হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৭)

জাহেদা কেঁদে ফেললেন। মীরু মা’র হাত ধরে বলল, বাবাকে রাজি করাও। বাবাকে গিয়ে বল— “মীরু একটা ছেলেকে বিয়ে করতে চাচ্ছে। ছেলে বেকার। হতদরিদ্র।” বাবা যদি তাতেই রাজি থাকে তাহলে আমি খুবই খুশি মনে বেনারসি শাড়ি পরে বিয়ে করব। বাবাকে বলতে পারবে?

রোদনভরা এ বসন্ত 

জাহেদা কিছু বললেন না। চোখ মুছতে থাকলেন। মীরু বলল, এত মন খারাপ করাে না তাে মা। “যা হবার হবে। কে সারা সারা।” এসাে আমরা হাসি। ছাদে যাবে? চল ছাদে যাই। ছাদের ঘুম সােফায় তুমি শুয়ে থাকবে। আমি তােমার চুল টেনে দেব । যাবে? | জাহেদা এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন, বিয়ের পর তুই কী করবি? রুনির মতাে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবি? 

মীরু শান্তগলায় বলল, আমার চলে যাবার জায়গা নেই মা। ওর হাতে একেবারেই টাকা-পয়সা নেই। ঘর ভাড়া করে আমাকে নিয়ে থাকার তাে প্রশ্নই ওঠে না। আমাকে তােমাদের সঙ্গেই কুমারী মেয়ে সেজে থাকতে হবে। মাঝে মধ্যে স্বামীর সঙ্গে তার মেসে দেখা করতে যায়। 

এইভাবে কতদিন থাকবি? 

যতদিন থাকা যায়। মা তুমি কি আমাকে এইভাবে থাকতে দেবে? না কি বাবার কাছে আমাকে ধরিয়ে দেবে? 

ধরিয়ে দেব কেন? 

স্বামীর কাছে ভালাে সাজার জন্যে ধরিয়ে দেবে। আদর্শ স্ত্রী সাজতে যাবে। তােমার জীবনের লক্ষ্য হল আদর্শ স্ত্রী হওয়া। আদর্শ মা হওয়া না। 

আমার সম্বন্ধে তাের এত খারাপ ধারণা? 

হ্যা মা তােমার সম্পর্কে আমার খুবই খারাপ ধারণা। রুনি আপু যে গােপনে বিয়ে করেছে সেই খবরটা বাবাকে তুমি দিয়েছ। আমি তােমার কী নাম দিয়েছি শুনতে চাও? আমি তােমার নাম দিয়েছি তালেবান মা। বাবার সব কথায় তুমি তাল দাও বলেই তুমি তালেবান। 

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৭)

আমি তালেবান? 

ছেলেটা কে? বারসাত নাম।। কাজি অফিসে বিয়ে করছিস? 

কাজি অফিস ছাড়া উপায় কি? তােমরা কি কমুনিটি সেন্টারে আমার বিয়ে দেবে? 

হা তুমি তালেবান। বাবা যখন ঘুষ খায় তখন তুমি বল, অফিসের সবাই ঘুষ খায়। তাের বাবা একা যদি না খায় সে একঘরে হয়ে যাবে। তার চাকরি চলে যাবেচাকরি বাঁচানাের জন্যেই তার ঘুষ খাওয়া দরকার বলনি এমন কথা? | জাহেদা ঘর থেকে বের হয়ে গেলেনমীরু বাথরুমে ঢুকলচোখে মুখে পানি দিলরান্নাঘরে ঢুকে নিজের জন্যে এক কাপ চা বানালচায়ের কাপে দুই চুমুক দেয়ার পর আফজল সাহেব ডাকলেন, মরিয়মমরিয়ম। 

মীরু চায়ের কাপ রেখে উঠে দাঁড়ালআফজল সাহেব আবারাে ডাকলেন, মরিয়ম। 

মীরু বলল, বাবা আমি আসছিএকটা টেলিফোন করে আসছিটেলিফোন পরে হবে আগে শুনে যা।। 

এত ব্যস্ত হয়াে না বাবা আমি আসছিটেলিফোন করতে এক মিনিট লাগবে। 

মীরু টেলিফোনের ডায়াল ঘুরালসুলতানা ফুপুকে টেলিফোন করা দরকারনামাজে দাঁড়িয়ে পড়লে এক-দেড় ঘণ্টা তাকে আর পাওয়া যাবে । 

হ্যালাে ফুপু। 

ফুপু তুমি টেলিফোন নাম্বারটা দাওআমার হাতে বেশি সময় নেইবাবা ডাকছেন। 

তুই আমার এখানে কখন আসবি? এই ধর ঘণ্টা খানিকবাড়িতে কি কোনাে সমস্যা হয়েছে

মীরু বলল, আমি যে পরশু সকাল এগারােটায় গােপনে একজনকে বিয়ে করতে যাচ্ছি এই খবরটা মাকে বলেছিলামআমার ধারণা মা বাবাকে গিয়ে বলেছেনযে কারণে বাবা ব্যস্ত হয়ে আমাকে তলব করেছেন। 

তুই বারসাতকে বিয়ে করছিস? হুনাসেরের টেলিফোন নাম্বার দরকার কেন? সাক্ষী লাগবে না? উনি হবেন আমার দিকের সাক্ষী। 

আমি জীবনে অনেক মেয়ে দেখিছিতাের মতাে অদ্ভুত মেয়ে দেখিনিমীরু বলল, বারসাতের সঙ্গে যখন তােমার পরিচয় হবে তখন তুমি বলবে— আমি অনেক অদ্ভুত ছেলে দেখেছি কিন্তু বারসাতের মতাে অদ্ভুত ছেলে দেখিনিআমিও অদ্ভুত সেও অদ্ভুত! অদ্ভুত অদ্ভুতে ধূল পরিমাণ।

রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৭)

জাহেদা এসে ঘরে ঢুকলেনমীরু টেলিফোন নামিয়ে রেখে বলল, মা কিছু বলবে? | জাহেদা বললেন, তাের বাবা তােকে ডাকছে তুই যাচ্ছিস না কেন

মীরু বলল, তুমি কি বাবাকে পরশু সকালে কী ঘটতে যাচ্ছে সেটা বিস্তারিতভাবে বলেছ

জাহেদা চুপ করে রইলেনমীরু বলল, বাবার সঙ্গে আমি দেখা করব তিনি হার্টের রােগীচিৎকার চেঁচামেচি করে একটা সমস্যা তৈরি করবেনআমি নিঃশব্দে পালিয়ে যাব তােমার কাছে টাকা-পয়সা থাকলে আমাকে দাও। 

 

Read more

হুমায়ন আহমেদ এর রোদনভরা এ বসন্ত (পর্ব-২৮)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *