হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৩

জি। 

মিসির আলি হাতের বাইনােকুলার নামিয়ে বললেন, চলাে যাই ।

যখন নামিবে আঁধারদুর্বল মানুষের সমস্যা হচ্ছে, তারা নানান ধরনের ডিলিউশনে ভুগে। এই রােগ আবার সংক্রামক। একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে যায়। মাস হিস্টিরিয়াও আছে। মানবগােষ্ঠীর একটি বড় অংশের ডিলিউশনের শিকার হওয়ার ঘটনাও আছে। ইউরােপের ডাইনি অনুসন্ধান ছিল বড় ধরনের ডিলিউশন।। 

মিসির আলি নিশ্চিত, মল্লিক সাহেবের পরিবার দুই পুত্রবধূ ডিলিউশনে ভুগছে। তারা মৃত মল্লিককে ঘুরে ফিরে বেড়াতে দেখছে। মৃত মানুষকে জীবিত 

দেখা সাধারণ পর্যায়ের ডিলিউশন। অনেক পিতা-মাতাই তাদের মৃত সন্তানদের জীবিত দেখেন। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। এই বিষয়ে প্রচুর কাজ করেছেন Christopher Bird। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থের নাম The Secret Life of Dead People। উপন্যাসের চেয়েও সুখপাঠ্য বই। 

পারুল মিসির আলিকে তাদের মূল বাড়িতে নিয়ে এল। দোতলার একটা ঘরে ঢুকিয়ে বলল, চাচাজি, আপনি এই ঘরে অপেক্ষা করুন। আমি এখান থেকে আপনাকে ডেকে নিয়ে যাব। অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখাব। আপনি কি চা-কফি কিছু খাবেন ? 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৩

আপনি খবরের কাগজ পড়ুন। আমি আসছি। 

চারদিনের বাসি খবরের কাগজ টেবিলে পড়ে আছে। খাবার বাসি হলে যেমন দুর্গন্ধ ছড়ায়, বাসি খবরের কাগজও একই রকম দুর্গন্ধ ছড়ায়। 

পারুল পাঁচ দশ মিনিটের কথা বলে গিয়েছিল। চল্লিশ মিনিট পার হওয়ার পর মিসির আলির হঠাৎ করেই সন্দেহ হলাে—পারুল নামের মেয়েটা তাকে এই ঘরে আটকে ফেলেছে। ঘরের দরজা তালা দেওয়া। তিনি চেষ্টা করলেও সেই তালা খুলতে পারবেন না। 

মিসির আলি উঠে দাঁড়ালেন। দরজার কাছে গেলেন, দরজা খুলতে পারলেন । দরজা সত্যি সত্যি তালা দেওয়া। মিসির আলি দরজা ধাক্কাধাক্কি কিংবা ‘পারুল পারুল’ বলে ডাকাডাকির ভেতর দিয়ে গেলেন না । ঘরের ভেতরটা ভালােমতাে দেখতে শুরু করলেন। 

গেস্ট রুম বা অতিথি কক্ষের মতাে ঘর। সিঙ্গেল খাট পাতা আছে। খাটে বালিশ এবং চাদর পরিষ্কার। এই ঘরে কেউ ঘুমায় না। 

আসবাবপত্রের মধ্যে একটা আলনা আছে, জানালার কাছে লেখালেখির জন্যে চেয়ার-টেবিল আছে। টেবিলে পুরনাে রিডার্স ডাইজেস্টে দু’টা কপি এবং নেয়ামুল কোরান গ্রন্থ আছে। যে জানালার পাশে টেবিল-চেয়ার আছে, সেই জানালা বাইরে থেকে বন্ধ । 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৩

ঘরের সঙ্গে অ্যাটাচড বাথরুম আছে। বাথরুম অনেকদিন ব্যবহার হয় না। বাথরুমের র্যাকে সাবান-শ্যাম্পু আছে। ধােয়া টাওয়েল আছে । কমােডের ওপর ফ্লাশ-বেসিনে তিন মাস আগের একটা টাইম পত্রিকা দেখে মিসির আলি অবাক হলেন। মল্লিক সাহেবের বাড়ির কারােরই টাইম পত্রিকা পড়ার কথা না। 

ঘরে একটা দেয়াল ঘড়ি আছে। বেশিরভাগ গেস্টরুমের দেয়াল ঘড়ি ব্যাটারি শেষ হওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে থাকে। অতিথি এলেই নতুন ব্যাটারি লাগানাে হয়। এই ঘড়ির কাঁটা সচল আছে। এখন বাজছে একটা পঁচিশ। মিসির আলির ক্ষুধাবােধ হচ্ছে। টেনশনে ক্ষুধা বৃদ্ধি পায়। 

দেয়াল ঘড়ি ছাড়াও গাঢ় লাল রঙের একটা টেলিফোন সেট আছে। মিসির আলি রিসিভার কানে দিলেন। পাতালের নৈঃশব্দ্য। লাইন কাটা। এটা যুক্তিযুক্ত। বন্দিশালায় টেলিফোন থাকবে না। 

মিসির আলি বিছানায় শুয়ে পড়লেন। মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে। আবহাওয়া আরামদায়ক শীতল। ক্ষুধার্ত মানুষেরা সহজে ঘুমুতে পারে না, কিন্তু মিসির আলি ঘুমিয়ে পড়লেন। তাঁর ঘুম ভাঙল তিনটা দশে। প্রায় দু’ঘণ্টার আরামদায়ক ঘুম। 

মিসির আলি মূল দরজা এবং টেবিলের সামনের জানালা পরীক্ষা করলেন। দু’টা এখনাে বন্ধ। তিনি যথেষ্টই ক্ষুধার্ত বােধ করছেন। তাকে খাবার দেওয়া হবে কি না বুঝতে পারছেন না। তাঁকে আটকে রাখার উদ্দেশ্যও পরিষ্কার হচ্ছে না। পারুল মেয়েটা তার কাছে কী চাচ্ছে ? মানুষের ধর্ম হলাে, যাকে সে ভয় পাবে তাকে আটকে ফেলার চেষ্টা করবে। পারুল মেয়েটা কি তাকে ভয় পাচ্ছে ? কিসের ভয় ? তার কোনাে গােপন কথা জেনে ফেলার ভয়। 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৩

 গােপন কথা দূরে থাকুক, পারুল ও তার বােন চম্পা সম্পর্কে তিনি প্রকাশ্য কোনাে কথাও জানেন না। তিনি শুধু জানেন, এই বাড়ির ওপর এক ধরনের অসুস্থতা ভর করে আছে। 

রাত এগারটা বাজে। মিসির আলিকে এখন পর্যন্ত কোনাে খাবার দেওয়া হয় নি। 

তাঁর সঙ্গে কোনাে যােগাযােগের চেষ্টাও কেউ করে নি। 

তিনি কয়েকবার দরজা ধাক্কাধাক্কি করেছেন। পারুল পারুল’ বলে ডেকেছেন। কেউ সাড়া দেয় নি। 

মিসির আলির কাছে মনে হচ্ছে, তালাবন্ধ অবস্থায় তিনি ছাড়া বাড়িতে কেউ নেই । বাড়ি নিঃশব্দ, নিচুপ ।মিসির আলি টাইম পত্রিকা, রিডার্স ডাইজেস্ট এবং নেয়ামুল কোরান গ্রন্থের সবটা পড়ে শেষ করেছেন। নেয়ামুল কোরান পড়তে গিয়ে মিসির আলি বুঝতে পারলেন এই ঘরে আরও একজনকে আটকে রাখা হয়েছিল । সে নেয়ামুল কোরান গ্রন্থের অনেক জায়গায় যেসব কথা লিখেছে তা হলাে 

১. আমাকে কত দিন তালাবন্ধ করে রাখবি ?

২. ক্ষুধায় মরে যাচ্ছি, খাওয়া দে । 

 

Read More

হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৪

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *