হুমায়ূন আহমেদের লেখা সে আসে ধীরে খন্ড-২১

ঠিক আছে তাই করছি । তুমি খালু সাহেবের ব্যাপারে কী করলে? 

ভিসা নিয়ে কী যেন ঝামেলা হচ্ছে। ভিসা পেলেই চলে যাবে। জবান এখনাে বন্ধ ? হ্যা। মহিলা পীরের চিকিৎসাটা করাবে না ? মহিলা পীরের কোন চিকিৎসা ?

সে-আসে-ধীরে 

বলেছিলাম না তােমাকে প্রচণ্ড আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সঞ্চয় করা পীরনি। সবাই যাকে মামা ডাকে। উনার পায়ে পড়লেই…। 

ভুলে যা। তাের খালু যাবে মামা ডাকতে! 

খালু সাহেবের তাে জবানই বন্ধ। আমি উনার হয়ে মামা ডাকব। উনার হাসবেন্ডকে ডাকব মামি। 

তার হাসবেন্ডকে মামি ডাকতে হয় ? 

মহিলাকে যখন মামা ডাকতে হয় পুরুষকে মামি ডাকতে হবে সেটাই তাে স্বাভাবিক। 

খামাকা বকবক করবি না। সকালবেলা বকবকানি শুনতে ভালাে লাগে না। টেলিফোন রেখে দেব ? 

, রেখে দিবি না। কানে ঝুলিয়ে বসে থাক। গাধা কোথাকার। টেলিফোন রেখে এক্ষুণি ঐ ছেলেকে আসমার কাছে পৌছে দিয়ে আমার এইখানে আয়। 

আচ্ছা, আসব। 

সে আসে ধীরে খন্ড-২১

আমার বাড়িতে এখন নতুন নিয়ম বাসায় ঢুকে কোনাে কথা বলতে পারবি না। ফিসফিস করেও না। 

কেন? | তাের খালু কথা বলতে পারে না তাে, এই জন্যে কাউকে কথা বলতে শুনলে রেগে যায়। ভয়ঙ্কর রাগে। এই জন্যেই বাড়িতে কথা বলা বন্ধ। 

ভালাে যন্ত্রণা তাে! 

মহা যন্ত্রণা। এই যে তাের সঙ্গে কথা বলছি, কর্ডলেস নিয়ে বারান্দায় চলে এসেছি। কথাও বলছি ফিসফিস করে। বুঝলি হিমু মাসখানিক এই অবস্থা চললে দেখবি আমিও কথা বলা ভুলে গেছি। ইশারা-ইঙ্গিতে কাজ করছি। খুবই খারাপ অবস্থায় আছি রে হিমু! 

এই বিষয় নিয়ে তুমি চিন্তা করবে নাআমি ভুজুং ভাজুং দিয়ে খালু সাহেবকে চিকিৎসা করিয়ে আনব। মামা-চিকিৎসা। 

তুই কখন আসবি ? দু’একদিনের মধ্যে চলে আসবদুএকদিন না, এক্ষুণি আয় । দেখি। কোনাে দেখাদেখি না। লাফ দিয়ে কোনাে বেবিটেক্সিতে উঠে পড়। 

আমি খালার কথামতােই কাজ করলাম। ইমরুলকে মিসেস আসমা হকের দরবারে পৌছে দিয়ে লাফ দিয়ে একটা বেবিটেক্সিতে উঠে পড়লাম। তবে আমার গন্তব্য খালু সাহেবের বাড়ি না হাসপাতাল। ফরিদা কী করছে না করছে এই খোঁজ নেয়া।

হাসপাতালে কী ড্রামা হচ্ছে কে জানে! থানা এবং হাসপাতালে মানব জীবনের সবচে’ বড় ড্রামাগুলি হয়। দর্শক হিসেবে অসাধারণ নাটক দেখতে হলে এই দুজায়গায় হঠাৎ হঠাৎ উপস্থিত হতে হয়। চমৎকার কিছু দৃশ্য হলাে, মনে মনে হাততালি দিয়ে ফিরে চলে আসা। আবার নাটক দেখতে ইচ্ছা হলে আবার চলে যাওয়া। আমার (মহান!) বাবা তার ‘মহাপুরুষ বানানাের শিক্ষা প্রণালি’তে পরিষ্কার করে লিখেছেন 

সে আসে ধীরে খন্ড-২১

মৃত্যুপথযাত্রী কখনাে দেখিয়াছ ? কখনাে কি তাহার শয্যাপার্শ্বে রাত্রি যাপন করিয়াছ ? কখনাে কি দেখিয়াছ কী রূপে ছটফট করিতে করিতে জীবনের ইতি হয়জীবনের প্রতি মানুষের কী বিপুল তৃষ্ণা। আর কিছুই চাই না শুধু বাঁচিবার জন্যেই বাঁচিতে চাই।। 

বাবা হিমালয়, তুমি অবশ্যই তােমার জীবনের কিছু সময় মৃত্যুপথযাত্রীদের জন্যে আলাদা করিয়া রাখিবে। তাহাদের শয্যাপার্শ্বে রাত্রি যাপন করিবে। যে হাহাকার নিয়া তাহারা যাত্রা করিতেছে সেই হাহাকার অনুভব করিবার চেষ্টা 

করিবে। | বাবা সামান্য ভুল করেছেন। তিনি ভুলে গেছেন সব মানুষই মৃত্যুপথযাত্রী । যে শিশুটি হেসে খেলে ছুটে বেড়াচ্ছে সেও মৃত্যুপথযাত্রীতার চোখের দিকে তাকালেও জীবনের প্রতি মানুষের বিপুল তৃষ্ণার খবর পাওয়া যায়। এই খবর জানার জন্যে হাসপাতালে বসে থাকার প্রয়ােজন নেই। 

ফরিদার বিছানার পাশে সােনালি চশমা পরা যে যুবকটি বসে আছে তার নামই বােধহয় রাশেদুল করিম। সাদা ফুলপ্যান্টের সঙ্গে আকাশি নীল রঙের হাওয়াই শার্ট পরেছে বলেই পােশাকটা ইউনিফর্মের মতাে লাগছে। মনে হচ্ছে ক্যাডেট কলেজের ছাত্র।

শুধু চেহারা দেখে প্রেমে পড়ার বিধান থাকলে সব মেয়েই এই ছেলের প্রেমে পড়ত। তারা দু’জন মনে হয় মজার কোনাে কথা বলছিল। দু’জনের মুখই হাসি হাসি। আমাকে দেখে রাশেদুল করিমের মুখের হাসি বন্ধ হয়ে গেল। ফরিদা কিন্তু হাসতেই থাকল । মেয়েদের এই ব্যাপারটা আছে। কোনাে রসিকতা তাদের মনে ধরে গেলে তারা অনেকক্ষণ ধরে হাসে। 

রাশেদুল করিম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষের মতাে বললেন, হিমুভাই, কেমন আছেন ? বলেই হ্যান্ডশেকের জন্যে হাত বাড়ালেন। 

সে আসে ধীরে খন্ড-২১

আমি এখন মজার একটা খেলা খেলতে পারি। রাশেদুল করিমের হাত অগ্রাহ্য করে তাকে খুবই ব্ৰিত অবস্থায় ফেলতে পারি। ব্রিত অবস্থায় সে কী করে এটাই তার আসল চরিত্র। 

আমি রাশেদুল করিমের দিকে তাকালাম। তার বাড়িয়ে দেয়া হাতের দিকে তাকালাম। নিজে হাত বাড়ালাম না। দ্রলােক হাত নামিয়ে নিলেন এবং হেসে ফেললেন। আবারাে বললেন, হিমুভাই, কেমন আছেন ? 

ভালাে। 

আপনার কথা এত শুনেছি যে আপনাকে না দেখে যদি আপনার ছায়া দেখতাম তাহলেও বলে ফেলতে পারতাম- এই ছায়া হিমু সাহেবের। 

ছায়া দেখে চিনতে পারতেন না। সব মানুষ আলাদা কিন্তু তাদের ছায়া একরকম। 

এটা কি কোনাে ফিলসফির কথা ? 

অতি জটিল ফিলসফির কথা। অবসর সময়ে এই ফিলসফি নিয়ে চিন্তা করবেন। কিছু না কিছু পেয়ে যাবেন । 

ফরিদার মাথায় এখনাে বােধহয় রসিকতাটা ঘুরপাক খাচ্ছে। সে হেসেই যাচ্ছে। আমি তার দিকে তাকাতেই সে মুখে শাড়ির আঁচল চাপা দিয়ে হাসি সামলাবার চেষ্টা করল। রােগ যন্ত্রণায় কাতর রােগীর আনন্দময় হাসির চেয়ে সুন্দর আর কিছুই হতে পারে না। আমি মুগ্ধ হয়ে হাসি দেখছি । রাশেদুল করিম বললেন, হিমুভাই, আপনি কি দয়া করে ফরিদাকে একটু বুঝাবেন ? আমি নিশ্চিত সে আপনার কথা শুনবে ।

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা সে আসে ধীরে খন্ড-২২

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *