সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২৫)

নয়ন রহস্য

বন্ধুকে ডেকে তেওয়ারি বলে, ‘আমি মরে গেলে আমার সিন্দুক কী করে খােলা হবে ? হিঙ্গোরানি ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু তেওয়ারি জোর করে তাকে নম্বরটা নােট করে নিতে বলে। হিরােনি সে অনুরােধ রাখে।‘কিন্তু হিঙ্গোরানি হঠাৎ টাকা চুরি করবে কেন ? ‘কারণ ওর পকেট ফাঁক হয়ে আসছিল’, গলা সপ্তমে তুলে বললেন আগন্তুক। শেষ বয়সে জুয়ার নেশা ধরেছিল। প্রতি মাসে একবার করে কাঠমাণ্ডু যেত ।

ওখানে জুয়ার আড়ত ক্যাসিনাে আছে জানেন ত ? সেই ক্যাসিনােতে গিয়ে হাজার হাজার টাকা খুইয়েছে রুলেটে।তেওয়ারি। ব্যাপারটা জেনে যায়। হিঙ্গোরানিকে অ্যাডভাইস দিতে যায়। হিঙ্গোরানি খেপে ওঠে। এমন দশা হয়েছিল লোেকটার যে বাড়ির দামী জিনিসপত্র বেচতে শুরু করে। শেষে মরিয়া হয়ে পার্টনারের সিন্দুকের দিকে চোখ দেয়। 

‘আপনি কী করবেন স্থির করেছেন ? ‘তােমাদের এখান থেকে আমি তার ঘরেই যাবাে । আমার বিশ্বাস চুরির টাকা তার সঙ্গেই আছে । তেওয়ারি কেমন মানুষ জানেন ?—সে বলেছে তার টাকা ফেরত পেলে সে তার পুরােনাে পার্টনারের বিরুদ্ধে কোনাে স্টেপ নেবে না। এই খবরটা আমি হিঙ্গোরানিকে জানাব—তাতে যদি তার চেতনা হয়।‘আর যদি না হয়? 

নয়ন রহস্য (পর্ব-২৫)

ভদ্রলােক সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে সেটাকে অ্যাশট্রেতে পিষে ফেলে একটা ক্রুর হাসি হেসে বললেন, সে ক্ষেত্রে অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।‘আপনি গােয়েন্দা হয়ে আ-আইন বিরুদ্ধ কাজ? “ইয়েস, মিস্টার মিটার ! গােয়েন্দা শুধু একরকমই হয় না, নানা রকম হয়। আমি অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করি। এটা কি আপনি জানেন না যে গােয়েন্দা আর ক্রিমিনালে প্রভেদ সামান্যই ? ভদ্রলােক উঠে পড়লেন। আবার জটায়ুর সঙ্গে জবরদস্ত হ্যান্ডশেক করে–‘গ্যাড টু মীট ইউ, মিস্টার মিটার। গুড ডে’ বলে গটগটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। 

আমরা তিনজন কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। ফেলুদাই প্রথম কথা বলল । “থ্যাঙ্ক ইউ, লালমােহনবাবু। মৌন থাকার সুবিধে হচ্ছে যে চিন্তার আরাে বেশি সময় পাওয়া যায়। কোনাে একটা ব্যারামে~-হয়ত ডায়াবেটিস—হিঙ্গারানি রােগা হয়ে যাচ্ছিলেন। তাই সেদিন বারবার কবজি থেকে ঘড়ি নেমে যাওয়া, আর চুরির সময় আঙুল থেকে আংটি খুলে যাওয়া। 

আপনি কি তাহলে ওই গােয়েন্দার কথা বিশ্বাস করছেন ? | করছি, লালমােহনবাবু, করছি। অনেক ব্যাপার, যা ধোঁয়াটে লাগছিল, তা ওর কথায় স্পষ্ট হয়ে গেছে। তবে হিঙ্গোরানি টাকা চুরি করে অর্থাভাব মেটানাের জন্য নয় ; সে কাঠমাণ্ডুতে জুয়া খেলে যতই টাকা খুইয়ে থাকুক, নয়নকে পেয়ে সে বােঝে তার সব সমস্যা মিটে যাবে । সে টাকা। চুরি করে মিরাকলস আনলিমিটেড কোম্পানিকে দাঁড় করানাের জন্য, তরফদারকে ব্যাক করার জন্য। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-২৫)

‘তাহলে এখন আপনি হিঙ্গোরানির সঙ্গে দেখা করবেন না ? ‘তার ত কোনাে প্রয়ােজন নেই! যিনি দেখা করবেন তিনি হলেন ডিটেকনীকের এই গােয়েন্দা। হিঙ্গোরানিকে তেওয়ারির টাকা বাধ্য হয়েই এই গােয়েন্দার হাতে তুলে দিতে হবে-প্রাণের ভয়ে। কাজেই তরফদারের পৃষ্ঠপােষক হিসেবে তার আর কোনাে ভবিষ্যৎ নেই। | ‘তাহলে এখন… ? ‘এইখানেই দাঁড়ি দিন, লালমােহনবাবু। এর পরে যে কী তা আমি নিজেই জানি না।’ 

জটায়ু আর আমার পিছনে যেহেতু কেউ লাগেনি, বিকেলে আমরা দুজনে সমুদ্রের ধারে গেলাম হাওয়া খেতে। হিঙ্গেরানির কপালে কী আছে জানি না, তবে এটা মনে হচ্ছে যে নয়নের আর কোনাে বিপদ নেই। যদি তেওয়ারির টাকা ফেরত দিয়েও হিঙ্গেরানির কাছে বেশ কিছু টাকা অবশিষ্ট থাকে, তাহলে তরফদারের শা হতে কোনাে বাধা নেই। আর প্রথম শাে থেকেই ত টিকিট বিক্রির টাকার অংশ আসতে শুরু করবে। মনে হয় হিঙ্গারানি এখনাে বেশ কিছুদিন চালিয়ে যাবেন। 

জটায়ুকে বলাতে তিনি চোখ রাঙিয়ে বললেন, ‘তপেশ, আই অ্যাম শকড়। লােকটা একটা ক্রিমিন্যাল, পরের সিন্দুক থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়েছে, আর সে তােক নানকে ভাঙিয়ে খাবে এটা জােরে তুমি খুশি ইচ্ছ? ‘খুশি নয়, লালমােহনবাবু। হিপােরানির বিরুদ্ধে যা প্রমাণ পাওয়া গেছে তাতে ত তাকে এই মুহুর্তে জেলে পােরা যায় । কিন্তু তার পার্টনার যদি পুরােন বন্ধুত্বের খাতিরে তার উপর দয়াপরবশ হয়ে তাকে রেহাই দেন—তাতে আমার-আপনার কী বলার আছে? | ‘লােকটা জুয়াড়ি-সেটা ভুলাে না। আমার অন্তত কোনাে সিমপ্যাথি নেই হিরােনির উপর। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-২৫)

তেষ্টা পাচ্ছিল দুজনেরই। লালমােহনবাবু কোল্ড কফি খাবার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন । এখানকার কফিটা একটা প্লাস পয়েন্ট সেটা স্বীকার করতেই হবে।সমুদ্রের কাছেই একটা কাফে আবিষ্কার করে আমরা একটা টেবিল দখল করে বেয়ারাকে কোল্ড কফি অডার দিলাম । কাফেতে অনেক লােক, বুঝলাম এদের ব্যবসা ভালােই চলে। | মিনিটখানেকের মধ্যে ঠক্ঠক্ করে দুটো গেলাস এসে পড়ল আমাদের টেবিলের উপর। আমরা দুজনেই ঘাড় নীচু করে প্লাস্টিকের ঔয়ের ডগা ঠোঁটের মধ্যে পুরে দিলাম । ‘হ্যাভ ইউ টোন্ড ইওর টিকটিকি ফ্রেন্ড ? লালমােহনবাবু একটা বিশ্রী শব্দ করে বিষম খেলেন। 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২৬)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *