হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৭

 দুইজনেই আমার দুই ফুট দূরে, আমার ডানদিকে তাকায়ে থাকত। আমি কোনাে প্রশ্ন করলে সেই দিকে তাকিয়েই উত্তর দিত ।যখন নামিবে আঁধার এই কাজ কেন করত জিজ্ঞেস করেন নাই ? করেছি। একবার না, অনেকবার করেছি। তাদের জবাব কী ? 

তারা নাকি দুইজন বাবা দেখে। একটা বাবা খারাপ, একটা ভালাে। তারা তাকিয়ে থাকে ভালাে বাবার দিকে। 

আপনি তাহলে তাদের কাছে খারাপ বাবা ? 

হুঁ। যতবার দুই ভাই এই রকম কথা বলেছে ততবার এদের শক্ত মাইর দিয়েছি। একবার তাে বড়টার গলা চিপে ধরলাম । গোঁ গোঁ শব্দ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। আমি ভাবলাম, মরে গেছে। কিছুক্ষণ পর উঠে বসে চি চি করে বলে, বাবা, পানি খাব। 

আপনার দিকে তাকিয়ে কি বলেছে ? 

, ওই যে বললাম, দুই ফুট দূরে তাকায়। আমার ডানে। 

এরা দু’জন দেখি সবসময় একই রকম কাপড় পরে। এটা কখন থেকে শুরু হলাে ? 

মল্লিক সাহেব হতাশ গলায় বললেন, তারা দুজন যে শুধু একই রকম কাপড় পরে তা না, তাদের বউ দুইটারও একই চেহারা। যমজ বােন। একটার নাম পারুল, আরেকটার নাম চম্পা। বুঝার উপায় নাই, কোনটা কে। আমি কোনােদিনই বুঝি আমার ধারণা, আমার দুই বদ পােলাও জানে না কোনটা কে ? 

পুত্রবধূদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ? খারাপ। কতটা খারাপ? 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৭

পারুলকে আমি ডাকি বড় কুত্তি, চম্পাকে ডাকি ছােট কুত্তি। এখন বুঝে নেন সম্পর্ক কত খারাপ । এদের স্বভাব চরিত্রও কুত্তির মতাে। কেন তা বলব না। শ্বশুর হয়ে পুত্রবধূদের বিষয়ে নােংরা কথা বলা যায় না। 

 মল্লিক উঠে দাঁড়ালেন, মিসির আলিকে কোনাে কিছু না বলেই হঠাৎ করে বের হয়ে গেলেন। ঘুমুতে যাওয়ার আগে মিসির আলি ব্যক্তিগত কথামালার খাতা খুলে কিছুক্ষণ লিখলেন— 

ছক্কা-বক্কা এবং তাদের বাবার ব্যাপারে আমি কিঞ্চিৎ আগ্রহ বােধ করছি। তাদের পুরাে কর্মকাণ্ডে এক ধরনের অসুস্থতা আছে । ছেলে দুটি মানসিক রােগগ্রস্ত, নাকি তাদের বাবা ? 

বিষয়টা আমার কাছে পরিষ্কার না । মল্লিক সাহেবের কথাবার্তা শুনে মনে হয় তাঁর পুত্রবধূদেরও কিছু সমস্যা আছে। 

দুটি ছেলেই বাবাকে অসম্ভব ভয় পায়। সেটাই স্বাভাবিক। যে বাবা শাস্তি হিসেবে গলা চেপে ধরে অজ্ঞান করে ফেলেন, তাকে ভয় না পেয়ে উপায় নেই। 

এমন কি হতে পারে, বাবাকে অসম্ভব ভয় পায় বলেই এরা অন্য এক বাবাকে কল্পনা করেছে, যে বাবা ভালাে, স্নেহময়? কল্পনার সেই বাবা, খারাপ বাবার ডানদিকে দুই ফুট দূরত্বে থাকেন। মস্তিষ্ক চাপ সহ্য করতে পারে না। চাপ মুক্তির পথ খোঁজে। একটি ভালাে বাবা কল্পনা করে নেওয়া চাপমুক্তির পথ। 

দুটি ছেলেই অন্তর্মুখী। এদের পক্ষে দুই যমজ বােনের প্রেমে পড়ে নিজেদের ইচ্ছেয় বিয়ে করা অসম্ভব। আমি নিশ্চিত, মল্লিক সাহেব দুই ছেলের বিয়ের জন্যে যমজ বােন খুঁজে বের করেছেন। তাঁর আগ্রহেই বিয়ে হয়েছে।

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৭

দুই ভাই একই পােশাক পরে। বিষয়টা তারা করেছে, না তাদের বাবা ঠিক করে দিয়েছে ? 

একই চেহারার দুই স্ত্রী যিনি ঠিক করে দিয়েছেন, তিনিই একই পােশাকের ব্যাপারটা করবেন। সাধারণ লজিক তা-ই বলে। 

আরও রহস্য আছে। ছক্কা-বক্কা দু’জনেরই একটি করে ছেলে (যদিও মল্লিক বলেন তাদের চারটি সন্তান)। তাদের বয়স কাছাকাছি। দুই থেকে তিন বছর। বেশির ভাগ সময় তারা বাবার কোলে থাকে। দুই বাবাই সন্তান কোলে নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ক্লান্তিহীন হাঁটাহাঁটি করেন।

ছক্কার ছেলেই যে ছক্কার কোলে থাকে তা না, কখনাে সে থাকে বক্কার কোলে। কে কার কোলে থাকবে তা নিয়ে ধরাবাঁধা কোনাে ব্যাপার নেই। রহস্য হচ্ছে যখন যে শিশু যার কোলে থাকবে তাকেই বাবা ডাকবে ।  মল্লিক সাহেব দাবি করেন, তিনি মৃত মানুষদের দেখতে পান। তাদের সঙ্গে কথাবার্তাও বলেন । একটি পরিবারের 

সবাই ডিলিউশনে ভুগবেন, এটাই বা কেমন কথা! কোনাে পরিবারে একজন কঠিন মানসিক রােগী থাকলে তার প্রভাব অন্যদের ওপর পড়বে। এটা স্বাভাবিক। তবে সুস্থ মানুষ 

কখনােই অসুস্থ হয়ে পড়বে না। দুর্বোধ্য রহস্যের মুখখামুখি হলে বেশিরভাগ মানুষ এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দিয়ে শেক্সপিয়ার আওড়ায়। দার্শনিক ভাব ধরে বলে—There are many things in heaven and earth… 

মিসির আলি হাল ছেড়ে দেওয়ার মানুষ না। তিনি রহস্যের ভেতর ঢুকতে চাইছেন। দুই ভাইয়ের কাছ থেকে কয়েকটা জিনিস জানা তার খুবই প্রয়ােজন । দুই ভাইকে তিনি পাচ্ছেন না। তারা সারা দিন নানান জায়গায় ঘােরে, গভীর রাতে বাবার কাচ্চি হাউসে ঘুমিয়ে থাকে। 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৭

মিসির আলি কয়েকবার তাদের খোঁজে জসুকে পাঠিয়েছেন। জসু তাদের পায় নি । | দুই ভাই বিষয়ে মল্লিক এক রাতে তথ্য দিলেন। মিসির আলিকে আনন্দের সঙ্গে জানালেন, ওরা হাজতে।

মিসির আলি বললেন, হাজতে কেন ? কী করেছে ? 

নতুন কিছু করে নাই। পুরানাে পাপে হাজত বাস করছে। রমনা থানার ওসি সাহেবকে পাচ হাজার টাকা দিয়ে বলেছি, দু’জনকে ধরে নিয়ে যেন ভালােমতাে ডলা দেওয়া হয়। তিন দিন হাজত বাস করে ফিরবে। শিক্ষা সফরের ব্যবস্থা। এ রকম শিক্ষা সফর আগেও একবার করেছে। আপনি ব্যবস্থা করেছেন? 

হ্যা, ওসি সাহেবের সঙ্গে আমার জানাশােনা আছে। প্রায়ই ওনাকে অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস উপহার হিসাবে পাঠাই। একবার পাঠিয়েছিলাম এক কলসি রাবরি । রাবরি চেনেন ? 

 

Read More

হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৮

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *