হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১০

 চাচাজি, আমার নাম চম্পা। আমি বক্কার স্ত্রী। আপনার কাছে বিশেষ প্রয়ােজনে এসেছি।

যখন নামিবে আঁধারযাকে দেখা যাচ্ছে না তার সঙ্গে স্বস্তি নিয়ে কথা বলা যায় না। এই মেয়েটির সঙ্গে কথা বলা আর দূরের কারও সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা একই জিনিস। 

মিসির আলি বললেন, মা! তুমি বসাে। প্রয়ােজনটা কী বলে? 

চম্পা বসল। মিসির আলি লক্ষ রাখলেন এই মেয়ে তার স্বামীর মতাে পা নাচায় কি না। পা নাচাচ্ছে না। 

মিসির আলি বললেন, তােমার কী জরুরি কথা বলাে। 

চম্পা বলল, আমার স্বামী আর ভাসুরকে হাজত থেকে ছাড়াবার ব্যবস্থা করে দেন। তারা সম্পূর্ণ নির্দোষ । 

| মিসির আলি ব্ৰিত গলায় বললেন, এরা দুজনই খুনের মামলার আসামি। খুনের কথা স্বীকার করেছে। পুলিশ এদের ছাড়বে না। 

চম্পা বলল, খুন এরা করে নাই। এই দুই ভাই খুবই ভালাে মানুষ। এরা পিপড়াও মারে না । খুন কি করবে! খুন আমি আর আমার বড় বােন পারুল আপা মিলে করেছি। উনার খাবারের সঙ্গে এন্টাসি মিশায়ে দিয়েছি। 

নিজেকে সামলাতে মিসির আলির কিছুটা সময় লাগল । এই মেয়ে সহজ গলায় এইসব কী বলছে। মিসির আলি বললেন, এন্টাসি কী জিনিস ? | ইঁদুর মারা বিষ । কোনাে গন্ধ নাই । লেবুর শরবতের সঙ্গে মিশায়ে দিয়েছি। কয়েক চুমুক দিয়ে উনি চিৎ হয়ে পড়ে গেছেন। মৃত্যু হওয়ার আগেই দুই ভাই মিলে লাশ কুয়াতে ফেলেছে । 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১০

তােমরা দুই বােন পুলিশকে এই কথা বলতে চাও? জি, চাচাজি। তােমরা যে হত্যা-পরিকল্পনা করেছিলে এইটা কি ছক্কা-বা জানত? 

 তাদের বলি নাই । বিষ কে কিনে এনেছে ? ইঁদুর মারা বিষ ঘরে ছিল, কেউ কিনে নাই। খুন করেছ কী জন্যে ? 

উনি খুব খারাপ লােক ছিলেন। সপ্তাহে একদিন উনার কাছে আমার কিংবা আমার বােনের যেতে হতাে। রাতে থাকা লাগত। আমার বড়বােন কখনাে থাকে নাই। আমি থেকেছি। কখনাে বলেছি আমার নাম পারুল, কখনাে বলেছি চম্পা। আমরা দুই বোেন দেখতে একই রকম। উনি ধরতে পারেন নাই। 

তােমার স্বামী বা ভাসুর এই ঘটনা জানে ? জি জানে। মিসির আলি বললেন, তুমি আমাকে যা বলেছ পুলিশকে কি তা বলতে পারবে ? 

পারব। ইনশাল্লাহ। 

তােমাদের দু’বােনের কথা আমি পুলিশকে জানাতে পারি। তার আগে তােমার বড় বােন পারুলের সঙ্গে আমার কথা বলতে হবে। 

আমি আপনাকে যা বলেছি পারুল আপা সেই কথাই বলবে। আলাদা কিছু বলবে না । 

 তারপরেও তার সঙ্গে আমার কথা বলা প্রয়ােজন। 

চম্পা বলল, আমি চেষ্টা নিব উনাকে পাঠাতে। তবে চেষ্টায় কাজ হবে না। পারুল আপা কারও সঙ্গে কথা বলে না। চাচাজি, তাহলে আমি যাই । আসসালামু আলায়কুম। 

 মিসির আলি কিছু বললেন না। ঘটনা শুনে তিনি ধাক্কার মতাে খেয়েছেন। ধাক্কা সামলাতে তার সময় লাগছে। 

তিনি বড় বােন পারুলের অপেক্ষা করতে করতে সিগারেট ধরালেন। নিকোটিনের জট আলগা করার ক্ষমতা আছে। এই মুহূর্তে নিকোটিনের ধোঁয়া তার ওপর কাজ করছে না। জট আলগা হচ্ছে না, বরং আরও পেঁচিয়ে যাচ্ছে । 

পারুল এসেছে। ঠিক ছােটবােন চম্পার মতাে বােরকা, মােজা, বােরকার রঙ কালাে। পা এবং হাতের মােজার রঙও কালাে। ছােটবােনের গা এবং বােরকা থেকে কোনাে পারফিউমের গন্ধ আসে নি। বড়বােনের বােরকা থেকে হালকা পারফিউমের গন্ধ আসছে। লেবু ও চা-পাতার মিশ্র গন্ধের পারফিউম। ছােটবােনের গলা ঝনঝন করছিল। বড়বােনের গলা চাপা, কিছুটা খসখসে। 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১০

মিসির আলি বললেন, তােমার ছােটবােন আমাকে ভয়ংকর কিছু কথা শুনিয়েছে। 

পারুল বলল, ভয়ংকর হলেও কথা সত্য। আপনার সঙ্গে যদি কোরান মজিদ থাকে, আমার হাতে দেন। আমি কোরান মজিদ মাথায় নিয়া বলব, ঘটনা সত্য। 

 তােমরা কি নিয়মিত নামাজ রােজা করাে ? 

জি করি। আমরা দুই বােনই অনেক রাত জেগে ইবাদত বন্দেগি করি। তবে ইবাদত বন্দেগি শ্বশুরের আড়ালে করতে হয় । উনি পছন্দ করেন না । রাত তিনটা থেকে ফজরের ওয়াক্ত পর্যন্ত আমরা নামাজ পড়ি। রাত তিনটায় ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রাখি । 

মিসির আলির কাছে দু’টা বিষয় স্পষ্ট হলাে। রাত তিনটায় তাঁর নিজের ঘুম ভাঙার রহস্য তার একটি। চম্পা-পারুল এই দুই বােন স্কিজোফ্রেনিয়ার রােগী, তাও এখন স্পষ্ট। এই ধরনের রােগীদের প্রধান লক্ষণ হলাে ধর্মকর্মে চূড়ান্ত আসক্তি।। 

মিসির আলি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, শ্বশুরের সঙ্গে রাত্রি যাপনের কথাটাও কি সত্যি? 

জি চাচাজি। তবে আমি কখনাে উনার কাছে যাই নি। চম্পা গিয়েছে। কখনাে চম্পা হিসেবে গেছে, কখনাে পারুল হিসেবে। চম্পার গর্ভে উনার একটি ছেলেও হয়েছিল। নাম কিসমত । এই ছেলেটিই নিউমােনিয়ায় মারা গেছে। 

মিসির আলি বললেন, আমি শুনেছিলাম ছেলেটি তােমার । 

পারুল বলল, আমার কোনাে ছেলেপুলে নাই। আমি নিঃসন্তান। চম্পার দু’বার যমজ সন্তান হয়েছে। একবার হলাে এক সন্তান। কিসমত । 

মিসির আলি বললেন, নিউমােনিয়ার চিকিৎসা কি হয়েছিল ? 

আসল চিকিৎসা হয় নাই। ছেলের বাপ অর্থাৎ আমার শ্বশুর সাহেব হােমিওপ্যাথি চিকিৎসা করেছেন। তার নিউমােনিয়া কীভাবে হয়েছিল জানতে চান ? 

 

Read More

হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১১

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *