সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর শেষ অংশ

প্রশ্নের পর প্রশ্নে উত্ত্যক্ত হলুম। নিহত ভদ্রলােকের বয়স পাশের বেশি, ষাটের কম। মাথায় টাক আছে অল্প। চুলে পাক ধরেছে। খুব শৌখিন মানুষ, তার পরিচয় স্পষ্ট। সেই গােলাপটা কুড়িয়ে নিলুম। কে দেখলুম। গন্ধটা বাসি হলেও চমৎকার। লােকটার পকেট হাতড়াতে গিয়ে হঠাৎ সংযত হলুম।।

কর্নেল সমগ্র 

সর্বনাশ! অমন একজন ঘুঘু গােয়েন্দার সাহচর্যে একাল কাটিয়েও আমার এতটুকু শিক্ষা হয়নি দেখছি! আমি একের পর এক সাংঘাতিক কাজ করে বসে আছি এতক্ষণ, এতটুকু ফলাফল ভাবিনি! এ একটা রীতিমতাে খুন-হত্যাকাণ্ড! আর আমি লাশের গায়ে হাত দিয়েছি, টেনে বের করেছি, মুণ্ডটা এনে জোড়া লাগিয়েছি, ভােজালিটা বের করেছি, শেষ অব্দি গােলাপটাও স্থানচ্যুত করেছি বা ছুঁয়েছি!

এতগুলাে বুদ্ধিহীন কাজের ফলে প্রকৃপক্ষে অনেক মারাত্মক সূত্র হয়তাে নষ্ট হয়ে গেছে। যেগুলাের একটামাত্র পেলেও সেই বৃদ্ধ ঘুঘুটি এবং পুলিশের কাজে লাগত। এবার নিজের প্রতি রাগে-দুঃখে অস্থির হলুম। আমি এমন ভ্যাবাকান্ত হয়ে পড়লাম কেন? নিজের প্রশ্নের একটা জবাব নিজে অবশ্য দেওয়া যায়, দরজা বাইরে থেকে আটকানাে দেখেই লাশ আবিষ্কার করার পর আমার খ। গােলমাল হয়ে গিয়েছিল। নির্ঘাত এটাই সবকিছুর কারণ। লাশের সঙ্গে নিজেকে বন্দী দেখেই বুদ্ধি ঠিক রাখতে পারিনি। 

এখন আর পন্তে লাভ নেই। আড়ষ্টভাবে জানালার কাছে গেলুম। কর্নেল সতর্ক থাকতে বলেছেন। তাহলে কি হত্যাকারীরা আবার ফিরে আসবে? 

কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর শেষ অংশ

জানলায় উকি মেরে তীক্ষ্ণদষ্টে তাকিয়ে রইলুম। উজ্জ্বল রােদে গাছপালা বা ঝােপঝাড়ের তলায়, পরিষ্কার নজর চলছে। কেউ বন্দুক তাক করলেও এখন টি এড়িয়ে যাবে না! গেটের ওপাশে পাহাড়টা আস্তে আস্তে নেমে গেছে। তারপর কিছু সমতল কিছু ঢালু জমিতে ওকবনটা রয়েছে। বাড়িটা উচুতে থাকায় তদর অব্দি এবড়াে-খেবড়াে প্রাইভেট রােড়টার অনেকখানি নজর চলে। পথে কাকেও দেখলুম না। 

মিনিট যে এত লম্বা হতে পারে, কল্পনাও করিনি। পনের মিনিট নয়—যেন শনেরটা ঘন্টা চলে গেল। তারপর দুরে পশ্চিমে গাড়ির হর্নের শব্দ শােনা গেল। উত্তেজনায় চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তারপর ওকবনের রাস্তায় একটা জিপ দেখতে পেলুম। জিপটা যখন ফাঁকা জায়গায় এল, কর্নেলের টুপি ও সাদা দাড়ি চোখে পড়ল। এত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুড়াের ! ওখান থেকেই সে আমার অস্তিত্ব টের পেয়ে হাত নাড়ছেন। 

গাড়িটা গেটে উঠে এল। সেই মুহুর্তে আমার পিছনের দিকের কোনাে একটা জানলায় তিনবার ঠুকঠুক করে আওয়াজ উঠে থেমে গেল। ততক্ষণে কর্নেলের ভারী গলার আওয়াজ শােনা গেছে বাইরের বারান্দায়–হ্যাল্লো জয়ন্ত ডালিং! গুড মর্নিং ! তারপর দরজার তালা ভাঙল কেউ। মাজিকের মতাে এক আঘাতেই তালাটা পড়ে যেতে শুনলুম। 

কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর শেষ অংশ

পর্দা সরিয়ে প্রথমে ঢুকলেন কর্নেল, তারপর দুজন পুলিশ অফিসার। ঢুকেই কর্নেল অস্ফুট চেচিয়ে উঠলেন—মাই গড! এ কী ব্যাপার জয়ন্ত! তাহলে কথাটা অসমাপ্ত রেখে উনি পুলিশ অফিসারের দিকে ঘুরলেন। একজন অফিসার এগিয়ে সাবধানে লাশের পাশে হাঁটু দুমড়ে বসে পড়লেন। অন্যজন গম্ভীর মুখে বললেন—তাহলে বেচারা শৈলেশ সিং সত্যি, পূর্ন হয়ে গেলেন। 

কর্নেল লাশটা দেখার পর আমার দিকে তাকালেন—লাশটা নিয়ে নিশ্চয় তুমি টানাটানি করেছ, জয়ন্ত? 

করেছি। আমার মাথার ঠিক ছিল না। 

—ম! সাক্সেনা, আসুন, আমরা আগে অন্যান্য ঘরগুলাে একবার দেখে নিই। ততক্ষণ মিঃ প্রসাদ, তঁার কাজ সেরে ফেলুন। ওই আপনাদের লােকজন বােধহয় এস পড়ল। 

বাইরে একটা গাড়ির শব্দ শােনা যাচ্ছিল। বারান্দায় গেলুম কর্নেলের সঙ্গে। কর্নেল আমার একটা হাত নিয়ে একটু স্নেহ প্রকাশ করেই ছেড়ে দিলেন। একদল পুলিশ কনস্টেবল আর অফিসার দৌড়ে এলেন। 

 

Read More

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-১

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *