সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-৮

না স্যার। তবে সে উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা সব ভাষাতেই কথা বলতে পারত। কলকাতাতে নাকি তার ছােটবেলা কেটেছিল। স্কুলেও পড়েছিল। তাই বাংলাও বলতে পারত। আজমগড়ে বাঙালি আছে। তারা তাে কান্নুকে বাঙালি বলেই মনে করত। কাম্পু কখন কোন রূপ ধরত, চেনা কঠিন হতাে।

ভৌতিক গল্পসমগ্র 

কাঙ্কুর লাশ কি পুলিশ নিয়ে গেছে? —শুনলুম একটু আগে মর্গে নিয়ে গেছে। কাল্পর সারা শরীর নাকি রক্তে লাল। 

ব্রেকফাস্টের পর সাড়ে নটায় আমি এবার সাহস করে কেল্লাবাড়িতে গেলাম। আমার মনে হচ্ছিল, কাল বিকেলে যে অশরীরীর জুতাের ছাপ আমার সামনে রাঙা ধুলােয় ফুটতে উঠতে দেখেছি, সেই ছদ্মবেশী অশােক রায় নামধারী দুবৃত্ত কাল্লুর হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়েছে। মনে-মনে তার উদ্দেশে কৃতজ্ঞতা জানালুম। 

এবার নির্ভয়ে সেই কালাে পাথরের পাশ দিয়ে সংকীর্ণ লাল ধুলোেভরা রাস্তায় পৌঁছলুম। চড়াই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আর সেই জুতাের ছাপ সামনে ফুটে উঠল না। কিছুটা যাওয়ার পর রাস্তাটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে। নিচে নেমেই ঘন গাছপালার ভেতর সারসার কয়েকটা কবর দেখলুম।

ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-৮

তারপর লাল পাথরের একটা কবর দেখে এগিয়ে গেলুম। সেই কবরের শিয়রে একটা রক্তকরবীর গাছ। কবরে লাল ফুল ঝরে পড়েছে। আমি বহুকাল আরবি লিপির ফলক দেখে-দেখে লিপি বিষয়ে সামান্য জ্ঞান অর্জন করেছিলুম। আরবিতে তিনটি হরফ চেনামাত্র বুঝতে পারলুম 

এটাই সেই সিপাহিবিদ্রাহীদের নেত্রী শাহজাদি রেশমা বেগমের কবর, যাঁর ডাকে হাজার হাজার হিন্দু-মুসলিম ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। 

হঠাৎ আমার মাথায় কথাটা এসে গেল। তা হলে কি রেশমা বেগমের অতৃপ্ত আত্মাই আমাকে কাল বিকেলে পথ দেখিয়ে তার কবরের কাছে আনতে চেষ্টা করেছিল? সেই রেশমা বেগমের আত্মাই কি দুবৃর্ত কাল্লুকে চাবুক মেরে রক্তাক্ত করেছিল? 

শ্রদ্ধায় আমার মাথা নুয়ে পড়ল। পাশের একটা লাল ফুলের গুচ্ছ ডাল থেকে ভেঙে বিদ্রোহিনীর কবরে রেখে মাথা ঠেকালুম। সেই মুহূর্তে স্নিগ্ধ একটা হাওয়া ভেসে এল। সেই হাওয়ায় যেন পুরােনাে ইতিহাসের সুঘ্রাণ টের পেলুম। মনে-মনে বললুম, প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়িকা বীরাঙ্গনা তুমি! তােমার জীবনকাহিনি আমাকে লিখতেই হবে। 

ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-৮

এই সময় পাগলা ফকির এসে গেল। অট্টহাসি হেসে সে বলল,বাবুজি! আপকা উপ্পর রেশমা বেটি বহত খুশ হ্যায়! তাে আব আপ তুরন্ত হিয়াসে চলা যাইয়ে। রেশমা বেটিকো একেলা রহনে দিজিয়ে। বেটি জিন্দেগিমে বহত দুখ পায়ি। বহত দুখসে মর গেয়ি বেটিয়া! 

তখনই নিঝুম কবরখানা থেকে চলে এলুম। ইতিহাসে এইসব আশ্চর্য ঘটনা লেখা যাবে না। সেগুলাে আমার ব্যক্তিগত জীবনেই থেকে যাক। 

 হা—সেই অদ্ভুত ঘটনা এতদিন কাকেও বলিনি। এখন আমি বৃদ্ধ। মৃত্যুর আগে ঘটনাগুলি লিখে যাওয়া উচিত মনে করেই লিখে ফেললুম। এর সত্য-মিথ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুললে আমি নিরুত্তর থাকব।.. 

খুলি যদি বদলে যায় এই অদ্ভুত ঘটনাটা আমার ছােটবেলায় ঘটেছিল। তখন আমার বয়স মােটে দশ 

নবছর। আমাদের গ্রামের হাইস্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ি। 

আমাদের গ্রামে আষাঢ় মাসে রথযাত্রা উপলক্ষে খুব ধুমধাম হতাে। ঠাকরুনতলার খােলামেলা বিশাল চত্বরে মেলা বসত। আশেপাশের সব গ্রাম থেকে মানুষজন এসে ভিড় জমাত।

সেবার রথের মেলার সময় দিদিমা এসেছিলেন। তিনি রথের মেলা দেখতে যাবেন শুনে মায়ের প্রচণ্ড আপত্তি। না, না! মেলায় বড় ভিড় হয়। এদিকে বিষ্টিবাদলায় ঠাকরুনতলার চত্বরে বিচ্ছিরি কাদা। তা ছাড়া তােমার রােগা শরীর। দৈবাৎ পা পিছলে আছাড় খেলে কী হবে ভেবেছ? 

দিদিমা মায়ের আপত্তি গ্রাহ্য করলেন না। আমার কাঁধে হাত রেখে হাসিমুখে বললেন,—এই পুঁটুদাদা আমার সঙ্গী হবে। তুমি কিচ্ছু ভেব না।। 

খুলি যদি বদলে যায় বেগতিক দেখে মা ডাকলেন,—ছােটকু! ও ছােটকু! 

ছােটকু মানে আমার ছােটমামা। ছােটমামা আমাদের বাড়িতে থেকে মহকুমাশহরের কলেজে পড়তে যেতেন। আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে রেললাইন গেছে। স্টেশনও আছে। ছােটমামা ট্রেনে চেপে কলেজ যেত।

 

Read More

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-৯

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *