হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৫)

হা পরশু। সকাল এগারােটায়। বিয়ের পর পর তবারুক হিসেবে মিনি সিঙাড়া খাওয়ানাে হবে। তারপর আমরা চলে যাব বাগানবাড়ি পদ্মতে । আগে থেকে বেহালাবাদক ঠিক করা থাকবে। আমরা হাত ধরাধরি করে বাড়িতে ঢােকার সঙ্গে সঙ্গে তারা বাজাবে

রোদনভরা এ বসন্ত 

স্কেচ করেছি সবগুলির একটা প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর নাম ‘এ এবং ঐ’ । দর্শক মাত্র দু’জন। তুমি আর আমি। আমি এ তুমি ঐ। ছবির সংখ্যা কত শুনলে তুমি আঁৎকে উঠবে। ছবির সংখ্যা একশ’ সাত। ওয়ান জিরাে সেভেন। 

মীরু বিস্মত হয়ে বলল, বল কি? এত ছবি কখন এঁকেছ? 

যখনই তােমার সঙ্গে দেখা হয়েছে— মেসে ফিরে সঙ্গে সঙ্গে একটা ছবি এঁকে ফেলেছি। 

সত্যি ? তােমার কি মনে হয় মিথ্যা? না মিথ্যা মনে হয় না । 

মীরু আবারও বারসাতের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে চোখে তাকিয়ে থাকার পুরানাে খেলা। এই খেলায় সে আজ হেরে যাবে কারণ তার চোখে পানি জমতে শুরু করেছে। চোখ ভর্তি পানি নিয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকা যায় না। 

বারসাত বিস্মিত হয়ে বলল, কাঁদছ কেন ‘ঐ’? 

মীরু বলল, তােমার সঙ্গে আমার আরাে একটা চুক্তি হয়েছিল, সেই চুক্তির শর্ত ছিল আমি যদি কখনাে কাঁদি তুমি জিজ্ঞেস করতে পারবে না কেন কাঁদছি। কান্নাটাই একটা লজ্জার ব্যাপার। কেন কাঁদছি তা ব্যাখ্যা করা আরাে লজ্জার। এ রকম হা করে তাকিয়ে আছ কেন? 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৫)

বারসাত বলল, আমি তােমার অনেক ছবি এঁকেছি, এখন লক্ষ্য করলাম সবচে’ সুন্দর ছবিই আঁকিনি। চোখে চকচক করছে অশ্রু এই ছবি। তুমি চুপ করে পাঁচটা মিনিট বস তাে। জানালার দিকে তাকিয়ে বস। টেবিলের ড্রয়ারে দেখ কাগজ আছে পেনসিল আছে। দাও আমাকে। অশ্রুবতীর ছবি একে দিচ্ছি।। 

মীরু সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। বারসাতের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি পরশু এগারােটায় উপস্থিত থাকব। সঙ্গে করে একজন সাক্ষী নিয়ে আসব। একজনের খুব শখ আমার বিয়েতে সাক্ষী হিসেবে থাকা । 

বারসাত বলল, মীরু তুমি চাইলেও এখন যেতে পারবে না। কারণ বৃষ্টি নেমেছে । ঝুমঝুমান্তি বৃষ্টি। 

কি বৃষ্টি? 

লীলাবালি লীলাবালি বড় যুবতী কন্যা কি দিয়া সাজাইবাম তােরে। 

মীরু তাকিয়ে আছে। উৎসাহ এবং আনন্দে বারসাত ঝলমল করছে । তার চেহারায় যে অসুস্থ ভাব ছিল সেটা এখন আর নেই। বারসাতের ঝলমলে মুখ দেখতে ভাল লাগছে। 

বারসাত বলল, পদ্ম নামের ঐ বাড়িতে যে ছবির একটা এক্সিবিশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এটা কি তুমি জানাে? 

আমার কি জানার কথা? না তােমার জানার কথা না। কারণ এটা রাখা হয়েছিল তােমাকে চমকে দেবার জন্যে। সারপ্রাইজ আইটেম। আমি বিভিন্ন সময়ে তােমার যে কয়টা 

বারসাত বলল, মীরু আমাকে মনে করিয়ে দিও তাে আমি আবহাওয়া অফিসে খোজ নেব আজ কত ইঞ্চি বৃষ্টি হল। 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৫)

মীরু বলল, বৃষ্টি কত ইঞ্চি হয়েছে তার খোঁজের দরকার কি? 

বারসাত বলল, আজ একটা বিশেষ দিন। আজ আমাদের বিয়ে । বিয়ের দিন কত ইঞ্চি বৃষ্টি হল আমরা জানব না? 

ঝুমঝুমান্তি বৃষ্টি। যে বৃষ্টিতে ঝুমঝুম করে নুপূরের শব্দ হয় সেই বৃষ্টির নাম ঝুমঝুমান্তি বৃষ্টি ।। 

তুমি যে খুব সুন্দর করে কথা বল এটা কি তুমি জানাে? জানি। বিয়ের পরেও কি তুমি এত সুন্দর করে কথা বলবে? বুঝতে পারছি না। মীরু বলল, তােমার শরীর যদি খুব বেশি খারাপ না লাগে তাহলে উঠ! কোথায় যাব? আমার ক্ষিধে লেগেছে। মিনি সিঙাড়া খাব। এই বৃষ্টিতে? গরম গরম সিঙাড়া তাে বৃষ্টিতেই খেতে ভাল লাগবে । 

মীরুদের বিয়ে হল না। প্রধান কাজি গিয়েছেন ফরিদপুরে মেয়ের বাড়িতে। দ্বিতীয় কাজি কোথায় যেন বিয়ে পড়াতে গেছেন। কখন ফিরবেন কেউ বলতে পারে না। 

সত্যি সত্যি ঝুমঝুমান্তি বৃষ্টি। আজ মনে হচ্ছে ঢাকা শহর বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাবে। বারসাত ফুর্তিমাখা গলায় বলল, সিঙাড়া খাবার পর আমরা ঢাকা শহরে রিকশায় করে ঘুরে বেড়াব। বর্ষা যাপন করব। 

মীরু বলল, আমার সঙ্গে টাকা আছে। সিঙাড়া খেয়ে আমরা কাজি অফিসে যাব। তুমি কি দু’জন সাক্ষী জোগাড় করতে পারবে না? সিঙাড়ার কারিগরকে যদি বলি সে কি আমাদের বিয়েতে সাক্ষী হবে? 

বারসাত বলল, OK. আজ আমাদের বিয়ে। 

রিকশাওয়ালা তাকালাে পেছন দিকে। বারসাত বলল, ভাই আপনার নামটা কি শুনি।। 

রিকশাওয়ালা বলল, আমার নাম মজনু। 

বারসাত বলল, অসম্ভব সুন্দর নাম। লাইলী নামের মেয়েটির খুব পছন্দের নাম। ভাই শুনুন, আমরা দু’জন আজ বিয়ে করতে যাচ্ছি। আপনি একজন সাক্ষী। অসুবিধা আছে? 

রিকশাওয়ালা জবাব দিল না। বৃষ্টির পানিতে রাস্তা ডুবে গেছে। তাকে খানাখন্দ এড়িয়ে রিকশা চালাতে হচ্ছে। প্যাসেঞ্জারের খেজুরে আলাপ শােনার সময় নাই

 

Read more

হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৬)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *