সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-২৯

সেইসব ভূত শুধু ঠাকুমার মুখ গম্ভীর। কেন গম্ভীর, তা সকালবেলায় জানতে পারলাম। বাগানের কোণায় একটা বেলগাছ ছিল, সেই গাছে থাকত এক বেম্মদত্যি। সকালে দেখি, ঠাকমা বেলতলায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। দৃষ্টি ঝিলের দিকে।

ভৌতিক গল্পসমগ্র 

ঠাকুমার কাছে গেছি, সেই সময় মােনা-ওঝা ঝিলের দিক থেকে হন্তদন্ত এসে ধপাস করে বসে পড়ল। ঠাকুমা বললেন,-খুঁজে পেলি? 

 মােনা-ওঝা ফেঁাস করে শ্বাস ফেলে বলল,নাহ। সব পালিয়েছে। কেউ নেই। 

ঠাকুমা বেলগাছের ডগার দিকে মুখ তুলে বললেন,—এ বুড়ােও পালিয়ে গেছে। কাল রাত্তিরে স্পষ্ট দেখলাম, যেই ওই আলােটা জ্বলেছে, অমনি বুড়াে গাছ থেকে নেমে পালিয়ে গেল। ওই দ্যাখ, হাত থেকে কোটা পড়ে গেছে। কঙ্কেটাও পড়ে আছে দেখতে পাচ্ছিস? 

মােনা উদাসচোখে কোটার দিকে তাকিয়ে বলল,—দিদিঠাকরুন যদি হুকুম দেন, বাবা বেম্মদত্যির কোকল্কে আমিই নিয়ে যাই। 

নিয়ে যা। ঠাকুমা করুণমুখে বললেন। তবে এঁটো করিসনে যেন। বামুনবুড়াে জানতে পারলে কষ্ট পাবে। রােজ রাত্তিরে বুড়াে হুঁকো খেত আর খকখক করে কাশত। আহা, কোথায় ভিটেছাড়া হয়ে চলে গেল সব? 

মােনা-ওঝা হুঁকোকস্কে কুড়িয়ে নিয়ে বলল, আমার সবচেয়ে দুঃখুটা কী জানেন দিদিঠাকরুন? শাঁকচুন্নি আর কন্ধকাটার বিয়েটা ভন্ডুল হয়ে গেল। এ আলাে কি যেমন-তেমন আলাে ? ইলেকটিরি বলে কথা। আমি যে মানুষ, আমারও চোখ জ্বালা করে। তবে দেখবেন দিদিঠাকরুন, এ পাপ সইবে না। আমি বরাবর বলে আসছি, কাউকে ভিটেছাড়া করার মতাে পাপ আর নেই। এই মহাপাপ কি ভগবান সইবেন ভাবছেন? কক্ষনও না।…

 ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-২৯ 

ঠিক তা-ই।। | মােনা-ওঝার কথা ফলেছে বলা চলে। এখন বড় হয়েছি। কলকাতায় থাকি। খবর পাই, আমাদের গাঁয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন বিদ্যুৎ থাকে নামােনার ভগবান নাকি লােডশেডিং নামে এক সাংঘাতিক দাননা পাঠিয়ে দিয়েছেন। সে ভিটেছাড়া ভূতগুলােকে ফিরিয়ে এনেছে। তাছাড়া চোখে সইয়ে-সইয়ে বিদ্যুতের আলাে দিয়ে ভূতগুলােকে সে চাঙ্গা করে তুলেছে। সেইসব ভূতই নাকি তার কাটে। ট্রান্সফরমার চুরি করে। কত উপদ্রব বাধায়। ঠাকুমা বেঁচে নেই। মােনাও বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে শাঁকচুন্নি আর কন্ধকাটার বিয়েটা লােডশেডিংয়ের দৌলতে ঘটা করেই ওঁরা দিতেন। 

বললে তােমরা হয়তাে বিশ্বাস করবে না। গত পুজোয় গাঁয়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম। রাত্তিরে হঠাৎ লােডশেডিং। অভ্যাসমতাে ঠাকুমার সেই ঘরে শুয়েছিলাম। রাতদুপুরে বাগানে হঠাৎ খকখক করে কাশির শব্দ শুনে জানলায় উঁকি মেরে দেখি, 

