাবামশাই। বললেন, খুব দরকার। আমি বললাম, একটু রােয়েট করুন—
‘রােয়েট না করিয়ে নিয়ে আয়।।
ষষ্ঠী কর্নেলের ভেংচিকাটা বুঝতে পারে। বেজায় গম্ভীর হয়ে চলে গেল। তারপর এক যুবতী ঘরে ঢুকে নমস্কার করে বলল, আমি কর্নেলসায়েবের সঙ্গে দেখা করতে চাই।
কর্নেল বললেন, বসুন। একটু দ্বিধার সঙ্গে সে বলল, ‘কথাগুলাে কনফিডেনশিয়্যাল। ‘স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন। আলাপ করিয়ে দিই। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী। আপনি?
কর্নেল সমগ্র প্রথম খন্ড এর অংশ -২৪
আমার নাম দীপ্তি রাহা। লিন্টন স্ট্রিটে থাকি। ‘যা বলতে চান, জয়ন্তের সামনে বলতে পারেন। কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘আপনার কোনও গােপন কথাই আমি আমার এই তরুণ বন্ধুর কাছে গােপন রাখতে পারব না।
দীপ্তি রাহাকে নার্ভাস দেখাচ্ছিল। সাদামাটা গড় বাঙালি মেয়ের মতাে চেহারা। আস্তে বলল, আমার বাবা গােপেন্দ্রনাথ রাহার নাম শুনেছেন কি না জানি না। এক সময় ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটর লিন। ধর্মতলায় ওঁর অফিসটা এখনও আছে। ডিস্ট্রিক্টশন কারবার বন্ধ হয়ে গেলেও মাঝে মাঝে কোনও দিন বিকেল থেকে সন্ধ্যাঅব্দি অফিসে গিয়ে বসে থাকেন।
ওঁর চেনাজানা লােকেরা আড্ডা দিতে আসেন। কিন্তু কিছুদিন থেকে বাবা লক্ষ্য করছেন, ওঁর অফিসের মেঝেয় দামি বিদেশি সিগারেটের খালি প্যাকেট পড়ে থাকে। অ্যাশট্রে পােড়া সিগারেটের টুকরােয় ভর্তি। দুদিন আগে মেঝেয় মদের খালি বােতল পড়ে আছে দেখে বাবা
ভীষণ রেগে যান। বাড়ির কেয়ারটেকার চাঁদুবাবুকে খুব বকাবকি করেন। চাঁদুবাবু বলেছিলেন, কিছুই জানেন না। রাতবিরেতে এরিয়ার মস্তানরা হয়তাে ও-ঘরে এসে আড্ডা দেয়। ডুপ্লিকেট চাবি যােগাড় করা তাে সহজ। অত বড় তিনতলা বাড়ি। ডাক্তারের চেম্বার এবং অনেকগুলাে ছােটখাটো কোম্পানির অফিস আছে। কখন কে কী কাজে বাড়িতে যাতায়াত করছে, চাঁদুবাবুর পক্ষে জানা সম্ভব নয়।
কর্নেল সমগ্র প্রথম খন্ড এর অংশ -২৪
কর্নেল অভ্যাসমতাে চোখ বুজে হেলান দিয়ে শুনছিলেন। বললেন, আপনার বাবার ওই অফিসে টেলিফোন আছে?
দীপ্তি বলল, আছে। বাবা ওখান থেকে টেলিফোন খুব কদাচিৎ ব্যবহার করেন। অথচ এ মাসের বিলে চারশাের বেশি কল উঠেছে। মস্তানরা নিশ্চয় টেলিফোনও ব্যবহার করে। কিন্তু এসব তুচ্ছ ব্যাপারের জন্য বাবা আমাকে আপনার কাছে পাঠাননি। কাল বিকেলে র্যাকে পুরনাে ফাইলগুলাে থেকে ময়লা ঝুলকালি সাফ করছিলেন। হঠাৎ দেখেন ফাইলের তলায় একটা ড্যাগার লুকোনাে আছে। রক্তমাখা ড্যাগার।
টাটকা রক্ত নয় নিশ্চয়? ‘গােপেনবাবু পুলিশকে জানিয়েছেন কিছু? …. .. ……
দীপ্তি বিমর্ষমুখে মাথা নাড়ল। বলল, ‘পুলিশে জানানাে মানেই ঝামেলা। বাবা তাঁর বন্ধুদের নিষেধ করেছেন। ড্যাগারটা যেমন ছিল, তেমনই রেখে দিয়েছেন। বাবার এক বন্ধু প্রণব চ্যাটার্জি আপনার নাম ঠিকানা জানেন। তাঁর পরামর্শেই বাবা আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।
‘প্রণব চ্যাটার্জি? হ্যা—একসময়কার বিখ্যাত ইমপ্রেসারিও। আমার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল বটে। তাে আপনার বাবা এলেন না কেন?
কর্নেল সমগ্র প্রথম খন্ড এর অংশ -২৪
বাবা ভীষণ ভয় পেয়ে গেছেন। ওঁর ধারণা, উনি নিজে আপনার কাছে এলে ওঁকে ফলাে করবে মস্তানরা। আসলে বাবা প্রচণ্ড ভীতু মানুষ। তাছাড়া আজকাল মস্তানদেরই রাজত্ব। ওরা যা খুশি করতে পারে। দীপ্তি পাংশুমুখে হাসবার চেষ্টা করে ফের বলল, আমি বাবার পরামর্শে অনেকটা ঘুরে আপনার এখানে এসেছি।
প্রথমে গেলাম শ্যামবাজারে পিসিমার বাড়ি। সেখান থেকে এসপ্ল্যানেড়ী তারপর ট্রামে চেপে এখানে। এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলাম। এবার বললাম, কর্নেল! সম্ভকত ওটাই চন্দ্রিকাকে মার্ডারের উইপন। এবার ডিস্কোর ফোন নাম্বারের সঙ্গে গােপেনবাবুর অফিসের ফোন নাম্বার মিলিয়ে নিন।
Read More