হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১০)

 আজফল সাহেব বললেন, তুই নিজেও রেস্ট নে। তাের ওপর দিয়ে বিরাট ধকল গিয়েছে। 

বুকে ব্যথাট্যথা এসব তাে এখন আর নেই? 

মীরু শােন, তুই না থাকলে তাে আজ আমি মরেই যেতাম রে মা! আফজল সাহেবের চোখে পানি এসে গেল। তার ইচ্ছা করল কিছুক্ষণ মেয়ের হাত ধরে থাকতে। তিনি আবারাে তার ডান হাতটা মেয়ের দিকে বাড়ালেন। মীরু এমন ভাব করল যেন সে দেখতে পায়নি। হাত ধরাধরি নাটক করতে তার ইচ্ছা করছে না।

রোদনভরা এ বসন্ততেল দেবার পর চুলের গােছা ধরে তুমি যে টুকুস করে টান দাও– এক্কেবারে স্বর্গীয় টান। 

নাসেরকে বলে দিচ্ছি ও তােকে ভালাে কোনাে রেস্টুরেন্টে চা খাইয়ে দেবে।। 

মাথায় তেল দিয়ে দেবে না? 

সুলতানা হেসে ফেললেন। মীরু এমন মজা করে কথা বলে না হেসে থাকা সম্ভব না। 

মীরু গম্ভীর গলা করে বলল, আমি নাসের-ফাসের কাউকে সঙ্গে নেব । তােমার বােরকাটা খুলে তুমি কি আমাকে দিতে পারবে? 

সুলতানা ধমক দেবার ভঙ্গিতে তাকালেন। মীরু বলল, আমার এখন এমনভাবে যাওয়া উচিত যাতে কেউ আমাকে চিনতে না পারে। বােরকার অনেক উপকারিতা আছে। 

মীরু বােরকা নিয়ে কোনাে রসিকতা করবি না। এই রসিকতা আমার পছন্দ না। | মীরু বলল, আচ্ছা যাও তােমার এই মহান পােশাক নিয়ে আমি কোনাে রসিকতা করব না। আমি এখন বিদায় হচ্ছি।। 

তাের বাবার সঙ্গে দেখা করে যা। 

মীরু অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট–এর ভেতর ঢুকল। তার বাবার বিছানার সামনে দাঁড়াল। আফজল সাহেব ঘুমের ওষুধের কারণে সারাক্ষণই ঘুমুচ্ছেন। তারপরেও মীরু যখন বলল, বাবা আমি এখন যাচ্ছি— আফজল সাহেব চোখ মেললেন এবং একটা হাত বাড়িয়ে দিলেন। হাত বাড়ানাের অর্থ হাত ধরা। মীরু হাত ধরল না। সহজ-স্বাভাবিক গলায় বলল, বাবা আমি যাচ্ছি। তুমি রেস্ট নাও।

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১০)

আফজল সাহেব বললেন, আচ্ছাগাে মা। 

মীরু বলল, তােমার দুঃশ্চিন্তার এখন আর কিছু নেই। ঢাকা শহরে আমাদের যত আত্মীয়–স্বজন আছেন সবাই চলে এসেছেন। আজ বিকেল থেকে ঢাকার বাইরের আত্মীয়-স্বজনরা আসতে শুরু করবেন। তারা কেউই সহজে যাবে না। চিড়িয়াখানা, শিশু পার্ক, লালবাগের কেল্লা এইসব দেখে বেড়াবে। 

নাসের নামের ভদ্রলােকের গাড়িতে করেই মীরু রওনা হয়েছে। ভদ্রলােক নিজে গাড়ি চালাচ্ছেন— কাজেই মীরুকে বসতে হয়েছে ড্রাইভারের পাশের সিটে । এই ভদ্রলােক কে? তাদের কোন ধরনের আত্মীয় তা মীরু ধরতে পারছে না। ভাের রাত থেকে ভদ্রলােক গাড়ি নিয়ে ডিউটি দিচ্ছেন। কাজেই ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হবার কথা। ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হলে মীরুর চেনার কথা। সে চিনতে পারছে না। মীরুর মনে ক্ষীণ সন্দেহ— এই ভদ্রলােকই কি সুলতানা ফুপুর ঠিক করা পাত্র? যার সঙ্গে মীরুর বিয়ে দেবার জন্যে সুলতানা ফুপু প্রায় জীবন দিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু সেই ছেলের নাম নাসের না। তার নাম অন্যকিছু মােঘল রাজা বাদশার নামে নাম । 

ভদ্রলােকের মাথা ভর্তি টাক। এরকম টেকো মাথার কাউকে ফুপু তার পাত্র | হিসেবে ঠিক করবেন তা ভাবা যায় না। তাছাড়া পাত্ররা কখনাে 

হাসপাতালে ডিউটি দেয় না। তারা ভাব ধরে দূরে থাকে। হাসপাতালে ডিউটি দেয় গরিব প্রেমিকরা। 

মীরুর ঘন ঘন হাই উঠছে। বাবাকে নিয়ে তার খুব টেনশান গিয়েছে। এখন টেনশানমুক্ত বলে হঠাৎ শরীর ছেড়ে দিয়েছে। যেভাবে তার হাই 

উঠছে গাড়ির মধ্যেই ঘুমিয়ে পরা বিচিত্র না। মীরু ঘুম কাটানাের জন্যেই কথা বলা শুরু করল—আপনার নামটা ভালাে না, এটা কি আপনি জানেন? 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১০)

মানুষটা কথা শুনে হাসল তবে মীরুর দিকে তাকাল না। সামনের দিকে তাকিয়ে বলল, কেন ভালাে না? 

নাসের নামের সঙ্গে টাক মাথা মানায় না। নাসের নাম শুনলে মনে হয়। মানুষটার মাথা ভর্তি চুল। 

ও আচ্ছা। এই নাম ছাড়া আপনার অন্য কোনাে নাম নেই? আমার ডাক নাম জাহাঙ্গীর। 

মােঘল বাদশার নামে যে নাম সেই নাম ডাক নাম হবে কেন? আপনার পােশাকি নাম হওয়া উচিত জাহাঙ্গীর। ডাক নাম নাসের। বাবা মা আদর করে ডাকবেন নাসু। 

আপনার সাজেশান আমার মনে থাকবে। ডাক নাম এবং পােশাকি নাম। ইন্টারচেঞ্জ করার সুযােগ থাকলে করে ফেলব। আপনি কোথায় যাবেন বললে আমার গাড়ি চালাতে সুবিধা হয়। | সরি আপনাকে বলা হয়নি— আমি যাব মগবাজারে। আমরা কি ভুল পথে চলে এসেছি? 

সামান্য এসেছি। এটা কোনাে ব্যাপার না। আপনার ফুপু বলেছিলেন পথে কোথাও গাড়ি থামিয়ে আপনাকে বেশি চিনি দিয়ে কড়া এক কাপ চা খাওয়াতে। এখন কি খাবেন? এখানে একটা ভালাে রেস্টুরেন্ট আছে। আমার পরিচিত। 

নাসের এক ঝলক মীরুর দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি কোনাে কারণে আমার ওপর বিরক্ত। আপনার বিরক্তি উৎপাদনের মতাে কিছু কি আমি করেছি? আমার মাথায় কোনাে চুল নেই এই কারণেই কি আপনি বিরক্ত? বারবার মাথার চুলের দিকে তাকাচ্ছেন তাই বললাম। 

 মীরু চুল প্রসঙ্গে না গিয়ে হঠাৎ বলল, আচ্ছা শুনুন। আপনি কি সেই ব্যক্তি যার সঙ্গে আমার বিয়ে দেবার জন্য সুলতানা ফুপু প্রায় জীবন বাজি রেখে ফেলেছেন? 

জি। আপনিও মনে হয় আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। 

অপেক্ষা করছি কারণ আপনার ফুপু বলেছেন এই সৌরজগতে আপনার মতাে ভালাে মেয়ে নেই। আপনার ফুপুর কথা আমি খুব বিশ্বাস করি । 

আপনার কি বিশ্বাস হচ্ছে যে আমার মতাে ভালাে মেয়ে সৌরজগতে নেই? 

 

Read more

হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *