যাই হােক ওষুধ কিনতে গিয়ে দেখে ফার্মেসির সামনে এক লােক মেঝেতে বসে ফটোগ্রাফ দেখে দেখে পেনসিলে ছবি আঁকছে। ওয়ান ফুট বাই ওয়ান ফুট ছবি এঁকে দেয়, একশ’ করে টাকা নেয়। বারসাত লােকটার পাশে বসে পড়ল। দু’ঘণ্টা ছবি আঁকা দেখল। তারপর কাগজের দোকান থেকে কাগজ কিনল, পেনসিল কিনল। মেসে ফিরে নিজের পাসপাের্টের ছবি দেখে একটা ছবি আঁকল। খুবই সুন্দর হল ছবিটা— এই তার শুরু।
ছেলের ধৈর্য আছে।
এটা ধৈর্য না । এর নাম ক্ষমতা। কোনাে কিছু করতে হলে শুধু ধৈর্যে হয় না। ক্ষমতা লাগে। বারসাত ছবি আঁকার ক্ষমতা নিয়ে এসেছে। নিজে
হুঁ।
কী সর্বনাশ! তুই তওবা কর ।। তওবা করার মতাে কোনাে পাপ করিনি ফুপু।।
বেগানা পুরুষের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছিস এটা পাপ না? আমার তাে এখন সন্দেহ হচ্ছে তােরা গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রিকশায় বসেছিস।
তােমার সন্দেহ ভুল না ফুপু । আমরা প্রায়ই রিকশায় চড়ি। গায়ের সঙ্গে গা লাগে?
বুঝতে পারেনি। তবে সে পােট্রেট ছাড়া আর কিছু করে না। যে পােট্রেট এত ভালাে পারে সে সব কিছুই পারবে অথচ সে করবে না। তার না কি মানুষের মুখ ছাড়া অন্য কিছু আঁকতে ভালাে লাগে না। ফুপু তাকে দিয়ে তােমার একটি ছবি আঁকাবে? বােরকা ছাড়া ছবি ।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৫)
ফাজলামি করিস না তাে।
আচ্ছা ঠিক আছে ছবি না আঁকালে। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বল। কথা বলাতে তাে দোষ নেই।
কথা বললে কী হবে?
কিছুক্ষণ কথা বললেই তাকে আপন মনে হবে। মনে হবে সে বাইরের কেউ না, ঘরের মানুষ। সে তিনটা প্রাইভেট টিউশনি করে। যে সব বাচ্চাদের সে পড়ায় তাদের মায়েদের সঙ্গে ওর খুবই খাতির। মায়েরা তাকে প্রায়ই খবর দিয়ে নিয়ে যায়। তাকে নিয়ে শপিং-এ যায়। এটা–ওটা কাজ করায়। যে কোনাে কাজ তাকে দাও সে নিখুঁতভাবে করবে। তার এক ছাত্রীর নানির চোখ অপারেশন হবে মাদ্রাজে। বারসাত একা তাঁকে নিয়ে মাদ্রাজ থেকে চোখ অপারেশন করে চলে এসেছে। মানুষটাকে তােমার
এখন কেমন লাগছে ফুপু?
নাই কাজ খই ভাজ টাইপ লাগছে। এক ধরনের মানুষই আছে যাদের নিজের কোনাে কাজ থাকে না তারা কাজের জন্যে অন্যের ওপর লেপ্টে থাকে।
ঠিক বলেছ ফুপু । বিয়ের পর আমি ওর এই অভ্যাস ঠিক করাব।
বিয়ে মানে? বিয়ের কথা আসছে কেন? তুই কি ঐ গাধাটাকে বিয়ের কথা ভাবছিস?
মীরু তুই বুঝতে পারছিস না, এরকম কিছু করলে কিন্তু বাসায় গজব হয়ে যাবে।
গজব যাতে না হয় তুমি সেই চেষ্টা চালাবে। তুমি কাজ করবে আমার হয়ে। তুমি হবে আমার স্পাই । ঘরের শত্রু বিভীষণ।
আমি কেন তাের হয়ে কাজ করতে যাব?
কারণ তুমি আমার অতি আদরের ফুপু। আমি তােমাকে পছন্দ করি। তুমিও আমাকে পছন্দ কর। ফুপু দেখ তাে বিয়ের দিন আমি এই শাড়িটা পরব । ঠিক আছে না?
মােটেই ঠিক নেই। বিয়ের দিন সাদা শাড়ি কেউ পরে? সাদা হল বিধবাদের রঙ।
পশ্চিম দেশের সব মেয়েরা বিয়েতে সাদা পােশাক পরে। তাছাড়া শাড়িটা পুরােপুরি সাদাও না। মাঝে মধ্যে লাল–সবুজের খেলা আছে।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৫)
তুই তাে পশ্চিমা মেয়ে না । তুই বাঙালি মেয়ে। বিয়ের দিন তুই পরবি টকটকে লাল রঙের শাড়ি।
তুমি পাগল হয়েছ? লাল শাড়ি পরে আমি কাজির অফিসে যাব না–কি? এক কাজ কর, শাড়ির উপর বােরকা পরে ফেল। তাহলে কেউ বুঝবে এই বুদ্ধি খারাপ না। ঘােমটার নিচে খেমটা নাচ।
কাল্পনিক কথােপকথন আর ভাল লাগছে না। এখন সত্যি সত্যি কারাে সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে। রুনির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা যায়। সে মনে হয় রাতে ঘুমায় না। মীরু যত রাতেই টেলিফোন করুক দুটা রিং বাজার আগেই রুনি টেলিফোন ধরে সহজ গলায় বলবে- ‘হ্যালাে। টেলিফোনটা থাকে বড় খালার ড্রয়িং রুমে। দুটা রিং হবার সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন ধরতে হলে ড্রয়িং রুমে বসে থাকতে হয়। মীরার ধারণা তার বড় বােন রাত এগারােটার পর ড্রয়িং রুমেই চুপচাপ বসে থাকে। যার সঙ্গে ডিভাের্স হয়ে গেছে তার টেলিফোন কলের জন্যে অপেক্ষা। সেই কল আর আসে না।
মীরা টেলিফোন করল। একবার রিং হবার পরই রুনি মিষ্টি গলায় বলল, হ্যালাে ।
হুঁ মানে? হুঁ মানে Yes. আমি ঐ লােকটাকে কাজির অফিসে বিয়ে করব।
আমি তাের বিয়ে ঠিক করে রেখেছি। ছেলের নাম— জাহাঙ্গীর । হীরের টুকরাে ছেলে। তুই কাজি অফিসে কেন বিয়ে করবি।
রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৫)
কাজি অফিসে বিয়ে করব কারণ আমি জাহাঙ্গীর সাহেবকে বিয়ে করছি । অন্য একজনকে বিয়ে করছি। হীরা আমার পছন্দের পাথর না। আমার হন্দের পাথর হল রেললাইনের পাথর।
আমি মীরা। আপা তুমি জেগে আছ?
ঐ লােকের কি টেলিফোন করার কথা?
কারােরই টেলিফোন করার কথা না। ঘুম আসছে না বলে জেগে আছি। তুই জেগে আছিস কেন?
আমি কেন জেগে আছি তা তােমাকে বলতে পারি কিন্তু তুমি সঙ্গে সঙ্গে সেটা চারদিকে রাষ্ট্র করে দেবে, আমার হবে অসুবিধা।
মীরা বাসার খবর কি? বাসার খবর ভাল । বাবা আমাকে ত্যাজ্য কন্যা করেছেন এটা কি সত্যি? হুঁ, সত্যি । তার মানে আমি বাবার বিষয়-সম্পত্তি কিছুই পাব না?
তুই এত সহজভাবে না বলতে পারলি? তাের একটুও খারাপ লাগল ?
করবেন না। এমন একটা ভাব ধরবেন যেন এরকমই হবার কথা ।
Read more