হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৪

মল্লিক সাহেব তিক্ত গলায় বললেন, ওদেরও নাই। নাই-এ নাই-এ কাটাকাটি। আরেক কাপ চা খাব, যদি আপনার তকলিফ না হয়। 

 আমার তকলিফ হবে না। আপনি আরাম করে চা খাচ্ছেন দেখে ভালাে লাগছে। 

মল্লিক সাহেব বললেন, আপনার বসার ঘরের সােফায় আমি যদি শুয়ে থাকি তাহলে সমস্যা হবে ?

যখন নামিবে আঁধার 

মিসির আলি বললেন, কোনাে সমস্যা হবে না। তবে ভাই, আমার বসার ঘরে সােফা নাই। 

সােফা আমি আনায়ে নিব। | মিসির আলি এখন বুঝতে পারছেন, মল্লিক সাহেব তাঁর এখানে থাকতে এসেছেন। সদর দরজা খােলা’ এই সাবধান বাণী ঘরে ঢােকার অজুহাত। 

মল্লিক সাহেবের তাঁর ঘরে রাত্রিযাপনের বিষয়টা মিসির আলির কাছে পরিষ্কার হচ্ছে না। একা ঘুমাতে ভয় পাচ্ছেন, তা ঠিক আছে। খালি বাড়িতে অনেকেই একা ঘুমাতে ভয় পায়। কিন্তু মল্লিক সাহেবের বাড়ি খালি না। পরিবারের লােকজন চলে গেলেও অনেকেই এখনাে আছে। বাড়ির দারােয়ান আছে, কাজের লােক আছে। 

দ্বিতীয় কাপ চা মল্লিক সাহেব আগের মতােই তৃপ্তি করে খাচ্ছেন। এর মধ্যে তার লােকজন বসার ঘরে সােফা নিয়ে এসেছে। বালিশ চাদর এনেছে। মল্লিক সাহেব সব ব্যবস্থা করেই এসেছেন। 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৪

মিসির আলি বললেন, আপনি কি বিশেষ কোনাে কারণে বাড়িতে একা থাকতে ভয় পাচ্ছেন ? 

মল্লিক সাহেব হা-সূচক মাথা নাড়লেন। কারণটা বলতে চাইলে বলতে পারেন। বলতে চাই না। তাহলে চা শেষ করে শুয়ে পড়ুন। আপনার সকাল সকাল ঘুমানাের অভ্যাস। 

সবদিন সকাল সকাল ঘুমাই না। মাঝে মাঝে রাত জাগি। সারা রাতই জেগে থাকি । 

আজ কি সারা রাত জাগবেন ? হুঁ! আপনি ঘুমায়ে পড়েন। মিসির আলি বললেন, সময় কাটানাের জন্য আপনাকে বই দেব ? 

গল্প-উপন্যাস আমি পড়ি না। বানানাে কিচ্ছাকাহিনি। কথায় কথায় প্রেম। গল্প-উপন্যাস পড়লে মনে হয় দেশে প্রেমের হাট বসে গেছে। স্কুলে প্রেম, কলেজে প্রেম, ইউনিভার্সিটিতে প্রেম, অফিসে প্রেম, আদালতে প্রেম । ফালতু বাত। 

মিসির আলি বললেন, প্রেম ছাড়াও আমার কাছে বিজ্ঞানের কিছু সহজ বই আছে। 

মল্লিক সাহেব বললেন, বিজ্ঞান তাে আরও ফালতু। আমাকে বইপত্র কিছু দিতে হবে না। আপনি আপনার মতাে ঘুমান। আপনাকে শুধু একটা কথা বলে রাখি, ছক্কা-বক্কা এই দুইয়ে মিলে আমাকে খুন করবে। যদি খুন হই পুলিশের কাছে এদের নামে মামলা দিবেন।

