ফেলুদা হঠাৎ বলল, আপনার বােধহয় গান-বাজনার শখ ? তিনকড়িবাবু অবাক হাসি হেসে বললেন, সেটা জানলে কী করে হে ? ‘আপনি যখন কথা বলছেন তখন লক্ষ করছি যে, লাঠির উপর রাখা আপনার ডান হাতের তর্জনীটা রেডিওর সঙ্গে তাল রেখে যাচ্ছে।’
রাজেনবাবু হাসতে হাসতে বললেন, ‘মােক্ষম ধরেছ। উনি ভাল শ্যামা সংগীত গাইতে পারেন।’
ফেলুদা এবার বলল, “চিঠিটা হাতের কাছে আছে ? রাজেনবাবু বললেন, ‘হাতের কাছে কেন, একেবারে বুকের কাছে।’ * রাজেনবাবু কোটের বুক-পকেট থেকে চিঠিটা বার করে ফেলুদাকে দিলেন ! এইবার সেটা দেখার সুযােগ পেলাম।
হাতে-লেখা চিঠি নয়। নানান জায়গা থেকে ছাপা বাংলা কথা কেটে কেটে আঠা দিয়ে জুড়ে চিঠিটা লেখা হয়েছে। যা লেখা হয়েছে, তা হল এই-~~-তােমার অন্যায়ের শাস্তি ভােগ করিতে প্রস্তুত হও।’
ফেলুদা বলল, এ চিঠি কি ডাকে এসেছে ?
রাজেনবাবু বললেন, হ্যাঁ। লােক্যাল ডাকবলা বাহুল্য। দুঃখের বিষয় খামটা ফেলে দিয়েছি। দার্জিলিং-এরই পােস্টমার্ক ছিল। ঠিকানাটাও ছাপা বাংলা কথা কেটে কেটে লেখা। ‘
“আপনার নিজের কাউকে সন্দেহ হয় ? “কী আর বলব বলাে ! কোনও দিন কারও প্রতি কোনও অন্যায় বা অবিচার করেছি বলে তাে মনে পড়ে না।
আপনার বাড়িতে যাতায়াত করেন এমন কয়েকজনের নাম করতে পারেন ? ‘খুব সহজ। আমি লােকজনের সঙ্গে মিিশ কমই । ডাক্তার ফণী মিত্তির আসেন অসুখ-বিসুখ হলে…’
. কেমন লােক বলে মনে হয় ?
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৩)
‘ডাক্তার হিসেবে বােধহয় সাধারণ স্তরের। তবে তাতে আমার এসে যায় না, কারণ আমার ব্যারামও সাধারণ সর্দি-জ্বর ছাড়া আর কিছুই হয়নি দার্জিলিং এসে অবধি। তাই ভাল ডাক্তারের প্রয়ােজন হয় না।’
‘চিকিৎসা করে পয়সা নেন ? ‘তা নেন বইকী। আর আমারও তাে পয়সার অভাব নেই। মিথ্যে অবলিগেশনে যাই কেন ?
“আর কে আসেন ? ‘সম্প্রতি মিস্টার ঘােষাল বলে এক ভদ্রলােক যাতায়াত…এই দ্যাখাে !
দরজার দিকে ফিরে দেখি একটি ফরসা, মাঝারি হাইটের, স্যুট-পরা ভদ্রলােক হাসিমুখে ঘরে ঢুকছেন।
‘আমার নাম শুনলাম বলে মনে হল যেল ? রাজেনবাবু বললেন, এইমাত্র আপনার নাম করা হয়েছে। আপনারও আমার মতাে পুরনাে জিনিসের শখ–সেটাই এই ছেলেটিকে বলতে যাচ্ছিলুম। আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই–
নমস্কার-টমস্কারের পর মিস্টার ঘােষাল-পুরাে নাম অবনীমােহন ঘােষাল— রাজেনবাবুকে বললেন, ‘আপনাকে আজ দোকানে দেখলুম না, তাই একবার ভাবলাম খোঁজ নিয়ে যাই।’
রাজেনবাবু বললেন, নাঃ,—আজ শরীরটা ভাল ছিল না।’
বুঝলাম রাজেনবাবু চিঠিটার কথা মিস্টার ঘােষালকে বলতে চান না। ফেলুদা মিস্টার ঘােষাল আসার সঙ্গে সঙ্গেই চিঠিটা হাতের তেলাের মধ্যে লুকিয়ে ফেলেছে।
ঘােষাল বললেন, আপনি ব্যস্ত থাকলে আজ বরং…আসলে আপনার ওই তিব্বতি ঘণ্টাটা একবার দেখার ইচ্ছে ছিল।’
রাজেনবাবু বললেন, “সে তাে খুব সহজ ব্যাপার। হাতের কাছেই আছে।’ রাজেনবাবু ঘণ্টা আনতে পাশের ঘরে চলে গেলেন। ফেলুদা ঘােষালকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি এখানেই থাকেন ?
ভদ্রলােক দেওয়াল থেকে একটা ভােজালি নামিয়ে সেটা দেখতে দেখতে বললেন, আমি কোনও এক জায়গায় বেশি দিন থাকি না। আমার ব্যবসার জন্য প্রচুর ঘুরতে হয়। আমি কিউরিও সংগ্রহ করি।’
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৩)
বাড়ি ফেরার পথে ফেলুদাকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম, ‘কিউরিও’ মানে দুষ্প্রাপ্য প্রাচীন জিনিস।
রাজেনবাবু ঘণ্টাটা নিয়ে এলেন। দারুণ দেখতে জিনিসটা। নীচের অংশটা রুপাের তৈরি, হাতলটা তামা আর পেতল মেশানাে, আর তার উপরে লাল নীল সব পাথর বসানাে ।
অবনীবাবু চোখ-টোখ কুঁচকে বেশ অনেকক্ষণ ধরে ঘণ্টাটা এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলেন।
রাজেনবাবু বললেন, কী মনে হয় ? ‘সত্যিই দাঁও মেরেছেন। একেবারে খাঁটি পুরনাে জিনিস। ‘আপনি বললে আমার আর কোনও সন্দেহই থাকে না। দোকানদার বলে, এটা নাকি একেবারে খােদ লামার প্রাসাদের জিনিস।
‘কিছুই আশ্চর্য না। আপনি বােধহয় এটা হাতছাড়া করতে রাজি নন ? মানে, ভাল দাম পেলেও ?
রাজেনবাবু মিষ্টি করে হেসে ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললেন, ব্যাপারটা কী জানেন ? শখের জিনিস-ভালবেসে কিনেছি। সেটাকে বেচে লাভ করব, এমন কী কেনা দরেও বেচব—এ ইচ্ছে আমার নেই।’ | অবনীবাবু ঘণ্টাটা ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, “আজ আসি। কাল আশা করি বেরােতে পারবেন একবার।’
Read More