মায়ের ডাকাডাকিতে ছােটমামার সাড়া পাওয়া গেল না। যাবে কী করে? ছােটমামাকে দুপুরে খাওয়ার পর সেজেগুজে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলুম। মাকে কথাটা জানিয়ে দিলুম। মা খাপ্পা হয়ে বললেন,“আসুক ছােটকু। দেখাচ্ছি মজা। ও থাকলে তােমাকে নিয়ে যেত।

দিদিমা বললেন,“আমার পুটুদাদামণিই যথেষ্ট। চলাে ভাই!
মা আমার দিকে চোখ কটমটিয়ে বললেন, দিদার সঙ্গী হয়ে তুমি যেন ভিড়ে হারিয়ে যেও না। দিদার একটা হাত শক্ত করে ধরে থাকবে।
আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়েছি, আমার মায়ের সাড়া পেলুম। দিদিমার কাছে এসে তিনি বললেন,—এই ছাতিটা নিয়ে যাও মা! বৃষ্টিতে ভিজলে রােগা শরীরে আবার কী রােগ বাধিয়ে বসবে। | এবার দিদিমা চটে গেলেন। রথযাত্রার মেলায় ছাতি মাথায় যাব? তুই জানিস? রথের পরবে বিষ্টিতে ভিজলে পুণ্যি হয়!
মা গম্ভীরমুখে বাড়ি ঢুকে গেলেন। দিদিমার একটা হাত ধরে আমি বললুম, তুমি ঠিক বলেছ দিদা। বিষ্টিতে ভিজতে আমার খুব ভালাে লাগে।
ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-৯
শর্টকাটে ঠাকরুনতলা আমাদের বাড়ি থেকে তত কিছু দূর নয়। সিঙ্গিমশাইয়ের আমবাগানের পাশ দিয়ে একটা ঘাসে ঢাকা পােড়াে জমি পেরিয়ে আমরা শিগগির রথের মেলায় পৌঁছে গেলাম। তারপরই পাঁপড়ভাজার গন্ধে জিভে জল এসে গেল। বললুম, দিদা! আগে পাপড়ভাজা খাব।
দিদিমা বললেন, খাবে বইকী। তুমি-আমি দুজনেই খাব। আগে রথদর্শন করি। তারপর অন্য কিছু।
এই মেলায় রথদর্শন ও প্রণাম ছিল মূল আকর্ষণ। জমিদারবাড়িতে একটা পেতলের রথ ছিল। সেটা রথযাত্রার দিন টেনে এনে ঠাকুরতলার শেষপ্রান্তে রাখা হতাে। মাথায় লাল কাপড়ের ফেট্টিবাঁধা পাইকরা লাঠি উঁচিয়ে সেই রথ পাহারা দিত। ভক্ত মানুষজন দূর থেকে প্রণাম করত।
কিন্তু সেই রথের দিকে দিদিমা এগােতেই পারলেন না। মা যেমন বলেছিলেন, —বিচ্ছিরি কাদা! বড্ড বেশি ভিড়!
অগত্যা দিদিমা বললেন,“আয় পুঁটুদাদা! ভিড় কমুক। তখন রথদর্শন করব।
আমি জেদ ধরলুম। তাহলে ততক্ষণ পাঁপড়ভাজা খাওয়াও দিদা! নইলে আমি তােমাকে একা রেখে দৌড়ে বাড়ি চলে যাব।
দিদিমা তখন আর কী করেন! ভিড় এড়িয়ে একটা পাঁপড়ভাজার দোকানে গেলেন। আমাকে একখানা পাঁপড়ভাজা কিনে দিয়ে সম্ভবত লােভ সম্বরণ করতে,
পারলেন না। নিজেও একখানা পাঁপড়ভাজা কিনে ফেললেন। আর সেই সময় টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ মেলার মানুষজন সেই বৃষ্টিকে পাত্তা দেয়নি। ক্রমে বৃষ্টি বাড়তে থাকলে হইহট্টগােল শুরু হয়ে গেল। দিদিমা আমার হাত ধরে টানতে টানতে ভাগ্যিস মেলার একপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন। তা না হলে দুজনেই ভিড়ের চাপে দলা পাকিয়ে কাদায় পড়ে থাকতুম।
ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-৯
বৃষ্টি যত বাড়ছিল, তত মেঘ গর্জে উঠছিল। বিদ্যুতের ঝিলিক এবং মুহুর্মুহু কানে তালাধারানাে মেঘগর্জন। এদিকে দুজনেই ভিজে কাকভেজা হয়ে যাচ্ছি। দিদিমা ব্যস্তভাবে বললেন,—ও পুঁটু! বাড়ি ফিরে চলল।
আবার সিঙ্গিমশাইয়ের বাগানের পাশ গিয়ে দুজনে ফিরে আসছিলুম। হঠাৎ দিদিমা বললেন, এখানে গাছতলায় একটুখানি দাঁড়াও পুঁটু! আমি যে আর হাঁটতে পারছিনে।
বলে তিনি বসে পড়লেন। ততক্ষণে চারদিক কালাে হয়ে এসেছে। একটু দূরে মেলার আলোেগুলাে জুগজুগ করছে। আমার অবস্থা তখন ভ্যা করে কেঁদে ওঠার মতাে। বললুম,—দিদা! এবার ওঠো!
দিদিমা কান্নাজড়ানাে গলায় বললেন,—ও পুটু! আমি যে উঠতে পারছিনে। কোমরের পেছনে কে যেন কামড়ে ধরেছে।
শুনেই আমি প্রচণ্ড ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলুম,—ছােটমামা! ও ছােটমামা!
ছােটমামা কোথায় আছেন, তা জানতুম না। কিন্তু আমার গলা দিয়ে ওই কথাই বেরিয়ে গেল। দিদিমা যতবার ব্যথায় ককিয়ে উঠছিলেন, ততবার আমি ছােটমামাকে ডাকছিলুম।….
ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-৯
এরপর কীভাবে দিদিমা আর আমি বাড়ি ফিরেছিলুম, তা সবিস্তারে বলছি না। আমাদের ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে মা ছােটমামা আর বাবাকে ঠাকরুনতলায় পাঠিয়েছিলেন। মেলায় আমাদের খুঁজে না পেয়ে তাঁরা শর্টকাটে সিঙ্গিমশাইয়ের বাগানের পাশ দিয়ে আসছিলেন। তারপর টর্চের আলােয় আমাদের দেখতে পান।
বাড়ি ফিরে ছােটমামা হাসতে-হাসতে মাকে বলেছিলেন,জাননা দিদি? টর্চের আলাে ফেলে দেখি, পুঁটু তখনও পাঁপড়ভাজা খাচ্ছে আর আমাকে ডাকাডাকি করছে। এদিকে মা-ও কিন্তু হাত থেকে পাঁপভাজা ফেলে দেয়নি।
এই নিয়ে সে-রাত্রে বাড়িতে খুব হাসিতামাশা হল। কিন্তু পরদিন ভােরে ঘুম। থেকে উঠে দেখি, দিদিমা যে ঘরে শুয়েছিলেন, সেই ঘরের দরজার সামনে পাড়ার মহিলাদের ভিড়। বাবা গম্ভীরমুখে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছেন। দিদিমার ঘর থেকে চাপা আর্তনাদ শােনা যাচ্ছে। বাবাকে কিছু জিগ্যেস করতে সাহস হল না।
একটু পরে ছােটমামার সঙ্গে আমাদের গ্রামের ডাক্তার নাড়ুবাবু বাড়ি ঢুকলেন। ছােটমামার হাতে তার ডাক্তারি বাকসাে। নাড়ুবাবুকে দেখে পাড়ার মহিলারা দরজা থেকে সরে দাঁড়ালেন। সেই সুযোেগে আমি গিয়ে দরজায় উকি দিলুম। দেখলুম, দিদিমা খুলি যদি বদলে যায় বিছানায় শুয়ে আছেন এবং মাঝে-মাঝে আর্তস্বরে বলছেন,“উহুহু! ও ঠাকুর! এ
কী হল? কে আমার কোমরে কামড়ে দিল?
নাডুডাজার দিদিমাকে পরীক্ষা করে দেখে বললেন,—পুরােনাে বাত। সারতে একটু দেরি হবে।
Read More