সেই বেলগাছে কোর আগুন জ্বগজুগ করছে। 

 খুব খুশি হলাম। মানুষের জীবনে ভূতটুত না থাকলে কি চলে? জীবনটাই যে নীরস হয়ে যাবে, যদি না থাকে ভূতপেতনি, যদি না থাকে অন্ধকার।… 

ডনের ভূত দিন সকালে চোখ বুজে একটা রােমাঞ্চকর গল্পের প্লট ভাবছি এবং টেবিলে কোগজ-কলমও তৈরি, হঠাৎ পিঠে চিমটি কাটল কেউ। উঃ বলে আর্তনাদ করে পিছনে ঘুরে দেখি, ডন দাঁড়িয়ে আছে। মুখে ধূর্ত এবং ক্রুর হাসির ছাপ। খাপ্পা হয়ে বললুম,হতভাগা ছেলে! দিলি তাে মুডটা নষ্ট করে ? 

ডন আমার ভাগনে। মহা ধড়িবাজ বিচ্ছু ছেলে! তার মাথায় একটা কিছু খেয়াল চাপলেই হল। তাই নিয়ে উঠে পড়ে লাগবে। 

 ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-২৯ 

তা লাগুক আপত্তি নেই। কিন্তু প্রতিটি খেয়ালের সঙ্গে আমাকেও যে জড়াবে, এটাই হল সমস্যা। ওইরকম নিঃশব্দ হাসিটি হেসে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে দেখে বললুম,—বুঝেছি। টাকা চাই। কিন্তু এবার কী কিনবি? রামুর গাধা, না সোঁদরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ? 

 ডন ফিক করে হেসে অমায়িক ভদ্রলােক হল। বলল, না মামা! ভূত কিনব। 

অবাক হয়ে বললুম,—ভূত কিনবি? কোথায় পাবি ভূত? কে বেচবে? 

ডন কাছে ঘেঁষে এল। টেবিলের কলমটা খপ করে তুলে নিয়ে বলল,—মােটে তিন টাকা দাম, মামা! যদি এক্ষুনি তিনটে টাকা না দাও, কী হবে বুঝতে পারছ? 

বিপদ ঘনিয়েছে দেখে ঝটপট বললুম,—বুঝেছি, বুঝেছি। লক্ষ্মী ছেলের মতাে আগে আমার কথার জবাব দে। ঠিক-ঠিক জবাব হলে তিনটে টাকাই পাবি। 

–শিগগির বলল মামা! দেরি হলে গােগগা ভূতটা কিনে ফেলবে। 

—ভূত কার কাছে কিনবি? —-মােনাদার কাছে। 

—মােনাদা মানে সেই মােনা-বুজরুক? মােনা ভূত কোথায় পেল? —ঝিলের ধারে বাঁশের জঙ্গলে ফঁাদ পেতে ধরেছে। —তুই দেখে এলি ? 

—“। শিশির ভেতর ভরে রেখেছে। -মােনাদা বলল,—শিশির দাম পঞ্চাশ পয়সা আর ভূতটার দাম দু-টাকা পঞ্চাশ পয়সা। ইজ ইকোয়্যাল টু তিন টাকা। 

 ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-২৯ 

হাসতে-হাসতে বললাম,বাঃ! অ্যাদ্দিনে অঙ্কে তাের মাথা খুলেছে দেখছি। তাে ভূতটা দেখতে কী রকম? 

ডন চটে গেল। —ভূত কি চোখে দেখা যায় ? কই শিগগির টাকা দাও। -বলে সে কলমটা টেবিলে ঠোকার ভঙ্গি করল। 

দামি কলম। তাই বেগতিক দেখে তিনটে টাকা দিলুম। টাকা পেয়ে কলমটা রেখে ডন গুলতির বেগে উধাও হয়ে গেল। 

গল্পের মুডটা চটে গেল। মনে-মনে মোেনার মুণ্ডুপাত করতে থাকলুম। মােনা থাকে ঝিলের ধারে পুরােনাে শিবমন্দিরের কাছে। 

মােনার মাথায় জটা, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, পরনে একফালি গেরুয়া কাপড়, ডনের ভূত কপালে লাল তিলক আঁকা। সে নাকি তন্ত্রসাধনা করে। কারও কিছু চুরি গেলে মােনা নাকি মন্ত্রের জোরে চোর ধরিয়ে দেয়। অসুখ-বিসুখের চিকিৎসাও করে। তবে কথাটা হল, বিশ্বাসে মিলায়

 

Read More

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-৩০

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *