সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য শেষ পর্ব

নয়ন রহস্য

পুলিশ আধঘণ্টা হল চলে গেছে। তারা খুনের তদন্তই করবে ; মাদ্রাজের বিভিন্ন হােটেল, লজ, ধরমশালায় খোঁজ নেবে আমাদের বর্ণনার সঙ্গে মেলে এমন চেহারার কোনাে লোেক গত দুদিনের মধ্যে সেখানে এসে উঠেছে কিনা। হিঙ্গোরানির ভাইপাে মােহনকে টেলিফোন করা হয়েছিল। সে আগামীকাল এসে লাশ সনাক্ত করে সৎকারের ব্যবস্থা কবে |

মৃতদেহ এখন মর্গে রয়েছে। পুলিশ এও জানিয়েছে যে ছােরার হাতলে কোনাে আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি। নয়নের ব্যাপারে ফেলুদা বলল যে সে নিজেই তদন্ত করবে। তাতে তরফদার সায় দিয়েছেন। রেড্ডি এবার চেয়ার থেকে উঠে ফেলুদাকে বললেন, আমি কিন্তু আপনার উপরই ভরসা করে আছি, মিঃ মিত্তির । দুদিন যদি শাে। পােস্টপপান করতে হয় তা আমি করব।

এই দুদিনের মধ্যে আপনি জ্যোতিষ্ককে খুঁজে বার করে দিন—প্লীজ ! | রেড়ি যাবার মিনিটখানেকের মধ্যে তরফদারও উঠে পড়ে বললেন, ‘দুদিন দেখি। তার মধ্যে যদি নয়নকে না পাওয়া যায় তাহলে কলকাতায় ফিরে যাব।—আপনি কি আরাে কিছুদিন থাকবেন ? ‘অনির্দিষ্টকাল থাকা অবশ্যই সম্ভব নয়, বলল ফেলুদা। তবে এইভাবে চোখে ধূলাে দেওয়াটাও মেনে নেওয়া মুশকিল। দেখি…’ 

নয়ন রহস্য শেষ পর্ব

তরফদার বেরিয়ে যাবার পর ফেলুদা হাতের সিগারেটে একটা শেষ টান দিয়ে তার খুব চেনা গলায় একটা চেনা কথা মৃদুস্বরে তিনবার বলল—“খকা-খটকা..খটকা…’। ‘এটা আবার কিসের খটকা ?’ জটায়ু জিজ্ঞেস করলেন । ‘হিঙ্গেরানিকে বলা ছিল যে অচেনা লােক হলে সে যেন দরজা না খােলে ; তাহলে ডিটেকনীক ঢুকলেন কী করে? তাকে কি হিঙ্গোরানি আগে থেকেই চিনতেন ? ‘কিছুই আশ্চর্য নয়’, বললেন জটায়ু।

“হিঙ্গারানি কতরকম ব্যাপারে আমাদের পাল্লা দিয়েছিল ভেবে দেখুন। | আমি ফেলুদাকে একটা কথা না বলে পারলাম না। ‘তুমি কি শুধু হিঙ্গোরানি মাডারের কথাই ভাবছ, ফেলুদা ? আমার কিন্তু বারবার মনে হচ্ছে যে একটা বাজে লােক যদি খুন হয়েও থাকে তাতে যতটা ভাবনা হয়, তার চেয়ে নয়নের মতাে ছেলে চুরি যাওয়াটা অনেক বেশি ভাবনার। তুমি হিঙ্গোরানি ভুলে গিয়ে এখন শুধু নয়নের কথা ভাবাে। 

‘দুটোই ভাবছি রে তােপশে, কিন্তু কেন জানি মনের মধ্যে দুটো জট পাকিয়ে যাচ্ছে। | ‘এ আবার কী হেঁয়ালি মশাই ? লালমােহনবাবু বেশ বিরক্তভাবে বললেন। দুটো ত সেপারেট ঘটনা–জট পাকাতে দিচ্ছেন কেন ? ফেলুদা জটায়ুর কথায় কান না দিয়ে বার দুতিন মাথা নেড়ে বলল, ‘নাে সাইন অফ স্ট্রাগল—নাে সাইন অফ স্ট্রাগল...’ ‘সে ত শুনলুম’, বললেন জটায়ু । পুলিশ ত তাই বলল। ‘অথচ লােকটা যে ঘুমের মধ্যে খুন হয়েছে তা ত নয়। ‘তা হবে কেন ? জুতাে মােজা পরে কেউ ঘুমােয় নাকি ? “তা অনেক মাতাল ঘুমােয় বৈকি। কারণ তাদের হুশ থাকে না। 

কিন্তু এর ঘরে ত ড্রিঙ্কিং-এর কোনাে চিহ্ন ছিল না।অবিশ্যি যদি বাইরে থেকে মদ খেয়ে এসে দরজা খােলা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে থাকে ‘উহু। ‘হােয়াই নট ? ‘টিভি খােলা ছিল, যদিও ভলুম একেবারে নামানাে ছিল। তাছাড়া অ্যাশট্রের খাজেতে একটা আধখানা সিগারেট পুরােটা ছাই হয়ে পড়ে ছিল। অর্থাৎ ভদ্রলােক টিভি দেখতে দেখতে সিগারেট খাচ্ছিলেন, সেই সময় দরজার বেলটা বাজে। হিঙ্গোরানি টিভির ভলুম পুরাে নামিয়ে দিয়ে সিগারেটটা ছাইদানের কানার খাঁজে রেখে উঠে গিয়ে দরজা খােলেন।

নয়ন রহস্য শেষ পর্ব

‘খােলার আগে কি জিজ্ঞেস করবেন না কে বেল টিপল ? ‘হা, কিন্তু চেনা গলা হলে ত আর দ্বিধার কোনাে কারণ থাকে না। ‘তাহলে ধরে নিন যে হিঙ্গোরানির সঙ্গে এই গােয়েন্দার আলাপ ছিল, এবং হিঙ্গোরানি তাকে অসৎ লােক বলে জানতেন না। ‘কিন্তু সেই লােক যখন ছুরি বার করবে তখন হিঙ্গোরানি বাধা দেবেন।? স্ট্রাগল হবে না ? ‘আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হয়। কী ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব সেটা আপনি ভেবে বের করবেন।

যদি না পারেন, তাহলে বুঝতে হবে আপনার পাঠকদের অভিযােগের যথেষ্ট কারণ আছে। কোথায় গেল আপনার আগের সেই জৌলুস। সেই ক্ষুরধার’ ‘চুপ! লালমােহনবাবুকে ব্রেক কষতে হল । ফেলুদা আমাদের দিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে এখন দেয়ালের দিকে চেয়ে—চোখে সুতী দৃষ্টি, কপালে গভীর খাজ ।। আমি আর জটায়ু প্রায় এক মিনিট কথা বন্ধ করে ফেলুদার এই নতুন চেহারাটা দেখলাম।

তারপর আমাদের কানে এল কতকগুলাে কথা—ফিসফিসিয়ে বলা— ‘বুঝেছি ।–কিন্তু কেন, কেন, কেন ? | দশবারাে সেকেণ্ড নৈঃশব্দ্যের পর লালমােহনবাবুর চাপা কণ্ঠস্বর শােনা গেল।‘আপনি একটু একা থাকতে চাইছেন কি ? “থ্যাঙ্ক ইউ, মিস্টার গাঙ্গুলী। আধঘণ্টা, আধঘণ্টা, থাকতে চাই একা। আমরা দুজন উঠে পড়লাম। আমার মনে যে ইচ্ছেটা ছিল, সেটা দেখলাম লালমােহনবাবুর ইচ্ছের সঙ্গে মিলে গেছেসেটা হল নীচে কফি শপে গিয়ে চা খাওয়া। 

নয়ন রহস্য শেষ পর্ব

আমরা কফি শপে গিয়ে একটা টেবিল দখল করে বসে চায়ের অর্ডার | দিলাম সঙ্গে স্যান্ডউইচ হলে মন্দ হত না, বললেন জটায়ু। শুধু চা বড় চট করে ফুরিয়ে যাবেআধ ঘণ্টা কাটাতে হবে ত! বেয়ারা দাঁড়িয়েছিল ; চায়ের সঙ্গে দু প্লেট চিকেন স্যান্ডউইচ যােগ করে দিলাম। | আসার আগে আঁচ পেয়েছি যে ফেলুদা আলাের সন্ধান পেয়েছে। সেটা কম কি বেশি জানি না, কিন্তু বুঝতে পারছি যে শিরদাঁড়া দিয়ে ঘন 

শিহরন বয়ে যাচ্ছে| হাতে সময় আছে তাই লালমােহনবাবু তার সবে মাথায় আসা উপন্যাসের আইডিয়াটা শােনালেন। যথারীতি গল্পের নাম আগেই ঠিক হয়ে গেছেমাঞ্চুরিয়ায় রােমাঞ্চবললেন, চায়না সম্বন্ধে একটু পড়ে নিতে হবে অবিশ্যি আমার এ গল্পে আজকের চীনেচেহারা পাওয়া যাবে ; এ হবে ম্যান্ডারিনদের আমলের চায়না।

নয়ন রহস্য শেষ পর্ব

 খাওয়া শেষ, লালমােহনবাবুর গল্প শেষ, তাও দেখি দশ মিনিট সময় রয়েছে। কফি শপ থেকে লবিতে বেরিয়ে এসে জটায়ু বললেন, কী করা যায় বল তআমি বললাম, আমার ইচ্ছে করছে একবার বুক শপটাতে টু মারিওটা এখন আমাদের কাছে একটা হিস্টোরিক জায়গা নয়ন ওখান থেকেই অদৃশ্য হয়েছে। গুড আইডিয়া

আর বলা যায় না— হয়ত গিয়ে দেখব আমার বই ডিসপ্লে করা হয়েছে। ‘ইডলি দোসার দেশে আপনার বই থাকবে না, লালমােহনবাবু‘দেখি না খোজ করে! | দোকানের ভদ্রমহিলার বয়স বেশি না, আর দেখতেও সুশ্রীজটায়ু ‘এক্সকিউজ মি’ বলে ভদ্রমহিলার দিকে এগিয়ে গেলেন।

 

Read More

হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-১) 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *