সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১১)

নয়ন রহস্য

বিষুদবারের সকাল। গতকালই চতুলেভিীর সঙ্গে সকলে কাটিয়েছি আমরা। বেশ বুঝতে পারছি ব্যাপারটা ক্রমে এক্সাইটিং হয়ে আসছে, তাই বােধহয় জটায়ু তাঁর অভ্যাসমতাে নটায় না এসে সাড়ে আটটায় এসেছেন।ভদ্রলােক কাউচে বসতেই ফেলুদা বলল, ‘আজ কাগজে খবরটা দেখেছেন? ‘কোন কাগজ ? ‘স্টেটসম্যান, টেলিগ্রাফ, আনন্দবাজার…’ ‘মশাই, এক কাশ্মিরী শালওয়ালা এসে সকালটা একেবারে মাটি করে দিয়ে গেল । কাগজ-কাগজ কিছু দেখা হয়নি। কী খবর মশাই ? 

আমি আগেই কাগজ পড়েছি, তাই খবরটা জানতাম । ‘তেওয়ারি সিন্দুক খুলেছিলেন, বলল ফেলুদা, ‘আর খুলে দেখেন সত্যিই তার মধ্যে একটি কপর্দকও নেই। | ‘তাহলে ত নয়ন ঠিকই বলেছিল, চোখ বড় বড় করে বললেন জটায়ু। ‘চুরিটা কখন হয় ? ‘দুপুর আড়াইটা থেকে সাড়ে তিনটার মধ্যে। অন্তত তেওয়ারির তাই। ধারণা। সেই সময়টা তিনি আপিসে ছিলেন না। ছিলেন তাঁর ডেনটিস্টের চেম্বারে ।

ভদ্রলােকের স্মরণশক্তি এখন ভালাে কাজ করছে । দুদিন আগেই নাকি উনি সিন্দুক খুলেছিলেন, তখন সব কিছুই ছিল । টাকার অঙ্কও মনে পড়েছে পাঁচ লাখের কিছু উপরে । তেওয়ারি অবিশ্যি তাঁর পার্টনারকেই সন্দেহ করছেন। বলছেন একমাত্র তাঁর পার্টনারই নাকি কম্বিনেশনটা জানত। এছাড়া আর কাউকে কখনাে বলেননি। | এই পার্টনারটি কে ? | ‘নাম হিঙ্গোবানি। টি এইচ সিন্ডিকেটের টি হলেন তেওয়ারি আর এইচ হিলোবানি। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-১১)

 ‘যাকগে। তেওয়ারি, হিংটিংছট,এসবে আমার কোনাে ইন্টারেস্ট নেই । আমি খালি ভাবছি ওই পুঁচকে ছেলে এমন ক্ষমতা পেলে কি করে ? | ‘আমিও সে কথা অনেকবার ভেবেছি। ব্যাপারটা প্রথম কী করে আবিষ্কার হয় সেটা জানার খুব আগ্রহ হচ্ছে। তােপশে, নয়নের বাড়ির রাস্তাটার নাম তাের মনে আছে?” ‘নিকুঞ্জবিহারী লেন। কালীঘাট। ‘গুড । ‘একবার যাবেন নাকি মশাই ? বলা যায় না, আমার ড্রাইভার কলকাতার এমন সব রাস্তা চেনে যার নামও আমি কস্মিনকালে শুনিনি। 

সত্যিই দেখা গেল হরিপদবাবু নিকুঞ্জবিহারী লেন চেনেন। বললেন, ‘ও রাস্তায় ত পন্টু দত্ত থাকতেন। আমি তখন অজিতেশ সাহার গাড়ি চালাই। একদিন তাঁকে নিয়ে গেলুম পন্টু দত্তর বাড়ি। দুজনেই ত ফুটবলার, তাই খুব আলাপ। | দশ মিনিটের মধ্যে নিকুঞ্জবিহারী লেনে পৌঁছে একটা পানের দোকানে জিজ্ঞেস করে জানলাম অসীম সরকার থাকেন আট নম্বরে। 

 আট নম্বরের দরজায় টোকা দিতে একজন রােগা, ফরসা ভদ্রলােক দরজা খুলে আমাদের সামনে দাঁড়ালেন। বুঝলাম তিনি সবেমাত্র দাড়ি কামাননা শেষ করেছেন, কারণ হাতের গামছা দিয়ে গাল মােছা এখনাে শেষ হয়নি। ‘আপনারা? ভদ্রলােক ফেলুদার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিলেন। আপনি কি আপিসে বেরােচ্ছেন ? ‘আজ্ঞে না। এখন ত ৯টা । আমি বেরােই সাড়ে নটায়। ফেলুদা বলল, “আমরা গত রবিবার তরফদারের ম্যাজিক দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানে আপনার ছেলের–আপনিই ত অসীম সরকার ?

নয়ন রহস্য (পর্ব-১১)

‘আজ্ঞে হাঁ।’ ‘আশ্চর্য অলৌকিক ক্ষমতা আপনার ছেলের। তফদারের সঙ্গে আমাদের বেশ ভালাে আলাপ হয়েছে । তাঁর কাছেই আপনার বাড়ির হদিস পেলাম। এই দেখুন, আমরা কে তাই বলা হয়নি :–ইনি রহস্য রােমাঞ্চ উপন্যাস লেখক জটায়ু, এ আমার ভাই তপেশ, আর আমি প্রদোষ মিত্র। 

‘প্রদোষ মিত্র ? ভদ্রলােকের চোখ কপালে। সেই বিখ্যাত গােয়েন্দা প্রদোষ মিত্র—যাঁর ডাক নাম ফেলু ? “আজ্ঞে হ্যা। ফেলুদা বিনয়ের অবতার। ‘ভেতরে আসুন, ভেতরে আসুন—কী আশ্চর্য ! আমরা ভদ্রলােকের পিছন পিছন ভিতরে গিয়ে একটা সরু প্যাসেজের বাঁ দিকের দরজা দিয়ে একটা ছােট্ট ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। সেটাকে শােবার ঘর বসবার ঘর দুইই বলা চলে। দুটো চেয়ার আর একটা তক্তপােষ ছাড়া ঘরে কোনও আসবাব নেই।

তক্তপােষের এক প্রান্তে সতরঞ্চি দিয়ে গােটানাে একটা বালিশ দেখে বােঝা যায় সেখানে কেউ শােয় । ফেলুদা আর জটায়ু চেয়ারে, অসীমবাবু আর আমি খাটে বসলাম। ফেলুদা বলল, আপনার বেশি সময় নেবাে নাআমাদের আসার কারণটা বলিসেদিন তরফদারের শােতে আপনার ছেলের আশ্চর্য ক্ষমতা দেখে আমাদের কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল

শশায়ের পর তরফদারকে জিজ্ঞেস করাতে উনি বলেন ছেলেটি তাঁর কাছেই থাকেআমি জানতে চাই যে নয়নের বাসস্থান পরিবর্তনের প্রস্তাবটা কি তরফদার করেন, না আপনি করেন আপনি মহামান্য ব্যক্তি, আপনার কাছে মিথ্যা বলব না। ওর বাড়িতে রাখার প্রস্তাবটা তরফদার মশাইকরেন, তবে তার আগে নয়নকে আমিই ওঁর কাছে নিয়ে যাই

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১২)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *