হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৯)

‘গোঁসাই পাড়ায়। বেশি দূর নাপরথমে সেইখানে যাইবেন

‘নানা, যাওয়ার দরকার কী? তাদের কাজ তারা করবে। হুমায়ুন ভাই কী বলেন?

শ্যামল ছায়া হুমায়ুন কিছু বলল না, চুপ করে রইল। তার মচকে যাওয়া পা ব্যথা করছিল। সে মুখ কুঁচকে বসে রইল। তীর থেকে কে এক জন চেচিয়ে ডাকল, ‘কার নাও? কার নাও? 

নৌকার মাঝি রসিকতা করল, হেঁড়ে গলায় বলল, তােমার নাও। ‘নাও ভিড়াও মাঝি, খবর আছে, নাও ভিড়াও। 

নৌকা ভিড়ল না, চলতেই থাকল এবং কিছুক্ষণ পরেই তীব্র টর্চের আলাে এসে পড়ল নৌকায়। 

‘নৌকা ভিড়াও মাঝি, সামনে রাজাকার আছে

কোনখানে? ‘শেখানির খালের পারে বইসা আছে। ‘থাকুক বইসা, তুমি কেডা গাে?” 

‘আমি শেখজানি হাইস্কুলের হেডমাষ্টার আজিজুদ্দিনমুক্তিবাহিনীর নাও নাকি? 

‘মনে অয় হেই রকমই। 

নৌকা ভিড়ল না, কারণ নৌকা শেখজানির খালে যাচ্ছে না। আজিজুদ্দিন মাষ্টার হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই মাঝরাত্রে সে ছয় ব্যাটারির টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে কেন কে জানে? 

এখান থেকেই গ্রামের চেহারাটা বদলাতে শুরু করেছে। দুটি আস্ত বাড়ি, তার পরপরই চারটি পুড়েযাওয়া বাড়ি। আবার একটা গােটা বাড়ি নজরে আসছে, আবার ধ্বংসস্তুপ। মিলিটারিরা প্রায় নিয়মিত আসছে এদিকে। লােকজন পালিয়ে গেছে। ফসল বোনা হয় নি।

শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৯)

চারিদিক জনশূন্য। নৌকা যতই এগিয়ে যায়, ধ্বংসলীলার ভয়াবহতা ততই বেড়ে ওঠে। আর এগোন ঠিক নয়। রাজাকারদের ছােটখাট দল প্রায়ই নদীর তীর ঘেঁষে ঘুরে বেড়ায়! নজর রাখে রাতদুপুরে কোনাে রহস্যজনক নৌকা চলাচল করছে কিনা। তাদের মুখােমুখি পড়ে গেলে তেমন ভয়ের কিছু নেই। তবে আগেভাগেই গােলাগুলীর শব্দে চারিদিক সচকিত করে লাভ কী? 

‘ ম তাই, এই রুস্তম ভাই।’ ‘কেড়া গো ‘আমি চা, পাঞ্জাবী মিলিটারি, হি হি হিনৌকা থামান। 

যেীফা গতি থেমে গেল সঙ্গে সঙ্গে। একটি ছােটখাট রােগা মানুষ লাফিয়ে ঠত মৌয়। জাফখ বলল, কী ব্যাপার, কী চাও তুমি? কে তুমি?’ 

‘আমি কেউ না, চান্দু। ‘ফী কয় তুমি?’ 

খামি দারী করি। আপনেরার সাথে যামু। যা করবার কল করুম। 

কখম বলল, ‘চান্দুরে লন সাথে, খুব কামের ছেলে। গ্রেনেড নিয়া একেবারে পাশার ভিত ফালাইব দেখবেন। 

গর্থীর হয়ে বলল, ‘নামেন গাে ভালােমানুষের পুলারা। জিনিসপত্র যা এn, আমার মাথায় দেন। পিনপিনে বৃষ্টি মাথায় করে দলটি নেমে পড়ল। সবে মাটিতে পা দিয়েছে, অমনি দূরাগত বিকট আওয়াজ কানে এল। কী হল, কী হল। পল পড়িয়ে পড়ল হঠাৎ। মজিদ উৎকণ্ঠিত স্বর বের করল, ‘হুমায়ূন ভাই, কী ব্যাপার? উত্তর দিল চান্দু, কিছু না। পুল ফাটাইয়া দিছে! সাবাস, ব্যাটা বাপের 

শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৯)

৩া হলে ব্রীজ উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আহ্ কি আনন্দ। ভয় কমে যাচ্ছে সবার। সবাই পীড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। বিকট শব্দটা হুম হুম করে প্রতিধ্বনি তুলল। খানার বলুপ ষ্টের পালানটি দেখা যাচ্ছে। রঙ দেখা যাচ্ছে না। কাঠামােটা স্পষ্ট নজরে অাসছে। খালার আশেপাশে দু’ শ’ গজের মতাে জায়গা পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। ঘরবাড়ি নেই, গাছপালা নেইখাখাঁ করছে। অনেক দূর থেকে যাতে শত্রুর আগমন টের পাওয়া যায়, সেই জন্যেই এই ব্যবস্থা। 

তিনটি দলে ভাগ হয়ে অপেক্ষা করছে ছেলেরা। এদেরও অনেক পেছনে আধইঞ্চি মর্টার নিয়ে অপেক্ষা করছে একটি ছােট্ট দল, যেদলে পেনসনভােগী এক জন বৃদ্ধ সুবাদার আছেন। পুরনাে লােক। তার উপর বিশ্বাস করা চলে। উত্তর দিকের ঢালু অঞ্চলটায় রুস্তম একাই আট হয়ে বসেছে। মাটি হয়েছে পিছল। এল. এম. জি. 

মুক্তিবাহিনী চলাচল হচ্ছে এ খবর কী করে পেল কে জানে! হুমায়ুন একটু বিরক্ত হল। মুখে কিছুই বলল না। অবশ্য ভয় পাবার তেমন কিছু নেইও। মিলিটারিরা কিছুতেই এই রাত্রিতে থানার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বাইরে বেরুবেনা। মজিদ বলল, হুমায়ুন ভাই, পজিশন নেব কোথায়? সব খানাখন্দ তাে পানিতে ভর্তি। সাপ খােপও আছে কিনা কে জানে। 

 

Read More

হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া শেষ পর্ব

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *