ভাগ্যিস তার জবান বন্ধ কী বললেন শুনতে পেলাম না। শুনতে পেলে অবশ্যই ভালাে লাগত না। পীর মামার বাড়িতে আমরা পৌছলাম রাত আটটার দিকে। পীর মামা তখন মাত্র এশার নামাজ আদায় করে হুজরাখানায় বসেছেন। নানান বয়সের নারী পরুষ তাকে ঘিরে বসে আছে। মামা কক্কেতে টান দিচ্ছেন। এই দৃশ্য ভক্তরা অতি ভক্তির সঙ্গে দেখছে। পীর-ফকিররা গাঁজা খেলে দোষ হয় না। সাধারণ মানুষরা খেলে দোষ হয় ।
পীর মামা আমাকে দেখে কষ্কে নামালেন। টকটকে লাল চোখে কিছুক্ষণ আমাকে দেখে অতি মিষ্ট গলায় বললেন, কেমন আছিস রে হিমু ?
মামার শরীর মাঝারি সাইজের হাতির মতাে কিন্তু গলার স্বর অতি মধুর। আমি বিনীত গলায় বললাম, ভালাে আছি।
রােগী নিয়ে এসেছিস ? জি।
তাের জানি কী হয়? খালু হয়।
এর দেখি আদব লেহাজ কিছুই নাই। আমারে সেলামালকি দিল না। কদমবুসিও করল না।
মামা মাফ করে দেন। রােগীমানুষ। জবান বন্ধ ?
জি।
সে আসে ধীরে খন্ড-২৪
মামা আবারাে কল্কে হাতে নিয়ে কয়েকটা টান দিয়ে দার্শনিকদের মতাে গলায় বললেন, জবান বন্ধ থাকাই ভালাে। জগতের বেশিরভাগ পাপ কাজ জবানের কারণে হয়।
আমি বললাম, মামা, আশা নিয়ে শহর থেকে এসেছি, জবান ঠিক করে দেন। মামা বললেন, আমি জবান ঠিক করার মালিক না। জবান ঠিক করার মালিক আল্লাহপাক । যাই হােক, এসেছিস যখন চেষ্টা করে দেখি। ওরে তােরা রােগীরে শক্ত করে খুঁটির সাথে বেঁধে ফেল। হাত-পা যেন নাড়াইতে না পারে।
উনার কথা শেষ হবার আগেই মামার লােকজন অতিদ্রুত খালু সাহেবের হাত-পা বেঁধে খুঁটির সঙ্গে লটকে দিল। উনি ভয়ে চুপসে গেলেন। তেমন কোনাে বাধা দিলেন না। এ ধরনের কোনাে ঘটনার জন্যে তিনি প্রস্তুত ছিলেন । খালু সাহেব এতই ঘাবড়ে গেছেন যে আমার দিকেও তাকাচ্ছেন না। তিনি এক দৃষ্টিতে পীর মামার দিকে তাকিয়ে আছেন।
পীর মামা বললেন, এখন এক কাজ কর পাটকাঠির মাথায় কাঁচা ও মাখিয়ে আন। এনে এই জবান বন্ধ লােকের মুখে ঢুকিয়ে দে। ইনশাল্লাহ জবান ফুটবে।
এক লােক দৌড়ে গেল পাটকাঠিতে গু মাখিয়ে আনতে। উপস্থিত ভক্তবৃন্দের মধ্যে আনন্দের নাড়াচাড়া দেখা গেল। খালু সাহেবের চোখ দেখে মনে হচ্ছে যে-কোনাে মুহূর্তে অক্ষিকোটর থেকে চোখ বের হয়ে আসবে। চারদিকে চরম উত্তেজনা।
সে আসে ধীরে খন্ড-২৪
পীর মামা হাত উঁচু করে উত্তেজনা কিছুটা কমালেন। মিষ্টি গলায় বললেন, গু খাওয়ানাের আগে এর মাথাটা কামায়ে দে। মাথা কামানাে কোনাে চিকিৎসা । আমার সঙ্গে বেয়াদবি করেছে বলে শাস্তি। আমারে সেলামালকি দেয় নাই।
মামার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হলাে। ওয়ান টাইম রেজারে মাথা মুণ্ডিত হলাে। খালু সাহেবকে এখন দেখাচ্ছে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মতাে। চেহারার মধ্যে কেমন যেন মায়া মায়া ভাব চলে এসেছে।
পীর মামা খালু সাহেবের দিকে তাকিয়ে অতি মধুর গলায় বললেন- বাবা গাে, এখন একটু গু খাও। বেশি খাইতে হবে না। পাটকাঠির মধ্যে যতটুকু আনছে ততটুকু খাইলেই কাজ হবে। মুখ বন্ধ কইরা রাখবা না। কেমন ? মামার কথা শোেন। গু-মাখানাে পাটকাঠি এসেছে। মামার মতােই অত্যন্ত বলশালী এক লােক সেই পাটকাঠি নিয়ে এগিয়ে আসছে। সেই কাঠি মুখের ভেতর ঢুকাতে হলাে না। তার আগেই খালু সাহেব স্পষ্ট গলায় বললেন, খাব না, আমি গু খাব না।
| চারদিকে আনন্দের হুল্লোড় উঠল। ফুটেছে, জবান ফুটেছে। আল্লাহু আকবর । আল্লাহু আকবর।
আমি খালু সাহেবকে নিয়ে ফিরছি। বুড়িগঙ্গায় নৌকায় উঠা পর্যন্ত তিনি কোনাে কথা বললেন না। আমার ধারণা হলাে আবারাে বােধহয় জবান বন্ধ হয়ে গেছে। নৌকায় উঠার পর তিনি কথা বললেন। শান্ত গলায় বললেন, হিমু, তুমি কি আমাকে একটা সত্যি কথা বলবে?
আমি বললাম, জি খালু সাহেব বলব।
খালু সাহেব বললেন, আমার ধারণা— যে চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে পীর মামা আমাকে আরােগ্য করলেন, সেই চিকিৎসাপদ্ধতি উনার মাথায় আসে নি। তুমি তাকে শিখিয়ে দিয়েছ।
Read More