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৪

মিসির আলি বললেন, পুলিশ আমার কথায় তাদের আসামি করবে না। 

টাকা খাওয়ালেই করবে। টাকা খাওয়াবেন। আমি চাই ছক্কা-বক্কা দুইটাই যেন ফাঁসিতে ঝুলে । 

আপনি যে-কোনাে কারণেই হােক উত্তেজিত হয়েছেন । ঘুমিয়ে পড়ুন। ভালাে ঘুম হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। 

এই দুই ভাই সাক্ষাৎ শয়তান। বুঝার উপায় নাই। নিজের মাকে মেরেছে। ধাক্কা দিয়ে কুয়াতে ফেলে মেরেছে। প্রথমে বুঝতে পারি নাই। মামলা মােকদ্দমা হয় নাই। কীভাবে হবে বলেন! দুই ভাই কেঁদে কেঁদে বাড়ি মাথায় তুলেছিল। কিছুক্ষণ পর পর ফিট মারে। উপায়ান্তর না দেখে দুইজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম, তখন তাে জানি না দুই ভাই মিলে এই কীর্তি করেছে। 

যখন জানলেন তখন পুলিশের কাছে গেলেন না কেন ? | ছয় বছর পর জেনেছি। ছয় বছর আগের ঘটনা পুলিশ মুখের কথায় বিশ্বাস করবে কেন ? তারপরও বলেছি। রমনা থানার ওসি বাড়িতে এসেছেন। দুই ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। দুই ভাই চিল্কার করে এমন কান্না শুরু করল, বাড়িতে কাজ-কাম থেমে গেল।

কাঁদতে কাঁদতে দুই জনই ফিট। ওসি সাহেব। তখন তাদের উল্টা সান্ত্বনা দেয়। বলে কী, তােমাদের বাবার বয়স হয়েছে। বয়সের কারণে মাথায় উল্টাপাল্টা চিন্তা ঢুকে। তােমরা কিছু মনে নিয়াে না। আমাকে তিনি যখন বললেন তখনাে বিশ্বাস করি নাই। ছেলের হাতে বাবা সম্পত্তির কারণে খুন হন। মা কখনাে না। 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৪

মিসির আলি বললেন, আপনি কীভাবে জানলেন ছেলেরা মাকে খুন করেছে ? তাদের মা আমাকে বলেছে । মৃত মা বলেছে ? 

জি। আমার একটা বিশেষ ক্ষমতার কথা আপনাকে বলা হয় নাই। আমি মাঝে মধ্যে মৃত মানুষ দেখতে পাই । তাদের সঙ্গে বাত-চিতও করি। 

ও আচ্ছা।। আমার কথা মনে হয় এক ছটাকও বিশ্বাস করেন নাই। 

মিসির আলি বললেন, শুরুতে আমি সবার কথাই বিশ্বাস করি। অবিশ্বাস পরের ব্যাপার। 

মৃত মানুষদের সঙ্গে যে আমার কথাবার্তা হয়, এটা বিশ্বাস করেছেন? জি বিশ্বাস করছি। এটা এক ধরনের ডিলিউশন। ডিলিউশন জিনিসটা কী ? 

ভ্রান্ত ধারণা। যে ধারণার শিকার সে মানসিক রােগী। আমরা সাইকোলজিস্টেরা মনে করি তার চিকিৎসা হওয়া প্রয়ােজন । 

মল্লিক সাহেব কুদ্ধ গলায় বললেন, আমার চিকিৎসা হওয়া প্রয়ােজন ? মিসির আলি বললেন, হ্যা। 

মল্লিক সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। বিরক্ত গলায় বললেন, আপনাকে অনেক বিরক্ত করেছি, এখন চলে যাব । দরজা বন্ধ করে দেন, আমি নিজের বাড়িতে থাকব। 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৪

আমার এখানে থাকবেন না ? 

জসুকে কি তুলে দিব ? আপনার সঙ্গে ঘুমাবে ? প্রয়ােজন নাই। নবাবের বাচ্চা ঘুমাইতেছে ঘুমাক। আপনি মনে হয় আমার ওপর রাগ করেই চলে যাচ্ছেন। 

কিছুটা রাগ করেছি। এখন বিশ্বাস পরে অবিশ্বাস, এটা কেমন কথা? আমার দুই পুত্র যে আমাকে নিয়ে নানান কথা ছড়ায়, এটা নিশ্চয় জানেন? 

জানি না। আপনাকে কখনাে কিছু বলে নাই ? জি-না। তাদের সঙ্গে আমার কখনাে কথাবার্তা হয় না। এদের দূর থেকে 

দেখি। 

এরা আমার বিষয়ে ছড়ায়েছে যে, আমাকে নাকি দুটা করে দেখে । মিসির আলি বললেন, দুটা মানে বুঝলাম না। 

মল্লিক বললেন, দুইজন আমি আমার ঘরে বসে আছি এই রকম। সত্য কখনাে কেউ বিশ্বাস করে না। অসত্য কথা, ভুল কথা, বানােয়াট কথা সবাই বিশ্বাস করে। এই দুই কুপুত্রের কারণে সবাই বিশ্বাস করে দুইজন মল্লিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। 

ও আচ্ছা। 

এত বড় একটা কথা বললাম, আপনি ও আচ্ছা’ বলে ছেড়ে দিলেন? আপনি কি আমার দুই কুপুত্রের কথা বিশ্বাস করেছেন ? 

না। 

মল্লিক সাহেব বললেন, সব কথাই আপনি প্রথমে বিশ্বাস করেন, এই কথাটা কেন করলেন না ? 

মিসির আলি বললেন, বিশ্বাস করি নি, কারণ আমি দুইজন মল্লিককে দেখছি । তা ছাড়া আপনার দুই পুত্রের কেউ আমাকে এ ধরনের কথা বলে নি। 

তারা যদি বলত, আপনি বিশ্বাস করতেন ? 

প্রথমে অবশ্যই বিশ্বাস করতাম। তারপর চিন্তা-বিশ্লেষণে যেতাম । অ্যারিস্টটল একবার বললেন, মানুষের মস্তিষ্ক রক্ত পাম্প করার যন্ত্র। এক শ বছর মানুষ তা-ই বিশ্বাস করেছে। এক শ বছর পর অবিশ্বাস এসেছে। 

অ্যারিস্টটল লােকটা কে? একজন দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী। দার্শনিক, বিজ্ঞানী সবই ফালতু। আপনার কাছে মনে হতে পারে। 

মল্লিক সাহেব হঠাৎ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে কিছু সময়ের জন্যে ঝিম ধরে গেলেন। 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৪

মিসির আলি বললেন, একটা সিগারেট কি খাবেন? 

মল্লিক সাহেব বললেন, না। নিজের ঘরে গিয়ে আরাম করে সিগারেট খাব। আপনার এখানে না। আপনাকে শেষ কথা বলি—আমি কিন্তু সত্যি মৃত মানুষ দেখতে পাই। তাদের সঙ্গে কথাবার্তাও বলি। আপনার ঘরেও একজন মৃত পুরুষ দেখি। হাবে-ভাবে মনে হয় সে আপনার পিতা। 

ও আচ্ছা। 

মল্লিক সাহেব দুঃখিত গলায় বললেন, এত বড় একটা কথা বললাম, আর আপনি “ও আচ্ছা’ বলে ছেড়ে দিলেন ? আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসাই ভুল হয়েছে। 

মল্লিক সাহেব ঘর থেকে বের হলেন। তিনি ছাতা নিয়ে এসেছিলেন, যাওয়ার সময় ছাতা ছাড়াই বৃষ্টিতে নেমে গেলেন। 

মল্লিক সাহেবের আর কোনাে খোঁজ-খবর পরের এক মাসে পাওয়া গেল না। জলজ্যান্ত একজন মানুষ পুরােপুরি অদৃশ্য হয়ে গেল। 

 

Read More

হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৫

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *