হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১২)

আপনার এরকম ধারণা? 

জিগাড়ি যখন খাদে পড়ল তখন যদি হৈচৈ করে আপনার ঘুম ভাঙাতাম, খুব অস্থির হয়ে যেতাম সেটা আপনার অনেক বেশি পছন্দ হত মীরু বলল, ঝুম বৃষ্টিতে গাড়িতে বসে গরম চা খাচ্ছি, সিঙাড়া খাচ্ছিএটা আমার বেশ পছন্দ হচ্ছেচা খাবার পর আমরা কি গাড়িতে বসে থাকব নাকি গাড়ি খাদ থেকে উঠানাের ব্যবস্থাও আপনি করে রেখেছেন?রোদনভরা এ বসন্ত নাসের হাসিমুখে বলল, চা খাবার পর আপনাকে নিয়ে একটা মাইক্রোবাসে উঠবমাইক্রোবাস আনানাে হয়েছে। আমার লােকজন মাইক্রোবাসে বসে আছেতারা এসে খাদে পড়া গাড়ি তুলবেআমরা মাইক্রোবাস নিয়ে চলে যাব। 

মীরু ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনি ঠিকই বলেছেনএত গােছানাে মানুষ মেয়েরা পছন্দ করে নাযখন গরম চা খাচ্ছিলাম তখন আপনাকে ভালাে লাগছিল বিপদ থেকে উদ্ধারের সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন শুনে আর ভালাে লাগছে নাএখন আপনাকে রােবট রােবট লাগছে। 

নাসেরের অফিসের লােকজন ছাতা হাতে চলে এসেছেমীরু কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে তাদের দেখল । তারপর নাসেরের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার কেন জানি গাড়ি থেকে নামতে ইচ্ছা করছে নাআমি কি আরেক কাপ চা খেয়ে তারপর নামতে পারি

অবশ্যই পারেন। 

নাসের কাপে চা ঢেলে এগিয়ে দিলমীরু বলল, আপনাকে অন্যরকম লাগছে কেন অন্যরকম লাগছে বুঝতে পারছি না। 

নাসের বলল, আমাকে অন্যরকম লাগছে কারণ আমি আমার টাক মাথা ঢেকে ফেলেছি। ক্যাপ পরেছি। 

মীরু বলল, আশ্চর্য! এই ব্যাপারটা আমি লক্ষ্য করলাম না কেন

নাসের বলল, আপনার পর্যবেক্ষণ শক্তি খুব ভালাে বলে আপনি লক্ষ্য করেননিযাদের পর্যবেক্ষণ শক্তি খুব ভালাে তারা প্রায়ই খুব কাছের জিনিস দেখতে ভুল করে। 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১২)

মীরু নাসেরের দিকে তাকিয়ে আছে। নাসের কি কোনাে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে কথাগুলি বলেছে? সে-রকম মনে হচ্ছে না। আবার কেন জানি মনে হচ্ছেমীরু বলল, ভালাে কথা, আপনি কি আমার নাম জানেন? 

আপনার নাম মীরু। 

মীরু আমার নাম ঠিকই আছে কিন্তু এই নামটা আমার অপছন্দেরআমার পছন্দের নাম ঐন্দ্রিলা আমার চা খাওয়া শেষ হয়েছেএখন আমি নামব। 

নাসের বলল, আমরা কি আরেকবার বারসাত সাহেবের মেসে খোজ নিয়ে দেখবউনি ফিরেছেন কি না। 

মীরু ক্লান্ত গলায় বলল, না আমি বাসায় যাবআপনার মাথা ধরা কি কমেছে? হ্যা কমেছেযে ভাবে ভুরু কুঁচকে আছেন মনে হচ্ছে না মাথা ধরা কমেছে। 

কমলেও সমস্যা নেইআমি চাচ্ছি না আপনি মাথা ধরা নিয়ে বাসায় যান কি বলতে চাচ্ছেন পরিষ্কার করে বলুননাসের শান্ত গলায় বলল, আপনার সঙ্গে হয়ত আমার আর দেখা হবে না । মাদের শেষ দেখায় হাইফেনের মত থাকবে মাথাব্যথাএই হাইফেনটা না থাকলে হয় না। 

মীরু বলল, আমাকে বাসায় নামিয়ে দিনআমার কথা বলতে ভাল লাগছে না। 

বারসাতের মুখের ওপর অনেকক্ষণ ধরে দুটা মাছি ভন ভন করছেএকটা বড় একটা ছােট। বড়টার রঙ ঘন নীল। বারসাত বিস্মিত চোখে মাছি দুটার দিকে তাকিয়ে আছেবৃষ্টিবাদলার সময় মাছি উড়ে নাবৃষ্টি শুরু হলেই মাছিরা যে যেখানে আছে সেখানে ঝিম ধরে বসে থাকেবৃষ্টির পানি পাখায় লাগলে মাছিদের উড়তে অসুবিধা হয় বলেই তাদের এত সাবধানতা। 

অথচ এই মাছি দুটা উড়েই যাচ্ছেবাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে সেদিকেও তাদের নজর নেইতারা উড়ে উড়ে জানালা পর্যন্ত যাচ্ছে আবার ফিরে এসে বারসাতের নাকের কাছাকাছি ওড়াউড়ি করছেবারসাতের কেন জানি মনে হচ্ছে এই মাছি দুটার একটা (বড়টা যেটার গায়ের রঙ ঘন নীল ) তার নাকের ফুটো দিয়ে ঢুকে পড়ার চেষ্টায় আছেযে কোনাে মুহর্তে এই কাজটা সে করবে। 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১২)

খুবই অদ্ভুত চিন্তাভাবনামাছিরা এমন কাজ কখনাে করবে নাতারা জাপানি কামাকাজি পাইলট নাবারাসাত তাদের শত্রুও নাতারপরেও সে এই চিন্তা মাথা থেকে দূর করতে পারছে নাজ্বর বেশি হলে মানুষের মাথায় উদ্ভট চিন্তা আসে। বারসাতের গায়ে জ্বর বেশ ভালােই জ্বরমাথার ভেতর এরােপ্লেন চলার মতাে শব্দ হচ্ছেজ্বর খুব বেড়ে গেলে মাথার ভেতর এরােপ্লেন চলার মতাে শব্দ হয়এরকম জুরতপ্ত মাথায় উদ্ভট চিন্তা আসতেই পারে| বারসাত শুয়ে আছে তার দূরসম্পর্কের মামার বাগানবাড়িতে। বাড়ির নাম পদ্মকাঠের একতলা বাড়িবড় বড় জানালাজানালা খুললেই 

চোখে পড়ে বাড়ির পেছনের পদ্ম পুকুরপুকুরে সত্যিকার পদ্ম ফুটে আছেমীরু এই বাড়ি দেখলে মুগ্ধ হতসেটা সম্ভব হল নামীরু আসেনি, বারসাতকে একা আসতে হয়েছেবারসাত তিন বেহালাবাদক ঠিক করে রেখেছিল। এরা পদ্ম নামের বাড়ির উঠানে বসে থাকবে। বারসাত এবং মীরুর বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকতে দেখলে বেহালায় বাজাতে থাকবে— 

লীলাবালী লীলাবালী। 

বড় যুবতী কন্যা কি দিয়া সাজাইতাম তরে?

 

Read more

হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-১৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *