ছক্কা-বক্কা দুই ভাই পরিবার নিয়ে ফাঁকা বাড়িতে ফিরে এল । আবার তাদের দু’জনকে ছেলে কোলে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে দেখা গেল। বাবার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, এতে তাদের দুঃখিত বা চিন্তিত মনে হলাে না। মল্লিক পরিবারের সব কর্মকাণ্ড আগের মতােই চলতে লাগল। বক্কার ছােট ছেলের আকিকার । দিন ধার্য হলাে । আকিকা হলাে। জসুকে আকিকার মাংস দেওয়া হলাে।
বক্কার ছােট ছেলের নাম রাখা হলাে, সৈয়দ শাহ্ আমিনুর রহমান বখতিয়ার খিলজি’।
ওজনদার নাম রাখতে পারার আনন্দে বক্কাকে অভিভূত বলে মনে হলাে। মল্লিক সাহেবের দুই পুত্র মিসির আলির সামনে বসে আছে। তাদের বসার ভঙ্গি আড়ষ্ট, দৃষ্টি এলােমেলাে। তবে এলােমেলাে দৃষ্টিতেও শৃঙ্খলা আছে। এক ভাই ছাদের দিকে তাকালে, অন্য ভাইও ছাদ দেখে । ছাদ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে একজন যদি জানালা দিয়ে তাকায়, অন্যজনও জানালার দিকে তাকায়! কে কাকে অনুসরণ করছে ? মিসির আলির কাছে স্পষ্ট না। কেউ কাউকে অনুসরণ করছে এ রকমও মনে হচ্ছে না। সম্ভবত যা করছে একসঙ্গে করছে।
দুই ভাইয়ের চেহারায় কোনাে মিল নেই। বড়ভাই (শফিকুল গনি ছক্কা) শ্যামলা, মােটাসােটা, বেঁটে। ছােটভাই (আবদুল গনি বক্কা) ফর্সা, রােগা পাতলা এবং লম্বা। দু’জনেরই গোঁফ আছে। লুঙ্গির ওপর হাফ হাতা শার্ট। একই রঙের লুঙ্গি (সবুজ), একই রঙের শার্ট (কমলা)। মিসির আলি মনে করার চেষ্টা করলেন এরা আগেও মিল করে শার্ট পরত কি না। তাদের জুতাও একই রকম-কালাে রাবারের জুতা।
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৫
শফিকুল গনি বলল, চাচা, ভালাে আছেন ? মিসির আলি বললেন, ভালাে আছি ।
আবদুল গনি বলল, একটা কাগজ আপনাকে দেখাতে এনেছি। আপনার পরামর্শ দরকার।
মিসির আলি বললেন, কাগজ দেখাও।
দুই ভাই চুপ করে বসে রইল । কোনাে কাগজ বের করল না। দু’জনই ডান পা নাচাচ্ছে এবং অতি দ্রুত নাচাচ্ছে। মিসির আলি এর আগে কাউকে এত দ্রুত পা নাচাতে দেখেন নি ।।
শফিকুল গনি বলল, একটা হ্যান্ডবিল ছাপাব, লেখা ঠিক আছে কি না যদি দেখে দেন।
মিসির আলি বললেন, দেখে দিব। কাগজটা দাও।
এবারও কাগজ বের হলাে না। দুই ভাই আগের নিয়মে পা নাচাচ্ছে, তবে এবার নাচাচ্ছে বাঁ পা । মিসির আলি কাগজের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে
ভাবছেন এই দুই ভাই মানসিক প্রতিবন্ধী কি না। সম্ভাবনা প্রবল। কাগজটা দেখে দিন বলার পরও তারা কাগজ বের করছে না—এটা মানসিক ক্ষমতার অভাবই বােঝায়।
তােমরা চা খাবে ? দু’জন একই সঙ্গে না-সূচক মাথা নাড়ল। তােমাদের বাবার কোনাে খোজ কি পাওয়া গেছে ? দু’জন আবারও একই সঙ্গে না-সূচক মাথা নাড়ল। কাগজের কথা বলছিলে, কাগজটা কি আসলেই দেখাবে ? দু’জন একই সঙ্গে হা-সূচক মাথা নাড়ল, তবে কাগজ বের করল না ।।
জসু ট্রে নিয়ে ঢুকেছে। ট্রেতে তিন কাপ চা। দুই ভাই আগে চা খাবে না বলেছে, এখন দুজন একই সঙ্গে অতি দ্রুত চায়ের কাপ নিল এবং অতি দ্রুত চা শেষ করল। প্রায় শরবত খাওয়ার মতােই বড় বড় চুমুক দিল। মিসির আলি এই দুই ভাইয়ের মতাে এত দ্রুত গরম চা কাউকে খেতে দেখেন নি ।
শেষ পর্যন্ত ছােটভাই আবদুল গনি বক্কার শার্টের পকেট থেকে কাগজ বের হলাে। পরিষ্কার ঝকঝকে হাতের লেখা। মানসিক প্রতিবন্ধীদের হাতের লেখা সুন্দর হয়। মিসির আলি বিজ্ঞাপনটা দু’বার পড়লেন।
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৫
সন্ধান চাই আমাদের পিতাকে আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। কেউ সন্ধান দিলে তাকে কুড়ি হাজার টাকা নগদ পুরস্কার দেওয়া হইবে। কোনাে পুলিশ ভাই যদি সন্ধান দেন, তিনিও পুরস্কারের দাবিদার হবেন। যদি কয়েকজন একত্রে সন্ধান দেন, তবে পুরস্কারের টাকা সমভাবে তাহাদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। এই নিয়ে কোনাে বিবাদ বিসংবাদ করা যাইবে না।
বিবাদ উপস্থিত হইলে আমাদের দুই ভাইয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত গণ্য হইবে ।
ইতি শফিকুল গনি ছক্কা (বড়ভাই)
আবদুল গনি বক্কা (ছােটভাই) মিসির আলি বললেন, হ্যান্ডবিলে কি তােমাদের বাবার ছবি যাবে ? জি-না, ছবি পাওয়া যায় নাই ।
ছবি না পেলে তার একটা বর্ণনা দিতে হবে। তা না হলে মানুষ বুঝবে কীভাবে এ মল্লিক দেখতে কেমন। তােমাদের দুই ভাইয়ের নাম আছে, কিন্তু ঠিকানা কোথায় ?
শফিকুল গনি বলল, ঠিকানা ইচ্ছা করে দেই নাই। ঠিকানা দিলে বাজে লােক ঝামেলা করবে। বলবে, এই জায়গায় দেখেছি। ওই জায়গায় দেখেছি।
মিসির আলি বললেন, ঠিকানা ছাড়া তােমাদের সন্ধান দিবে কীভাবে?
আবদুল গনি বলল, সন্ধান না দিলেও অসুবিধা হবে না।।
মিসির আলি বললেন, আমি তােমাদের ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না। তােমাদের কাছে যদি মনে হয় বিজ্ঞাপন ঠিক আছে তাহলে ঠিক আছে।
দুই ভাই একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল। তাদের আনন্দিত মনে হচ্ছে।
মিসির আলি বললেন, যে সােফাটায় তােমরা এতক্ষণ বসে ছিলে সেটা তােমাদের কাউকে পাঠিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করাে।
| শফিকুল গনি বলল, চাচাজি। এটা আপনার কাছে রেখে দিন। এটা আমার বাবার একটা স্মৃতি।
মিসির আলি বললেন, স্মৃতি বলছ কেন ? তােমরা কি নিশ্চিত তিনি মারা গেছেন ?
দুই ভাই একসঙ্গে হা-সূচক মাথা নাড়ল। মত যদি তােমরা জানাে তাহলে সন্ধান চেয়ে হ্যান্ডবিল ছাপাচ্ছ কেন? | শফিকুল গনি বলল, কেউ যেন না ভাবে আমরা সন্ধান করি নাই। চাচাজি যাই ।
তােমরা হ্যান্ডবিলে ঠিকানা দাও নাই, এটা লােকজনের চোখে পড়বে না ?
আবদুল গনি বলল, এটা নিয়ে কেউ কিছু মনে নিবে না। সবাই জানে আমরা বােকা।
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৫
মিসির আলি বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। তিনি ব্যক্তিগত কথামালার খাতা খুললেন। ছক্কা-বক্কা দুই ভাই’ শিরােনামে কিছুক্ষণ লিখলেন। তাঁর লেখা
ছক্কা বা দুই ভাই বাবা-মায়ের উদ্ভট মানসিকতার কারণে অনেক সন্তানদের উদ্ভট ডাকনাম নিয়ে সমাজে বাস করতে হয়। আমার জানা মতে, কিছু উদ্ভট ডাকনাম নাট-বল্ট (দুই যমজ ভাই। বাবা বুয়েট থেকে পাস করা আর্কিটেক্ট) ডেঙ্গু (এক ডাক্তার বাবার পুত্রের নাম) অংক, মানসংক (বাবা স্কুলের অংক শিক্ষক। অংক ছেলের
নাম, মানসংক মেয়ের নাম) মিসির আলি খাতা বন্ধ করলেন। ছক্কা-বক্কা সম্পর্কে বেশি কিছু তিনি জানেন ।
জসুর কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেল। বুদ্ধি বিষয়ক তথ্য, তবে এই তথ্য ঘােলাটে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ছক্কা-বক্কা এই দুই ভাইয়ের বুদ্ধি কেমন ?
জসু বলল, দুই ভাই যখন একত্রে থাকে তখন বুদ্ধি নাই। আলাদা যখন থাকে তখন বেজায় বুদ্ধি।
আলাদা কখন থাকে ? দুপুরে দুই ভাই দেখি কলপাড়ে একসঙ্গে গােসল করে।
জসু বলল, মাঝেমধ্যে আলাদা হয়। ধরেন, বড়ভাইরে তার পরিবার ডাক দিল । সে চইলা গেল। তখন ছােটভাই একলা ।
মিসির আলি বললেন, এরা নাকি তাদের বাবাকে দুটা করে দেখে। এমন কিছু শুনেছিস ? শুনেছি। শুধু এই দুইজনই না। তাদের পরিবারও দেখেছে। ছােটভাইয়ের বউ একবার দুই শ্বশুর দেইখা ফিট পড়েছে। খাটের কোনায় লাইগা মাথা ফাটছে । হাসপাতালে নিতে হইছে। তয় এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন আর ফিট পড়ে
একই মানুষকে দু’জন দেখা বিষয়টাকে মিসির আলি তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন । অপটিক্যাল হেলুসিনেশন | দৃষ্টি বিভ্রম। এই দুই ভাই তাদের দৃষ্টি বিভ্রম স্ত্রীদের কাছেও ছড়িয়ে দিয়েছে। সাইকোলজির পরিভাষায় এর নাম Induced hallocination i | দৃষ্টি বিভ্রমের বড় শিকার স্কিজোফ্রেনিক রােগীরা। তাদের ব্রেইন কাল্পনিক ছবি তৈরি করে। রােগীরা সেই ইমেজ সত্যি মনে করে। তারা যে বাস্তবতায় বাস করে তার নাম Distorted reality !
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৫
স্কিজোফ্রেনিক রােগীদের ধর্মকর্মে প্রবল আসক্তি থাকে। এই দুই ভাইয়ের তা আছে। সারা দিন এরা নামাজ পড়ে না। সন্ধ্যার পর বারান্দায় জায়নামাজ বিছিয়ে বসে। অনেক রাত পর্যন্ত নামাজ পড়ে । জিকির করে।
মিসির আলি জসুকে জিজ্ঞেস করলেন, এই দুই ভাই মানুষ কেমন ?
জসু বলল, অত্যধিক ভালাে। সবার সাথে তাদের মধুর ব্যবহার। একটা ঘটনা বললে বুঝবেন । এই দুই ভাই গলির সামনের স্টলে চা খাইতেছে, এমন সময় আমি সামনে দিয়া যাই। বড়ভাই আমারে হাত উঁচায়ে ডাকল । মধুর গলায় বলল, জসু! আমরার সাথে এক কাপ চা খাও। যদি না খাও মনে কষ্ট পাব।
Read More