সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২০)

নয়ন রহস্য

মিঃ রেড্ডির তরফ থেকে যেটুকু পাবলিসিটি না করলেই নয়, সেটুকু তিনি করবেন ; কিন্তু তােমরা—তুমি বা শঙ্কর পাবলিসিটির ধারেকাছেও যাবে না। প্রেস পীড়াপীড়ি করলেও তাদের কাছে তােমরা মুখ খুলবে না। তােমার এই সফর যদি সাক্সেসফুল হয়, তাহলে সেটা হবে নয়নের জোরে, তােমাদের পাবলিসিটির জোরে নয় । বুঝেছ ? বুঝেছি স্যার। 

ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে লালমােহনবাবুকে ঘটনাটা বলতে উনি বললেন, ‘ঠিক এইটেরই দরকার ছিল । ভয় হচ্ছিল যে মাদ্রাজে এসে বুঝি কেসটা থিতিয়ে যাবে। তা নয়—এখন আবার দিব্যি জমে উঠেছে। ঠিক হয়েছিল দশটার সময় আমরা দুটো ট্যাক্সি নিয়ে বেরােব। মহাবলীপুরম আজ নয়, কাল। আজ যাব মেক পার্ক দেখতে ।

হুইটেকার নামে এক আমেরিকানের কীর্তি এই স্নেক পার্ক | গাছপালায় ভরা পার্কও বটে, আবার সেই সঙ্গে সাপের ডিপােও বটে। যাবার জন্য তৈরী হচ্ছি, লালমােহনবাবু অলরেডি তৈরী হয়ে আমাদের ঘরে এসে হাজির, এমন সময় দরজার বেল বেজে উঠল । দরজা খুলে দেখি মিঃ হিঙ্গেয়ানি।। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-২০)

‘মে আই কাম ইন? টি ভিটা খােলা ছিল, যদিও দেখবার মতাে কিছুই হচ্ছিল না, ফেলুদা সেটা বন্ধ করে দিয়ে বলল, “নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই প্লীজ কাম ইন। ভদ্রলােক ঘরে ঢুকে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে কাউচে বসে বললেন, ‘সাে ফার—নাে ট্রাবল। এ তাে সুসংবাদ, বলল ফেলুদা। ‘আমার বিশ্বাস তেওয়ারি আমার ম্যাড্রাসে আসার খবরটা জানে না। আমি কাউকে না বলে চলে এসেছি।’ 

‘আপনি নিজে সাবধানে আছেন ত ? ‘তা আছি।’ ‘একটা কথা আমি খুব জোর দিয়ে বলছি—আপনি যখন ঘরে থাকবেন, তখন কেউ বেল টিপলে আপনি নাম জিজ্ঞেস করে গলা চিনে তারপর দরজা খুলবেন, তার আগে নয়। হিঙ্গারানি কিছু বলার আগেই আমাদের দরজার বেল বেজে উঠল। খুলে দেখি ময়নকে নিয়ে তরফদার হাজির। ‘এসাে ভিতরে, বলল ফেলুদা। ‘এই সেই অদ্ভুত ক্ষমতা সম্পন্ন বালক কি ? দুজনে ঘরে ঢুকতে জিজ্ঞেস করলেন হিঙ্গোয়ানি। 

ফেলুদার দিকে চেয়ে দেখি তার ঠোঁটের কোণে হাসি। ‘আপনার সঙ্গে এই দুজনের পরিচয় করিয়ে দেবার কোনাে প্রয়ােজন। আছে কি ? হিঙ্গোরানিকে প্রশ্ন করল ফেলুদা। ‘হােয়াট ডু ইউ মীন ? ‘মিঃ হিঙ্গারানি, আপনি আমাকে আপনার নিরাপত্তার জন্য নিযুক্ত করেছেন। এখানে আপনাকে মনে রাখতে হবে যে গােয়েন্দার কাছ থেকে মলে যদি কোনাে জরুরি তথ্য গােপন করেন তাহলে গােয়েন্দার কাজটা আরাে অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-২০)

‘আপনি কী বলতে চাইছেন ?  ‘সেটাও আপনি খুব ভালাে করেই জানেন, কিন্তু না-জানার ভাণ করছেন। অবিশ্যি সত্য গােপন করার অভিযােগ শুধু আপনার বিরুদ্ধেই  যােজ্য নয়। এর বিরুদ্ধেও বটে। ফেলুদা শেষ কথাটা তরফদারকে উদ্দেশ করে বলল । তরফদার কিছু বলতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল।‘আপনারা যখন মুখ খুলছেন না, তখন আমিই বলি। ফেলুদার দৃষ্টি এখনাে তরফদারের দিকে। ‘সুনীল, তুমি একজন পৃষ্ঠপােষকের কথা বলছিলে।

আমি কি অনুমান করতে পারি যে মিঃ হিঙ্গোরানিই সেই পৃষ্ঠপােষক ? হিরােনি চোখ কপালে তুলে চেয়ার থেকে প্রায় অর্ধেক উঠে পড়ে বললেন, ‘বাট হাউ ডিড ইউ নাে ? এও কি ম্যাজিক ? | ‘না, মিঃ হিঙ্গোরানি, ম্যাজিক নয়। এ হচ্ছে ইন্দ্রিয়গুলিকে সজাগ রাখার ফল। আমরা গােয়েন্দারা সাধারণ লােকের চেয়ে একটু বেশি দেখি, বেশি শুনি। 

কী দেখে বা শুনে আপনি এই তথাটা আবিষ্কার করলেন ? ‘গত রবিবার তরফদারের ম্যাজিক শাে-তে এক যুবকের প্রশ্নের উত্তরে এই জ্যোতিষ্ক দুটো গাড়ির নম্বর বলে দেয়। তার মধ্যে একটা নম্বর-ডব্লিউ এম এফ ছয় দুই তিন দুই–দেখলাম আপনার গ্যারাজের সামনে দাঁড়ানাে কনটেসার নম্বর। এই যুবক কি আপনার বাড়ির লােক নন। এবং তিনি শাে থেকে ফিরে এসে কি আপনাকে জ্যোতির আশ্চর্য ক্ষমতার কথা বলেননি ? ‘ইয়েস, বলেছিল । মােহন, আমার ভাইপাে’ হিগোরানির কেমন যেন হতভম্ব ভার। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-২০)

‘আরেকটা ব্যাপার আছে, বলল ফেলুদা ।সেদিন আপনার ড্রইংরুমের বুক কেসে দেখলাম পুরাে একটা তাকভর্তি ম্যাজিকের বই। তার মানে | ‘ইয়েস, ইয়েস, ইয়েস! ফেলুদাকে বাধা দিয়ে বললেন হিরােনি। ‘ওগুলাের মায়া আমি কাটিয়ে উঠতে পারিনি। বাবা আমার ম্যাজিকের সব  সরঞ্জাম ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু বই ফেলেননি। তরফদারের দিকে চেয়ে দেখি তাঁর শােচনীয় অবস্থা ।

‘তরফদারকে কোনাে দোষ দেবেন না, মিঃ মিটার’, বললেন হিঙ্গোরানি। ও আমারই অনুরােধে আমার নামটা প্রকাশ করেনি।‘কিন্তু এই গােপনতার কারণ কী ? ‘একটা বড় কারণ আছে, মিঃ মিটার। ‘আমার বাবা এখনাে জীবিত ; ফৈজাবাদে থাকেন, আমাদের পৈতৃক বাড়িতে। বিরাশি বছর বয়স। কিন্তু এখনাে টনটনে জ্ঞান, মজবুত শরীর। তিনি যদি জানেন যে এতদিন বাদে আমি আবার ম্যাজিকের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছি, তাহলে তিনি আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করবেন। 

ফেলুদা ভূকুটি করে বার তিনেক মাথা উপর-নীচ করে বলল, ‘বুঝেছি। হিগোরানি বলে চললেন, ‘মােহন শাে দেখে ফিরে এসেই এই ছেলের অসামান্য ক্ষমতার কথা আমাকে বলে। তখনই আমার মাথায় আসে আমি এই যাদুকরের শাে ফাইনান্স করব। যখন থেকে তেওয়ারির সঙ্গে মন কষাকষি শুরু হয়েছে, তখন থেকেই বুঝতে পারছিলাম যে আমাকে অবিলম্বে টি এইচ, সিন্ডিকেটের পার্টনারশিপে ইস্তফা দিয়ে রােজগারের নতুন রাস্তা দেখতে হবে। রবিবার রাত্রে জ্যোতিষ্কর কথা শুনে সােমবার সকালেই আমি তরফদারের বাড়িতে গিয়ে আমার প্রস্তাবটা দিই ।

নয়ন রহস্য (পর্ব-২০)

তরফদার রাজি হয়ে যায়। এর দুদিন বাদেই তেওয়ারির টাকা চুরি ধরা পড়ে এবং আমার সঙ্গে তার সংঘর্ষ সপ্তমে চড়ে । আমি আর থাকতে না পেরে তেওয়ারিকে একটা চার লাইনের চিঠিতে জানিয়ে দিই যে আমি অসুস্থ। ডাক্তারের প্রস্তাব মতাে একমাসের অবসর নিচ্ছি । তার পরদিন থেকেই আমি আপিসে যাওয়া বন্ধ করি। ‘তার মানে আপনি এমনিতেই মাদ্রাজে আসছিলেন তরফদারের শাে-য়ের জন্য ? ‘হ্যা, কিন্তু আমার বিপদের আশঙ্কাটাও সম্পূর্ণ সত্যি। অর্থাৎ আপনার সাহায্য আমাকে নিতেই হত। 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *