হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৮)

বারসাত হাসল । কিছু বলল না। 

নীলুফার বলল, বাসায় যেতে না চাও থাক এখানে। অপেক্ষা কর । একটা টাওয়েল জোগাড় করে মাথাটা মােছার ব্যবস্থা কর।রোদনভরা এ বসন্ত

বারসাত আবারাে হাসল ।। 

তার মাথায় অন্য পরিকল্পনা খেলা করছে। তার ইচ্ছা করছে ঝুম বৃষ্টিতে ভালােমতাে ভিজে সত্যি সত্যি একটু অসুখ বাধাতে। বেশ কিছুদিন ধরে তার শরীর অতিরিক্ত রকমের ভালাে যাচ্ছে। অসুখ-বিসুখ কিছু হচ্ছে 

শেষবার হল ভাইরাল ফিভার। বিছানায় তিনদিন শুয়ে থাকা। বিছানা থেকে উঠে বসলেই মাথা চক্কর দিত। চক্করটা খারাপ লাগত না। পর্দা সরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ কড়কড করত। মাথা ধকধক 

বারসাত বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়াল। ভেজার উদ্দেশে বৃষ্টিতে নামলেই বৃষ্টি কেন জানি কমে যায়। বারসাত ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টি অনেকখানি কমে গেছে—তারপরও যা আছে খারাপ না। এই বৃষ্টি ঘণ্টা দুই শরীরে মাখাতে পারলে অসুখ অবশ্যই হবে । ডবল নিউমােনিয়া বাধিয়ে ফেলা যেতে পারে। ঘাের ঘাের ভাব নিয়ে বিছানায় পরে থাকা খারাপ কী? 

বৃষ্টিতে ভেজার জন্যে বারসাত মােটামুটি একটা ভালাে জায়গা পেয়েছে। রাস্তা থেকে চট করে তাকে দেখা যাবে না। সে রাস্তার লােকজন ঠিকই দেখতে পাবে। রাস্তার সব লােক তার দেখার দরকার নেই। মীরুকে দেখতে পেলেই চলবে। আচ্ছা মীরু যখন দেখবে সে হাসি হাসি মুখে বৃষ্টিতে ভিজছে তখন কী করবে? রিকশা থেকে নেমেই বিরক্তিতে কপালে ভঁজ ফেলে বলবে, তুমি বৃষ্টিতে ভিজছ কেন? 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৮)

বারসাত বলবে, এই বৎসর বৃষ্টিতে ভেজা হয়নি। কাজেই ভাবলাম কোটা শেষ করে রাখি। শুভদিনে বৃষ্টিতে ভেজা যাক।। 

আজ শুভদিন না কি? 

আরে আজ আমাদের বিয়ের দিন। আজ শুভদিন না? রিকশা ভাড়া দিয়ে চলে এসাে দু’জনে মিলেই ভিজি। | তুমি পাগল হতে পার। আমি তাে পাগল না। দুনিয়ার মানুষের সামনে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ভিজব। লােকজন তাকিয়ে দেখবে শাড়িটা কতটা গায়ের সঙ্গে লেগেছে। 

তাহলে তুমি বৃষ্টিতে ভিজবে না? না। 

শাড়ি গায়ের সঙ্গে লেগে যাবে এই ভয়ে বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে? 

উফ চুপ কর তাে! 

রবীন্দ্রনাথের ঐ গানটা মনে করলে কিন্তু ভেজা শাড়ির কথা মাথায় আসবে না। দু’হাত তুলে ঘুরে ঘুরে বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করবে।

কোন গান? 

এসাে কর স্নান, নবধারা জলে। 

এসাে নীপবনে ছায়াবীথি তলে।। বারসাত শােনাে তুমি অনেক দিন আমার সঙ্গে আছ ঠিকই কিন্তু তুমি আমাকে সেই অর্থে চেন না। আমার মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম নেই। বৃষ্টি দেখলেই আমার বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করে না। 

রেগে যাচ্ছ কেন? 

রাগছি না। তােমার নায়ক টাইপ কথা শুনে বিরক্ত হচ্ছি। তুমি কি জাননা তুমি মানুষকে খুব বিরক্ত করতে পার। 

জানি। বৃষ্টিতে ভেজার এই ঢংটা না করে তুমি কি দয়া করে রিকশায় উঠবে? তােমার সঙ্গে? হ্যা, আমার সঙ্গে। তােমার নতুন শাড়ি ভিজে যাবে তাে। ভিজুক। তুমি উঠে এসাে। 

এখন উঠতে পারব না। ছােট্ট একটা কাজ আছে কাজটা শেষ করে। উঠতে হবে। 

কী কাজ? 

নীলুফার নামের একটি মেয়েকে নিউজ বুলেটিন পাঠাতে হবে। তার মােবাইলে টেলিফোন করে জানাতে হবে যে তুমি এসেছ। বিয়েটা শেষপর্যন্ত হচ্ছে। হাসছ কেন? 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৮)

হাসছি কারণ আমি আসিনি। আমাদের বিয়েও হচ্ছে না। আমার রিকশায় করে চলে আসার ব্যাপারটা পুরাে কল্পনা। শুধু যে আমার ব্যাপারটাই কল্পনা তা না, বৃষ্টির ব্যাপারটাও কল্পনা। 

তাই না কি? 

হ্যা, তাই। বৃষ্টি অনেকক্ষণ থেমে গেছে। আকাশে মেঘ কেটে গিয়ে। রােদ পর্যন্ত উঠে গেছে। তুমি যদি একটু ডান দিকে সরে দাঁড়াও তাহলে তােমার গালে রােদ পড়বে। 

মীরু তােমার হাতে কি ঘড়ি আছে? 

আমার হাতে ঘড়ি নেই। আমি কল্পনার মীরু। কল্পনার মীরু হাতে ঘড়ি পরে না। বাস্তবের মীরু পরে । ঘড়ি দিয়ে কী হবে? 

চারটা বাজছে কি না জানতে চাই। 

তােমার নিজের হাতে ঘড়ি আছে। ঘড়িটা দেখে সময় জেনে নাও। আমার ধারণা চারটার বেশি বাজে। 

বারসাত ঘড়ি দেখল। চারটা পঁচিশ বাজে। মীরুর জন্যে আর অপেক্ষা করার দরকার নেই। এখন চলে যাওয়া যেতে পারে। একটা টেলিফোন নীলুফার ভাবীকে করতে হবে। উনি নিশ্চয়ই টেলিফোনের জন্যে অপেক্ষা করে আছেন। 

হ্যালাে ভাবী। 

হ্যা। মীরু আসেনি। আই এ্যাম সরি টু হিয়ার দ্যাট। তুমি কোথায়? 

আমি এখনাে কাজি অফিসের আশপাশে। টেলিফোন শেষ করেই রওনা দেব। 

কোথায় রওনা দিবে? 

আমার দূর-সম্পর্কের এক মামার বাগানবাড়িতে।

 

Read more

হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-৯)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *