‘সেটা কবে ? ‘ওর ক্ষমতা প্রকাশ পাবার তিনদিন পরে—দেসরা ডিসেম্বর। ‘এই সিদ্ধান্তের কারণটা কী ? এর একটাই কারণ, মিত্তির মশাই। আমার বাড়ি দেখেই বুঝতে পারছেন আমার টানাটানির সংসার। আমার চারটি সন্তান। বড়টি ছেলে, সে বি কম পড়ছে । তার খরচ আমাকে জোগাতে হয়। তারপর দুটি মেয়ে। তাদেরও ইস্কুলের খরচ আছে। নয়নকে এখনাে ইস্কুলে দিইনি।
আমি এই কালীঘাট পোেস্ট আপিসেই সামান্য চাকরি করি। পুঁজি বলতে কিছুই নেই ; যা আনি তা নিমেষেই খরচ হয়ে যায় ; ভবিষ্যতের কথা ভেবে গা–টা বারবার শিউরে ওঠে। তাই নয়নের মধ্যে যখন হঠাৎ এই ক্ষমতা প্রকাশ পেল তখন মনে হল—একে দিয়ে কি দু‘পয়সা উপার্জন করানাে যায় না ? কথাটা শুনতে হয়ত খারাপ লাগবে কিন্তু আমার যা। অবস্থা, তাতে এমন ভাবাটা অস্বাভাবিক নয়, মিত্তির মশাই।‘
‘সেটা আমি বুঝতে পারছি‘, বলল ফেলুদা। এর পরেই আপনি নয়নকে তরফদারের কাছে নিয়ে যান ? | ‘আজ্ঞে হ্যা । আমার ত টেলিফোন নেই, তাই আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে পারিনি, সােজা চলে যাই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। ভদ্রলােক নয়নের ক্ষমতার দুএকটা নমুনা দেখতে চাইলেন। আমি বললুম, ওকে এমন কিছু জিজ্ঞেস করুন যার উত্তর নম্বরে হয় ।
নয়ন রহস্য (পর্ব-১২)
ভদ্রলােক নয়নকে বললেন, “আমার বয়স কত বলতে পার ?” নয়ন তক্ষুনি জবাব দিল—তেত্রিশ বছর তিন মাস দশ দিন। এর পরে আর কোনাে প্রশ্ন করেননি তরফদার। আমাকে বললেন—আমি যদি ওকে মঞ্চে ব্যবহার করি তাতে আপনার কোনাে আপত্তি আছে ? আমি অবশ্যই পারিশ্রমিক দেবাে–আমি রাজি হয়ে গেলুম। তরফদার জিজ্ঞেস করলেন––আপনি কত আশা করেন ? আমি ভয়ে ভয়ে বললুম–মাসে এক হাজার। তরফদার বললেন, “ভুল হল । আমার মাথায় কী নম্বর আছে বলত,নয়ন ?” নয়ন বলল—তিন শূন্য শুন্য ৩৮
শূন্য। —সে ভুল বলেনি, মিত্তির মশাই। তরফদার মশাইও তাঁর কথা রেখেছেন। আগাম তিন হাজার আমি এরই মধ্যে পেয়ে গেছি। আর ভদ্রলােক যখন আমাকে বাঁচবার পথ দেখিয়ে দিলেন, তখন নয়নকে তাঁর বাড়িতে রাখার প্রস্তাবেই বা কি করে না বলি ? কিন্তু নয়ন কি স্বেচ্ছায় গেল ? | ‘সেও এক তাজ্জব ব্যাপার। এক কথায় রাজি হয়ে গেল। এখন ত ও দিব্যি আছে। ‘এইবারে আরেকটা প্রশ্ন করছি‘, বলল ফেলুদা, ‘তাহলেই আমাদের কাজ শেষ।
বলুন। ‘ওর ক্ষমতার প্রথম পরিচয় আপনি কী করে পেলেন ? | ‘খুব সহজ ব্যাপার। একদিন সকালে উঠে নয়ন বলল—“বাবা, আমার চোখের সামনে অনেক কিছু গিজ গিজ করছে। তুমি সেরকম দেখছ ?” আমি বললাম, “কই, না ত! কী গিজ গিজ করছে ?” নয়ন বলল, “এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয় শূন্য।
নয়ন রহস্য (পর্ব-১২)
সব এদিকে ওদিকে ঘুরছে, ছুটছে, লাফাচ্ছে, ডিগবাজি খাচ্ছে। আমার মনে হয় আমাকে যদি, নম্বর নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস কর তাহলে ওদের ছটফটানি থামবে।”—আমার পুরােপুরি বিশ্বাস হচ্ছিল না, তাও ছেলের অনুরােধ রাখতে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার একটা খুব মােটা লাল বাঁধানাে বাগুলা বই আছে জান ত ?” নয়ন বলল, “মহাভারত ?” আমি বললাম, “হ্যা ।
সেই বইয়ে কত পাতা আছে বলত।” নয়নের মুখে হাসি ফুটল। বলল, “ছটফটানি থেমে গেছে। সব নম্বর পালিয়ে গেছে । খালি তিনটে নম্বর পর পর দাঁড়িয়ে আছে।” কী নম্বর জিজ্ঞেস করাতে নয়ন বলল, “নয় তিন চার।” আমি তাক থেকে কালী সিংহের মহাভারত নামিয়ে খুলে দেখি তার পৃষ্ঠা সংখ্যা সত্যি ৯৩৪।‘
আমাদের কাজ শেষ, আমরা ভদ্রলােককে বেশ ভালােরকম ধন্যবাদ দিয়ে বাড়িমুখাে রওনা দিলাম। শ্রীনাথ দরজা খুলে দিতে বসবার ঘরে ঢুকেই দেখি দুজন ভদ্রলােক বসে আছেন। তার মধ্যে সুনীল তরফদারকে চিনি। অন্যজনকে আগে দেখিনি।
নয়ন রহস্য (পর্ব-১২)
ফেলুদা ব্যস্ত ভাবে বলল, “সরি। তােমরা কি অনেকক্ষণ এসেছ ? ‘পাঁচ মিনিট‘, বললেন তরফদার । এ হচ্ছে আমার ম্যানেজার ও প্রধান সহকারী—শঙ্কর হুবলিকার। তরফদারের মতাে বয়স, বেশ চালাক চেহারা, উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের নমস্কার করলেন। ‘আপনি ত মারাঠি ? প্রশ্ন করল ফেলুদা । ‘ইয়েস স্যার। তবে আমার জন্ম, স্কুলিং, সবই এখানে।
বসুন, বসুন। আমরা সবাই বসলাম। ‘কী ব্যাপার বলুন’, তরফদারকে উদ্দেশ করে বলল ফেলুদা। ব্যাপার গুরুতর। ‘মানে ? ‘কাল আমাদের বাড়িতে দৈত্যের আগমন হয়েছিল।আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। সেই গাওয়াঙ্গির কথা বলছেন নাকি ভদ্রলােক ? ‘ব্যাপারটা খুলে বল, বলল ফেলুদা।। ‘বলছি।’ বললেন ভদ্রলােক। আজ ঘুম থেকে উঠে বাদশাকে নিয়ে হাঁটতে বেরােব—তখন সাড়ে পাঁচটা-~দোতলা থেকে নেমেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম।‘কেন ?
Read More
