আমি রাগী গলায় বললাম, যাবে না মানে কী ? ইমরুল বলল, আমি আসমা’র সঙ্গে থাকব।
আমি ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে বললাম, ফাজিল ছেলের কাণ্ড দেখেছেন। চড় দিয়ে দু’তিনটা দাঁত তাে এক্ষুণি ফেলে দেয়া দরকার । আপনাকে নাম ধরে ডাকছে। কষে একটা চড় দিন তাে। দাঁত নরম আছে। কষে চড় দিলে দাঁত পড়ে যাবার কথা।
ম্যাডাম বললেন, চড় দেবার মতাে সে কিছু করে নি। শুধু শুধু চড় দেব কেন ? আপনাকে আমি নাম ধরে ডাকতে বলেছিলাম সেখান থেকে শিখেছে। ছেলেটার পিকআপ করার ক্ষমতা অসাধারণ।
আমি ইমরুলকে বললাম, দুষ্টছেলে, আবার যদি উনাকে আসমা ডেকেছ তাহলে তােমার খবর আছে। এখন থেকে উনাকে ডাকবে ন-মা।
আসমা বললেন, ন-মাটা কী ?
ন-মা হলাে নকল মা। বাইরের যারা শুনবে তাদের কাছে মনে হবে ন-মা হলাে নতুন মা।।
আপনার কথাবার্তা খুবই কনফিউজিং। আমি নকল মা কেন হব? আমি এই ছেলেকে নিয়ে যাব। আমি হব তার আসল মা। আমি সারা পৃথিবীকে দেখিয়ে দেব পেটে সন্তান না নিয়েও আসল মা হওয়া যায়।
সে আসে ধীরে খন্ড-১৮
কথা বলতে বলতে আসমার গলা ভারী হয়ে গেল। তিনি প্রায় কেঁদে ফেলেন এমন অবস্থা। পরিস্থিতি আরাে মলিন করে তুলল ইমরুল, সে খাটের পায়া ধরে ঝুলে পড়ল । সে কিছুতেই যাবে না। এখানেই থাকবে।
মিসেস আসমা হকের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। তার মতাে মানুষ বাইরের একজন মানুষের সামনে এভাবে কাদবে এটা ভাবাই যায় এই যে তিনি চোখের পানি ফেলছেন তার জন্যে তিনি লজ্জাও পাচ্ছেন না। আমার ধারণা তিনি বুঝতেও পারছেন না যে তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
আমি বললাম, ম্যাডাম, আপনার জন্যে একটা সুসংবাদ আছে। তিনি ধরা গলায় বললেন, কী সুসংবাদ ।
ইমরুলকে আপনার অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যেতে হবে না। আপনারা অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যাবেন তাকে ছাড়া।
এটা সুসংবাদ হলাে ? হ্যা, সুসংবাদ কারণ আপনাকে ন’মা হতে হবে না। আপনি হবেন- আ মা। অর্থাৎ আসল মা। বাইরের একটা শিশুর প্রতি আপনি যে মমতা দেখিয়েছেন তার পুরস্কার হিসেবে আপনার কোলে আসবে আপনার নিজের শিশু। আপনি আমার দিকে এভাবে তাকাবেন না। আমি অনেক কিছু আগে ভাগে বুঝতে পারি।
সে আসে ধীরে খন্ড-১৮
ইমরুল হাত-পা ছুড়ে কাঁদছে। তাকে জোর করে ধরে নিয়ে আসছি। আসমা ঠিক আগের জায়গায় বসে আছেন। তার চোখে এখন কোনাে পানি নেই। কিন্তু আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি তার চোখ দিয়ে অশ্রুবন্যা বয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু অশ্রু আছে চোখে দেখা যায় না।
হিমু সাহেব!
জি। আপনি কি ইমরুলকে নিয়ে যাচ্ছেন ? নিয়ে যাওয়াটাই কি ভালাে না ? ইমরুলের প্রতি মমতা দেখানাের আপনার আর কোনাে প্রয়ােজন নেই। নিজের জিনিস আসছে।
হবার কোনটা যতে চাচ্ছেন
দয়া করে আপনি আমাকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখাবেন না। কোনটা হবার হবার না তা আমার চেয়ে ভালাে কেউ জানে না। ইমরুলকে নিয়ে যে নিয়ে যান– একটা ছােট্ট কাজ কি করতে পারবেন ? রাত দশটার দিয়ে টেলিফোন করতে পারবেন?
অবশ্যই পারব। কেন বলুন তাে? ইমরুল কান্না থামিয়ে শান্ত হয়েছে কি হয় নি এটা জানার জন্যে। আমি টেলিফোন করে আপনাকে জানাব। ভুলে যাবেন না কিন্তু। আমি ভুলে যাব না।
বাত দশটার দিকে টেলিফোন করার কথা, আমি কাঁটায় কাঁটায় রাত দশটায় টেলিফোন করলাম। একজন পুরুষমানুষ টেলিফোন ধরলেন এবং গম্ভীর গলায় বললেন— আপনি কি হিমু ?
আমি বললাম, জি। আমার নাম ফজলুল আলম। আমি… পরিচয় দিতে হবে না। আপনি কে বুঝতে পারছি।
সে আসে ধীরে খন্ড-১৮
ভদ্রলােক কাটা কাটা গলায় বললেন, আমি বলছি মন দিয়ে শুনুন। আপনি আর কখনােই আমার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন না। তাঁকে বিরক্ত করবেন না । আপনি মানসিকভাবে তাঁকে পঙ্গু করে ফেলেছেন।
ভদ্রলােক খট করে টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন।
হাবিবুর রহমান সাহেবের ব্রেইন যে একেবারেই কাজ করছে না তা তার চোখ দেখে বােঝা যাচ্ছে। চোখের দৃষ্টি এলােমেলাে। তিনি স্থির হয়ে তাকাতে পারছেন না। মানুষের মন যেমন ছটফট করে, চোখও করে। মনের ছটফটানি ধরার কোনাে উপায় নেই। চোখেরটা ধরা যায়।
আমি বললাম, কেমন আছেন ?
হাবিবুর রহমান চমকে উঠলেন । তাঁর ভাব দেখে মনে হবে আশেপাশে কোথাও ককটেল ফুটেছে। তিনি বললেন, কিছু বলেছেন?
আমি বললাম, চমকে উঠার মতাে কিছু বলি নি। জানতে চাচ্ছিলাম কেমন আছেন ?
ভালাে । আপনার কি শরীর খারাপ না-কি ? জানি না ।। কোনাে কারণে কি মন অশান্ত ? জি-না, আমি ভালাে আছি।
বলেই তিনি পুরােপুরি ঝিম মেরে গেলেন। এতক্ষণ তিনি চোখের দৃষ্টি স্থির করতে পারছিলেন না। এখন তাঁর দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। তাকে এখন দেখাচ্ছে। ধ্যানমগ্ন মানুষের মতাে। আমি বললাম, রাশিদুল করিম নামের হারামজাদাটার সঙ্গে দেখা হয়েছিল ?
হাবিবুর রহমান হতভম্ব গলায় বললেন, কীভাবে বুঝলেন ?
Read More